‘যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরান আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে’: ট্রাম্প

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ , অনলাইন ভার্সন
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের জন্য তেহরানকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেনি; বরং ইরানই প্রথম যুদ্ধ শুরু করেছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতিকে সময়ের অপচয় হিসেবে উল্লেখ করে সামরিক অভিযানের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি প্রস্তুত ছিলেন বলে জানিয়েছেন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের করিন্থ শহরে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করিনি। ইরান আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে।’ তাঁর ভাষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলেও তিনি সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিলেন বলে দাবি করেন।

যুদ্ধবিরতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ছোট যুদ্ধবিরতি করেছিলাম, যা আমি কখনো খুব একটা পছন্দ করিনি। আমরা ভালো হতে চেয়েছি, তবে যতদূর আমি মনে করি, এটি কেবল সময়ের অপচয় ছিল।’

ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে তিনি আপাতত কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চান। তবে তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধবিরতি কেন কার্যকর হয়নি, ভবিষ্যতে নতুন কোনো সমঝোতার সুযোগ রয়েছে কি না কিংবা সামরিক অভিযান কোন পর্যায়ে গিয়ে শেষ হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তেহরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপে আঘাত হানতে সক্ষম। অদূর ভবিষ্যতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সান ডিয়েগোতে আঘাত হানত, তারা লস অ্যাঞ্জেলেসে আঘাত হানত, তারা আমাদের শহরগুলোতেও আঘাত হানত।’

তবে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, সক্ষমতা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে হামলার আশঙ্কার পক্ষে তিনি সমাবেশে কী নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট নয়। ফলে তাঁর দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের পরিবর্তে প্রেসিডেন্টের নিজস্ব বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার যুক্তি তুলে ধরে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মিসিসিপির সমাবেশেও যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি ট্রাম্প দাবি করেন, সংঘাতের অবসান হলে তেলের দাম আবার কমতে পারে।

তেলের দাম ও অর্থনৈতিক চাপ
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়ের চাপের মধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ওপরও প্রশ্ন তৈরি করছে।

২৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাব নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ভালো ফল করবে। তাঁর পূর্বাভাস, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে এবং তেলের দাম কমে আসবে।

তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হয়ে উঠবে—ট্রাম্পের এই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তেল সরবরাহের ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধের রাজনৈতিক গুরুত্ব
ট্রাম্পের মিসিসিপি সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালানো। সেখানে তিনি রিপাবলিকান সিনেটর সিন্ডি হাইড-স্মিথের প্রতি সমর্থন জানান। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মিসিসিপিতেও এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশার তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা শক্তিশালী অবস্থানে ফিরবে—তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ট্রাম্পের বক্তব্যকে শুধু সামরিক নীতির ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও জড়িত। একদিকে তিনি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ প্রশমনের চেষ্টা করছেন।

তবে যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক মূল্যও যে প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সংঘাতের দ্রুত অবসান ঘটানো সম্ভব না হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে সামরিক কঠোরতা, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাশা—তিনটি বিষয়ই সামনে এসেছে। তিনি সংঘাতের দায় ইরানের ওপর চাপিয়ে সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃত পরিণতি নির্ভর করবে সামরিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তার ওপর।

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]