​বাবার কথা তুমি কভু ফিরলে না...

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ২১:৪৪ , অনলাইন ভার্সন
‘তুমি কভু ফিরলে না, শোনালে না ফেলে যাওয়া সুর। আছো কাছে, তবু হায় চলে গেছো কত না সে দূর।’ শুধু বাবা দিবসে সীমাবদ্ধ নয়, বাবার কথা আমার মনে পড়ে সব সময়। কেমন যেন একটা শূন্যতা, একটা হাহাকার, না-বলা কিছু কথা, অচেনা একটা জানাশোনা। আর আছে হৃদয়ের খুব গভীরে একটা তীব্র কষ্ট।

মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। এই বিশাল ধরণি-পটে একটি ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে কিছু সময়ের জন্য আমরা বেঁচে থাকি এবং একদিন সামান্য ধূলিকণার মতো আমরা মিলিয়ে যাই এই মানবজগৎ থেকে। চলে যাই স্নেহময়ী এই ভুবনের মায়া ছেড়ে এক অপরিচিত ভুবনে। এটাই আমাদের জীবনধারা, এই আমাদের কালের প্রবাহ। পরিচিত মানুষটি ফেলে যায় কিছু স্মৃতি, রেখে যায় কিছু চিহ্ন, যেগুলো আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকে তার প্রিয় আপনজনেরা।

আত্মীয়তা সূত্রে, পারস্পরিক সাহচর্য অথবা একত্রে বসবাসের ফলে একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের যে পরিচয় ঘটে, বাবার সঙ্গে তেমনটি হওয়ার সুযোগ আমি পাইনি। বাবার সঙ্গে আমার পরিচয়, বহুদিন আগে তোলা তার কিছু ছবি, রেখে যাওয়া ব্যবহার্য কিছু জিনিস আর মায়ের মুখ থেকে শোনা কিছু গল্পের মধ্য দিয়ে। আমার জীবনের যেটুকু সময়ে বাবা ছিলেন, সেই সময়ের কথা আমার আবছা আবছা মনে পড়ে। আমার অন্তরে জাগ্রত ভাসা ভাসা কিছু ঘটনার পটে আমি তাঁকে খুঁজে পাই।

আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে অনার্স করেছিলেন। তারপর তিনি বায়োকেমিস্ট্রিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি করেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মাঝেই আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে, সংসার শুরু করাচি শহরে। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে তিনি চলে যান সুদূর অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান থেকে নিউট্রিশনের ওপর তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে তিনি পরিবার নিয়ে ফেরত আসেন।

খুব ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ ছিলেন বাবা, সহজে রাগ করতেন না। খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন তিনি, নিতান্তই স্বল্প ছিল তাঁর চাহিদা। কিন্তু পরিবারের অন্য সকলের জন্য তাঁর চিন্তার অন্ত ছিল না। সবার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর প্রয়োজনের প্রতি তিনি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। আমার বাবা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি খুবই পছন্দ করতেন ছুটির দিনে সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যেতে। সিনেমা, পিকনিক, রেস্তোরাঁ অথবা কোনো লং ড্রাইভে যাওয়া-এসবই ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়। আপন মানুষদের খুশি করতে তাঁর চেষ্টার অন্ত ছিল না। অফিস শেষে ফেরার পথে ঝাঁকাভরা মুরগি, ঝুড়িভরা আম, বিশাল একটি মাছ, এক কাঁদি ফল, বড় হাঁড়িতে মিষ্টি-এমন অনেক কিছুই বাড়ি নিয়ে এসে চমকে দিতেন সবাইকে। হাসিমুখে প্রকাশ করতেন তাঁর ভালোবাসা, পরিবারের জন্য। চোখের পানিতে সেসব কথা স্মরণ করেন আমার মা।

বাবা-মায়ের মমতা আর ভালোবাসায় গড়ে তোলা সংসারের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট ছিলাম আমি। আমি সব সময় ভাবতাম, বাবা যেন সবচেয়ে বেশি আমাকে ভালোবাসে। ছোটবেলায় কখনো মনে পড়ে না আমি বাবার কাছে বকা খেয়েছি। স্নেহ, ভালোবাসা আর আদরের প্রাচুর্যে ভরিয়ে রেখেছিলেন আমায়। বাড়িতে অন্য কেউ আমায় বকলে সঙ্গে সঙ্গে বাবার কাছে গিয়ে নালিশ দিতাম। বাবা আমায় আশ্বাস দিয়ে বলতেন, বাড়ির সকলকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।
আমাদের দুজনার খুব প্রিয় একটি অভ্যাস ছিল। রাতের খাবারের পর আমরা ছাদে গিয়ে আকাশে তারা গুনতাম। ছাদে একটি জলচৌকি ছিল, যেটায় শুয়ে গরমের দিনে সন্ধ্যার পর আমরা বাতাস খেতাম। আর সেই সঙ্গে চলত বাবা-মেয়ের তারা গোনা। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম, গুচ্ছ গুচ্ছ তারা একসঙ্গে পরিবারের মতো আকাশের একেক জায়গায় জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। দৃষ্টিসীমার এক পাশ থেকে শুরু করে গুনতে গুনতে আমি অন্য পাশে যেতাম। তবে মজার ব্যাপার ছিল, দশ-বারোটা তারা গোনার পর আমি সম্পূর্ণ গুলিয়ে ফেলতাম কোন তারাটা গুনেছি আর কোনটা গুনিনি। তাই তারা গোনা আর শেষ হতো না। কত দিন এই করতে করতেই বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়েছি।

পিতৃকন্যার এই আনন্দঘন সম্পর্ক পরে বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। হঠাৎ একদিন কী জানি কী হলো। আকাশ থেকে খসে পড়া তারার মতো, স্নেহ-ভালোবাসার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে বাবা হারিয়ে গেলেন আমাদের কাছ থেকে। শৈশবের হেসে খেলে কেটে যাওয়া দিনগুলোর মাঝে হঠাৎ একদিন তাঁকে হারিয়ে ফেললাম আমি। প্রকৃতি কোনো অশুভ ঘটনার আভাস অনেক আগে থেকেই দিতে থাকে। বাবা মারা যাওয়ার মাসখানেক আগে মায়ের একটি খুব প্রিয় হীরার আংটি হারানো যায়। সেটা নিয়ে মায়ের অনেক মন খারাপ হয়েছিল। তবে আমরা কেউ বুঝিনি, এর চাইতেও একটি বড় ঘটনা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

সেই বিশেষ দিনটি এখনো আমার চোখে ভাসে। বাড়িভর্তি চেনা-অচেনা অনেক মানুষ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী। সবার চোখে মুখে তীব্র শোকের ছাপ। আমার আপারা পাগলের মতো কাঁদছে। মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। আমি ছোট্ট মানুষ, কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে সবার দিকে ব্যাকুল হয়ে তাকাচ্ছি। একটি অপ্রিয় সত্য কথা কেউ আমাকে বলছে না।
বুকের বাম পাশে প্রচণ্ড একটি চাপ...অসহ্য ব্যথা...অসম্ভব অস্থিরতা....হাসপাতালে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমার একজন মামা ওনার পাশে ছিলেন সে সময়। জীবনের শেষ মুহূর্তে চোখের সামনে আমাদেরকে দেখে যেতে পারেননি। চলে গেছেন বড় নীরবে, নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে।

শেষবারের মতো যখন তাঁর মুখখানি দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল কী শান্ত, স্নিগ্ধ মুখশ্রী। কী গভীর শান্তিতে তিনি চোখ দুটো বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আমি ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠেছিলাম। আমার মনে পড়ে, আমি কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে ডাকছি, বাবা শুনছেন না। আমার সমস্ত কান্না, সমস্ত বিলাপ নিষ্ফল আর্তনাদ হয়ে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে ঘুরে ফিরছে, বাবা জেগে উঠছেন না। আমাদের সংসারের এক অতি প্রিয়জন, তাঁর সব প্রিয়জনদের ছেড়ে যাত্রা করেছিলেন এক না-ফেরার দেশে। আমরা কেউ তাঁকে থামাতে পারিনি।

সৃষ্টিকর্তা তাঁর হাতে গড়া প্রতিটি দিনকে শুভ্র সুন্দর করে পাঠান আমাদের জন্য। ১৯২৭ সালের একটি শুভ দিনে আমার বাবার আগমন ঘটেছিল এই পৃথিবীর মাঝে। ১৯৭৬ সালের একটি পবিত্র দিনে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, সকলের ভালোবাসাকে সঞ্চয় করে। মাঝে রেখে গেলেন তাঁর হাসি, আনন্দ, কিছু ক্ষণ, কিছু সময়। মানুষকে ভালোবেসে আর মানুষের ভালোবাসা পেয়ে যে জীবনে মৃত্যু আসে, সে জীবন ব্যর্থ নয়, বরং তা সার্থকতায় পরিপূর্ণ।

পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে আমার বাবা তাঁর উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছিলেন। কয়েক বছর আগে দেশে গিয়ে আমি সেই এডওয়ার্ড কলেজ দেখতে গিয়েছি, আর তার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করেছি। চারদিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, হয়তো এখান দিয়েই বাবা হেঁটে যেতেন। হয়তো ওখানটাতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন এবং এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন। প্রতিবার দেশে গিয়ে যখন বাবার কবর জিয়ারত করি, তাঁর মাথার পাশে বসে দোয়া করি, তখন মনে মনে ভাবি-বাবা, তুমি কি শুনতে পাও? তুমি কি জানতে পারো, তোমার সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ কত বড় হয়েছে। আকাশের পানে তাকিয়ে সে আজও তারা গোনে।

তোমার মেয়ে জানে, ওই দূর আকাশে যেথায় নীলের পরে নীল, তারও পরে নীল একাকার হয়ে মিশে আছে, ঠিক তাঁর মধ্যখানটাতে তার বাবা একটি উজ্জ্বল তারা হয়ে জ্বলছেন। রাতের আকাশে যার স্বর্গীয় দীপ্তি সমস্ত জগৎকে আলোকিত করে। সেই আলোর পথ ধরে তোমার মেয়ে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। কারণ, এ পথের শেষেই একদিন দেখা হবে বাবা, আবার তোমার সাথে। 
লেখক : কলামিস্ট, টেক্সাস।
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]