ব্রুকলিন থেকে নিউইয়র্কের ক্ষমতার কেন্দ্রে: লেটিশিয়া জেমসের সংগ্রাম ও সাফল্য

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:০০ , অনলাইন ভার্সন
নিউইয়র্কের এটর্নী জেনারেল লেটেসিয়া জেমস নির্বাচনে পুনরায় এটর্নী জেনারেল হওয়ার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন। তিনি একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে। বাবা-মা দুইজনই অনেক কঠিন কাজ করতেন। তারা বড় বড় অফিসার ছিলেন না। বাবা ছিলেন সুইপার মা ক্লিনার। লেটেশিয়া জেমস একটি সাধারণ ও নিম্ম আয়ের পরিবারের মেয়ে। অনেক চড়াই উৎড়াই পাড় করেই লেখা পড়া করেছেন। জীবনের সাফল্যের এই পর্যায়ে তাকে পৌছুতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি দমে যাওয়ার মানুষ নন। সব সময় সাহসিকতার সাথে এগিয়ে গেছেন। তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল থাকেন। তিনি অসীম সাহসী। অনেক বড় বড় মামলায় তিনি জয়ী হয়েছেন। তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন সাধারন মানুষের জন্য অরো বেশি কাজ করার। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রচারনা চলছে। ব্যক্তিগতভাবে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও চালিয়েছেন প্রচারনা। তিনি ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সমর্থন পাচ্ছেন। তিনি তার জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি সাউথ এশিয়ান ও বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষের কাছেও ভোট চেয়েছেন। তাদের অনেকের সাথে কথাও বলেছেন। বলেছেন তার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ও স্বপ্নের কথা। সেই সব স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি মানুষের জন্য কাজ করার মাধ্যমে পূরণ করার কথাও। 
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া ‘টিশ’ জেমসের জীবনপথ কেবল একজন রাজনীতিবিদের সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি সাধারণ কর্মজীবী পরিবার থেকে উঠে এসে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, শিক্ষা ও দীর্ঘ জনসেবার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানোর কাহিনি। ব্রুকলিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জেমস এখন নিউইয়র্কের ৬৭তম অ্যাটর্নি জেনারেল। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জেমসের বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ এক কর্মজীবী পরিবারে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর পরিবার ছিল সাধারণ ও সীমিত সামর্থ্যের, বাবা-মা দক্ষিণাঞ্চল থেকে নিউইয়র্কে এসেছিলেন সন্তানদের জন্য উন্নত জীবনের সুযোগ তৈরি করতে। তাঁরা কোনো অভিজাত বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ছিলেন না। বরং পরিবারের পরিশ্রম, ত্যাগ ও সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই ছিল তাঁদের প্রধান সম্বল। লেহম্যান কলেজে পড়াশোনার সময় নিজেকে ‘কর্মজীবী পরিবারের সন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করে জেমস বলেছেন, সেই সময় পড়াশোনা ও জীবনের নানা দায়িত্ব সামলাতে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
এই পারিবারিক বাস্তবতা তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে প্রভাবিত করেছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যা, বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে পরিচিত হন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে তিনি লেহম্যান কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবনের শুরু: আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে জেমস তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন লিগ্যাল এইড সোসাইটি-তে পাবলিক ডিফেন্ডার হিসেবে। এই কাজের মাধ্যমে তিনি এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান, যাঁদের অনেকেরই আইনি সহায়তা পাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্রুকলিন আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ভোক্তা অধিকার, প্রতারণা, নাগরিক অধিকার ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
সিটি কাউন্সিল থেকে পাবলিক অ্যাডভোকেট: ২০০৩ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ৩৫তম কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করেন। কাউন্সিল সদস্য হিসেবে আবাসন ও ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিয়ে তাঁর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর উদ্যোগে সেফ হাউজিং অ্যাক্ট প্রণীত হয়, যার মাধ্যমে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের ভবনগুলোর বাড়িওয়ালাদের বসবাসের পরিবেশ উন্নত করতে বাধ্য করার ব্যবস্থা করা হয়।
২০১৩ সালে তিনি নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট নির্বাচিত হন। এ পদে নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েন। পাবলিক অ্যাডভোকেট হিসেবে সরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, সাধারণ মানুষের অভিযোগ তুলে ধরা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় কাজ করেন। চাকরিতে নিয়োগের সময় আবেদনকারীর আগের বেতনের তথ্য জানতে চাওয়া নিষিদ্ধ করার আইন প্রণয়নেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বেতনবৈষম্য কমানো এবং কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
নিউইয়র্কের প্রথম নারী অ্যাটর্নি জেনারেল: ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এই পদে নির্বাচিত প্রথম নারী এবং নিউইয়র্কে অঙ্গরাজ্যব্যাপী কোনো পদে নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী। তাঁর এই অর্জন রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি বড় করপোরেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাঁর কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিউইয়র্কবাসীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে। ওপিওয়েড সংকটে ভূমিকার জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং অবহেলিত নার্সিং হোমগুলোর কাছ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আদায়ের কথাও তাঁর কার্যালয় জানিয়েছে।
প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই: জেমসের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি জালিয়াতির মামলা। নিউইয়র্কের একটি আদালত ২০২৪ সালে ট্রাম্প, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়ায় আর্থিক জরিমানার বিষয়ে পরিবর্তন এলেও আপিল আদালত জালিয়াতির মূল দায় নির্ধারণের বিষয়টি বহাল রাখে। মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধেও জেমস একাধিক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের সঙ্গে আইনি উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর কার্যালয়ের দাবি, নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, শিক্ষা ও ফেডারেল অর্থায়নের মতো বিষয়ে নিউইয়র্কবাসীর স্বার্থ রক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ৫০টির বেশি মামলা করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তায় কাজের দাবি: জেমসের নেতৃত্বে তাঁর কার্যালয় নিউইয়র্কের সড়ক থেকে ৯ হাজার ৫০০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র অপসারণ করেছে বলে সরকারি ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে। অবৈধ ও শনাক্তকরণ নম্বরবিহীন ‘ঘোস্ট গান’-এর বিস্তার ঠেকাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভোক্তা সুরক্ষায় শিকারি ঋণদাতা, হয়রানিমূলক ঋণ আদায়কারী ও অসাধু বন্ধকী ঋণদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফেয়ার বিজনেস প্র্যাাকটিস অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
বাড়ির মালিকদের দলিল জালিয়াতি থেকে রক্ষা, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, শিশুদের অনলাইন মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিয়েও তাঁর কার্যালয় কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।
চলছে পুনর্নির্বাচনের লড়াই: দীর্ঘ আইনগত ও রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে জেমস এখন নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি। ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক ও ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান ও কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী সারিথা কোমাতিরেড্ডি।
একটি সাধারণ কর্মজীবী পরিবার থেকে উঠে এসে আইনজীবী, সিটি কাউন্সিল সদস্য, পাবলিক অ্যাডভোকেট এবং অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল-জেমসের এই দীর্ঘ পথচলা তাঁর জীবনের অধ্যবসায় ও পেশাগত অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে তিনি যেমন আলোচনায় এসেছেন, তেমনি তাঁর কিছু পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কও রয়েছে। তবে তাঁর কর্মজীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার, ভোক্তা সুরক্ষা ও জবাবদিহির প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে।
ব্রুকলিনের এক কর্মজীবী পরিবারের সন্তান থেকে নিউইয়র্কের শীর্ষ আইন কর্মকর্তার পদে পৌঁছানো লেটিশিয়া জেমসের জীবন তাই সংগ্রাম, শিক্ষা, পেশাগত নিষ্ঠা ও জনসেবার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। 

ঠিকানা/এসআর



 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]