মিশিগানে ভোটের আগে ডেমোক্র্যাট নেতার দলবদল, পাল্টে যাচ্ছে হিসাব-নিকাশ

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০০:৩৫ , অনলাইন ভার্সন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্স। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তার এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে স্টিভেন্সের প্রশংসা করছেন রিপাবলিকান নেতারা।

মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইয়ে অংশ নিয়েছিলেন স্টিভেন্স। গত ৪ আগস্টের ওই নির্বাচনে আল-সায়েদের কাছে ১ শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে হেরে যান তিনি। এর পরও আল-সায়েদের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছিলেন স্টিভেন্স। কিন্তু রোববার সকালে ডেট্রয়েটের একটি কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের সঙ্গে উপস্থিত হয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দেন তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্ত তার বন্ধু, সহকর্মী এবং কংগ্রেসের নিজস্ব কার্যালয়ের কর্মীদেরও বিস্মিত করেছে। কারণ, শনিবার রাতেও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের তিনি জানিয়েছিলেন, আল-সায়েদের পক্ষেই থাকবেন।

স্টিভেন্সের দলবদলের পেছনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু এবং আল-সায়েদের প্রচারশিবিরের সঙ্গে তার দূরত্বকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আল-সায়েদের বিভিন্ন অবস্থান নিয়ে আগে থেকেই ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি অংশের আপত্তি ছিল।

রোববার রাতে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টিভেন্স বলেন, রজার্সকে সমর্থন করতে পারা তার জন্য স্বস্তির বিষয়। তার ভাষায়, ‘রজার্সকে সমর্থন করতে পারাটা ছিল আমার কাঁধ থেকে একটা মস্ত বড় বোঝা নেমে যাওয়ার মতো।’

কেন হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে স্টিভেন্স বলেন, ‘আব্দুল দিন দিন আরো বেশি রাগান্বিত ও উগ্র হয়ে উঠছেন।’

তার অভিযোগ, আল-সায়েদকে সমর্থন করতে চাওয়া অনেক ডেমোক্র্যাট নিজেদের প্রচারাভিযানে জায়গা পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন। তবে শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ঠিক কী কারণে তার সিদ্ধান্ত বদলে গেল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি স্টিভেন্স।

এর আগে স্টিভেন্সের দলবদল নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও তিনি এমন সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। গত সপ্তাহে তাকে রজার্সকে সমর্থন না করার অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন কয়েকজন কর্মী। তাদের একজনের বার্তা অনুযায়ী, স্টিভেন্স জবাবে লিখেছিলেন, ‘হায় ঈশ্বর, আপনি কেন ভাবলেন যে আমি এমনটা করব??!!’

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডেবি ডিঙ্গেলও জানিয়েছিলেন, শনিবার রাতে স্টিভেন্স তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে দল পরিবর্তন করবেন না। পরে স্টিভেন্সের সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় ডিঙ্গেল বলেন, ‘এটি আমার দেখা অন্যতম বেদনাদায়ক সাক্ষাৎকারগুলোর একটি ছিল।’

স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিনেটের ডেমোক্রেটিক নেতা চাক শুমার এবং সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। তারা দুজনই আল-সায়েদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

শুমার স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তুলে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা আল-সায়েদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। তার ভাষায়, আল-সায়েদ মিশিগানের কর্মজীবী পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থে লড়বেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ধনকুবের দাতাদের হাতের পুতুল।

শুমার আরও বলেন, রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে আল-সায়েদের বিরুদ্ধে চালানো বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও মিথ্যা আক্রমণের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধ।

পেলোসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আল-সায়েদকে জিততে হবে। স্টিভেন্স রজার্সকে সমর্থন করে মিশিগানের পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যসেবা, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোববার ডেট্রয়েটের একটি গির্জায় প্রার্থনা সভা শেষে স্টিভেন্স ও রজার্স সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভিড়ের মধ্য থেকে একজন চিৎকার করে বলেন, ‘হ্যালি একজন বিশ্বাসঘাতক!’

স্টিভেন্সের দলবদলের আগে সিএনএনের সর্বশেষ জরিপে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে আল-সায়েদ রজার্সের চেয়ে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। ডেমোক্রেটিক দলের সম্ভাব্য ভোটারদের ৯৫ শতাংশের সমর্থনও ছিল তার পক্ষে।

স্টিভেন্সের সমর্থন রজার্সের পক্ষে ভোটের সমীকরণে পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইহুদি ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রজার্স ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, মঙ্গলবারের নির্বাচনে তিনি ইহুদিদের ভোটের অর্ধেক পর্যন্ত পেতে পারেন।

তবে স্টিভেন্সের দলবদল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিভক্তি আরও বাড়ানোর বদলে তদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষও তৈরি করেছে। দলের ভেতরে আল-সায়েদের সমালোচক হিসেবে পরিচিত শুমার ও পেলোসি এখন তার পাশে দাঁড়িয়েছেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে স্টিভেন্সের দূরত্ব গত কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। প্রাথমিক নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর এক অনুষ্ঠানে আল-সায়েদের সঙ্গে কোলাকুলি করলেও তাদের মধ্যে আর যৌথ নির্বাচনী প্রচারণা দেখা যায়নি। রোববার ডেট্রয়েটের একটি কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় দক্ষিণ ক্যারোলাইনার প্রতিনিধি জিম ক্লাইবার্নের সঙ্গে আল-সায়েদের যৌথ উপস্থিতির পরিকল্পনা ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন জোরদার করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

স্টিভেন্সের দলবদলের জন্য তার বাগদত্তা, মিশিগানের আইনজীবী জেসন টার্কিশকেও দায়ী করছেন ডেমোক্র্যাটদের কেউ কেউ। গত সপ্তাহে টার্কিশ রজার্সকে সমর্থন করেছিলেন এবং আল-সায়েদের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।

তবে স্টিভেন্সের মা মারিয়া মার্কোটে বলেছেন, তার মেয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাগদত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, ‘হ্যালি নিজের সিদ্ধান্তে চলা একজন নারী। সে সব সময়ই তেমন ছিল। কোনো পুরুষ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন ইঙ্গিত করা তার জন্য অপমানজনক এবং একজন মা হিসেবে আমার জন্যও অপমানজনক।’

স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তের পর মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কার্টিস হার্টেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘কংগ্রেসওম্যান স্টিভেন্স মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টির বর্তমান সদস্য নন এবং ভবিষ্যতেও কখনো থাকবেন না।’

দলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সমঝোতার পক্ষে ভূমিকা রাখা ডেবি ডিঙ্গেলও স্টিভেন্সের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মনোযোগ আকর্ষণের অবিরাম প্রচেষ্টার কারণে স্টিভেন্স নিজেরই ক্ষতি করেছেন।

অন্যদিকে স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘হ্যালি এমন কিছু বলেছেন, যা খুব কম মানুষই বলার সাহস পান। তিনি যা করেছেন, তার মাধ্যমে মিশিগানের মহান জনগণের প্রতি অভূতপূর্ব ও মহান আনুগত্য দেখিয়েছেন।’

নির্বাচনের আগে স্টিভেন্সের এই অবস্থান পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে তার দলবদল মিশিগানের সিনেট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সূত্র : সিএনএন

ঠিকানা/এনআই
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]