যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ভোট, কংগ্রেস ও ক্ষমতার সমীকরণ

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৯ , অনলাইন ভার্সন
প্রেসিডেন্ট  ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের যাত্রার মাঝপথে আজ ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের সবগুলো এবং সেনেটের এক তৃতীয়াংশ আসনে এ ভোট হবে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, আইনপ্রণেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও বেছে নেবেন মার্কিন ভোটাররা।

এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো রদবদল ঘটবে না ঠিক, কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যদি ক্ষমতাসীনদের হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে বদলে যেতে পারে মার্কিন রাজনীতির বহু সমীকরণ।
Image
নাম কেন মধ্যবর্তী নির্বাচন?
মার্কিন ‘কংগ্রেসে’ কক্ষ দুটি। নিম্নকক্ষ হল ‘হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’ বা প্রতিনিধি পরিষদ; আর উচ্চকক্ষ হলো সেনেট।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় প্রতি চার বছর পরপর। আর কংগ্রেসের নির্বাচন হয় প্রতি দুই বছর অন্তর। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর, অর্থাৎ তার চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন হয়, সেটিই ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন নামে পরিচিত।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর এবং তার দুই বছর পর, অর্থাৎ দুই বছর পর পরই প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন ফাঁকা হয়ে যায়।

আর উচ্চকক্ষ সেনেটের সদস্যদের মেয়াদ থাকে ছয় বছর। তবে সব সেনেটরের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর সেনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা হয়। ফলে সেখানেও দুই বছর পর পর নির্বাচন হয়।

এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলোতেই ভোট হবে। সেনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ভোট হবে ৩৫টিতে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং ফ্লোরিডা ও ওহাইওতে দুটি ‘বিশেষ নির্বাচন’।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে যাওয়া আসন পূরণে এ নির্বাচন হচ্ছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১ আসন। সমান সমান হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভোট দেবেন। সেক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে রিপাবলিকানরা।

নির্বাচনের উদ্দেশ্য কী?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মূল্য উদ্দেশ্য মূলত কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব নতুন করে নির্ধারণ করা। এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তার ওপর নির্ভর করে প্রেসিডেন্টের খবরদারির সুযোগ।
এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের মূল্যায়ন বা তার প্রতি ভোটারদের সমর্থন যাচাইয়ের নির্বাচন হিসেবেও দেখা হয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতেও প্রেসিডেন্টের দলের জন্য এ ভোট কঠিন হয়ে উঠেছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টড বেল্টের তথ্যের বরাতে আল জাজিরা লিখেছে, ১৯৪৬ সালের পর থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারিয়েছে।

তবে এই নির্বাচনে শুধু প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা নয়, অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

ভোটার নিবন্ধন থেকে ফল গণনা
যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দিতে হলে সাধারণত আগে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে হয়। তবে ভোটার হওয়ার যোগ্যতা ও নিবন্ধনের নিয়ম অঙ্গরাজ্যভেদে আলাদা।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ভোটারকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে, নির্বাচনের দিন তার বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হবে।

নাগরিকত্ব না থাকলে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড থাকলেও ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়া যায় না। 
ভোটার নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে, ডাকযোগে কিংবা স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়ে সরাসরি আবেদন করা যায়।

সরকারের ভোটার নিবন্ধনবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ভোট ডট গভ’-এ অঙ্গরাজ্য বাছাই করে নিবন্ধনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে জানা যায়।
অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে ভোটার নিবন্ধনের জন্য পরিচয়পত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য সরবরাহ করতে হয়। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে ব্যাংক বিবরণী বা ইউটিলিটি বিলও গ্রহণ করা হয়।

সব অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধনের সময়সীমা এক নয়। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের দিনও ভোটার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার কোথাও ভোটের প্রায় ৩০ দিন আগেই নিবন্ধনের সময় শেষ হয়ে যায়। নর্থ ডাকোটায় ভোটার নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা নেই। সেখানে যোগ্য ভোটাররা সরাসরি ভোট দিতে পারেন।

নিবন্ধিত ভোটাররা সাধারণত তিনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান— নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে গিয়ে, আগাম ভোটের মাধ্যমে অথবা ডাকযোগে ব্যালট পাঠিয়ে।

আগাম ভোট
নির্বাচনের নির্ধারিত দিনের আগেই সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাকে আগাম ভোট বলা হয়। অনেক অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে এই সুযোগ থাকে। কোথাও স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়ে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া যায়। এতে নির্বাচনের দিন ব্যস্ততা বা অন্য কারণে কেন্দ্রে যেতে না পারলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে।

তবে আগাম ভোটের সময়সূচি, কেন্দ্রের সংখ্যা এবং ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সব অঙ্গরাজ্যে এক নয়। কোনো অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে এ ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়, আবার কোথাও সময়সীমা তুলনামূলক কম।

ডাকযোগে ভোট
ভোটাররা চাইলে ডাকযোগে ব্যালট নিয়ে ভোট দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভোটারকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কার্যালয়ে আবেদন করে ব্যালট সংগ্রহ করতে হয়। কিছু অঙ্গরাজ্যে যেকোনো ভোটার কারণ না দেখিয়েই ডাকযোগে ভোট দেওয়ার আবেদন করতে পারেন। কোনো অঙ্গরাজ্যে অসুস্থতা, প্রতিবন্ধী, বেশি বয়স, নির্বাচনের দিন নিজ এলাকায় না থাকা কিংবা সামরিক দায়িত্ব পালনের মতো কারণ দেখাতে হয়।

আবার কিছু অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়। ব্যালট পাওয়ার পর ভোটারকে নির্ধারিত নিয়মে পছন্দের প্রার্থীর পাশে চিহ্ন দিতে হয়। এরপর সেটি নির্দিষ্ট খামে ভরে ডাকযোগে বা নির্ধারিত জমা দেওয়ার স্থানে পৌঁছে দিতে হয়। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে খামের সঙ্গে ভোটারের সই, সাক্ষীর সই কিংবা নোটারির সত্যায়নও প্রয়োজন হয়।

ডাকযোগে ভোটের ক্ষেত্রে ব্যালট ফেরত পাঠানোর সময়সীমা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও নির্বাচনের দিনের মধ্যে ব্যালট নির্বাচন কার্যালয়ে পৌঁছাতে হয়, আবার কোথাও নির্বাচনের দিন বা তার আগে ডাকের সিল পড়লে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছানো ব্যালট গণনায় নেওয়া হয়।

ভোটকেন্দ্রে ভোট
নির্বাচনের দিন ভোটাররা নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন। ভোটার নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করে তাদের ব্যালট দেওয়া হয়। অঙ্গরাজ্যভেদে পরিচয়পত্র দেখানোর নিয়মও আলাদা। কোথাও ছবি সংবলিত পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, কোথাও অন্য পরিচয়পত্র বা বিকল্প পদ্ধতিতে পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।

ভোটাররা ব্যালটে প্রার্থী বা প্রস্তাবের পাশে পছন্দের চিহ্ন দেন। অনেক জায়গায় কাগজের ব্যালট ব্যবহৃত হয়, আবার কোথাও ইলেকট্রনিক ভোটিং যন্ত্রে ভোট নেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রে ভোট দেওয়ার পর কাগজের রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয়। ভোট দেওয়া শেষে ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দেওয়া হয় অথবা যন্ত্রে ভোট সংরক্ষিত হয়।

নিবন্ধিত ভোটারের যোগ্যতা বা পরিচয় নিয়ে ভোটকেন্দ্রে তাৎক্ষণিক কোনো প্রশ্ন দেখা দিলে অনেক অঙ্গরাজ্যে ‘প্রভিশনাল ব্যালট’ বা শর্তসাপেক্ষ ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোটারের তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেন, সেই ভোট গণনায় যুক্ত হবে কি না।

ভোটের দায়িত্ব কার, নিয়মই ঠিক করে কারা?
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব কোনো একক জাতীয় নির্বাচন কমিশনের হাতে কেন্দ্রীভূত নয়। দেশটির নির্বাচনব্যবস্থা মূলত বিকেন্দ্রীভূত। ফেডারেল সরকার কিছু সাধারণ মানদণ্ড ও আইন নির্ধারণ করলেও ভোটার নিবন্ধন থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ, ব্যালট গণনা ও ফল চূড়ান্ত করার অনেক কাজই অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করে।

প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে একজন প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালন করেন অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট। তবে কোথাও নির্বাচন বোর্ড বা কমিশনও দায়িত্ব পালন করে। অঙ্গরাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নির্বাচন পরিচালনার নীতিমালা তদারক করেন এবং স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেন।

সাধারণত কাউন্টি বা শহর পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তারাই মাঠপর্যায়ে নির্বাচন আয়োজন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনি প্রশাসনিক এলাকা ১০ হাজারের বেশি।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কর্মীরাও নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এসব কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।

নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, নিবন্ধন যাচাই, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, ব্যালট ছাপানো ও বিতরণ, ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম প্রস্তুত এবং নির্বাচনকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ তাদের করতে হয়। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র পরিচালনা, ভোটারের পরিচয় যাচাই, ব্যালট সরবরাহ ও ভোট গ্রহণের দায়িত্বও তাঁদের।

নির্বাচনের নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রেও অঙ্গরাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, ফেডারেল আইন এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় আইন নির্বাচনের জন্য কিছু বাধ্যতামূলক শর্ত নির্ধারণ করে। ভোটাধিকার সুরক্ষা, ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনি প্রযুক্তি ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুযোগ নিশ্চিত করার মতো বিষয়ে এসব আইন কার্যকর। তবে এর বাইরে নির্বাচনের অনেক পদ্ধতি নির্ধারণ করে অঙ্গরাজ্যগুলো।

এ কারণে এক অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে অন্য অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনি ব্যবস্থায় বেশ পার্থক্য দেখা যায়। ভোটার নিবন্ধনের শেষ সময়, পরিচয়পত্র দেখানোর নিয়ম, আগাম ভোটের সময়কাল, ডাকযোগে ব্যালট পাওয়ার যোগ্যতা, ব্যালট ফেরত দেওয়ার সময়সীমা— সব ক্ষেত্রেই পার্থক্য থাকতে পারে। এমনকি একই অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনি এলাকাতেও কিছু নিয়মের ভিন্নতা দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (এফইসি) ভোটের প্রচারের অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অনুদানসংক্রান্ত আইন তদারক করে। কিন্তু ভোটার নিবন্ধন, ভোট গ্রহণ কিংবা নির্বাচনের ফল নির্ধারণের দায়িত্ব তাদের নয়। অন্যদিকে ইউএস ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশন বা ইএসি নির্বাচনি সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নির্বাচন পরিচালনার মানোন্নয়নে সহায়তা করে। তারাও ভোটের দায়িত্বে সরাসরি থাকে না।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনগত কাঠামো থাকলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের। এ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব হয়, তবে একই নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম ও প্রক্রিয়ার পার্থক্যও তৈরি হয়।

গণনা ও ফল প্রকাশ
যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই নির্বাচনের ফল প্রকাশ শুরু হয়। তবে নির্বাচনের রাতে প্রকাশিত ফলকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কারণ, ভোটকেন্দ্রে দেওয়া ভোটের পাশাপাশি ডাকযোগে আসা ব্যালট, আগাম ভোট এবং শর্তসাপেক্ষ ব্যালটের হিসাবও চূড়ান্ত গণনায় যুক্ত করতে হয়।

ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর ব্যালট ও ভোটের ইলেকট্রনিক রেকর্ড নিরাপদে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে ভোট গণনা করে প্রাথমিক ফল প্রকাশ করা হয়। গণমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রের ফল বিশ্লেষণ করে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারে। তবে সেটি তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস বা হিসাব; আনুষ্ঠানিক ফল নয়।

এরপর শুরু হয় ফল যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় ‘ক্যানভাস’। এ পর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তারা ভোটের সংখ্যা, ভোটার উপস্থিতি এবং জমা পড়া ব্যালটের হিসাব মিলিয়ে দেখেন। ডাকযোগে আসা ব্যালট, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও বিদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের ভোট এবং শর্তসাপেক্ষ নেওয়া ভোটের ব্যালটের বৈধতা যাচাই করে সেগুলো গণনায় যুক্ত করা হয়।

ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের ক্ষেত্রে ভোটারের নিবন্ধন ও খামের স্বাক্ষর যাচাই করা হতে পারে। কোনো ব্যালটে তথ্যের ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী তা সংশোধনের সুযোগও দেওয়া হয়। এ কারণে নির্বাচনের রাতের পরও ভোটের সংখ্যা ও ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে।

কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের পর ভোট গণনার পাশাপাশি নিরীক্ষাও করা হয়। ভোট গণনার যন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করেছে কি না এবং ফলাফলে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা এর উদ্দেশ্য।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান খুব কম হলে অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী পুনর্গণনারও সুযোগ রয়েছে। পুনর্গণনায় ফল পরিবর্তিত হতে পারে।

সব যাচাই, গণনা ও নিরীক্ষা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারা ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘সার্টিফিকেশন’।

স্থানীয় পর্যায়ে ফল যাচাইয়ের পর অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ তা চূড়ান্ত করে। অঙ্গরাজ্যভেদে এই দায়িত্ব কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তা, নির্বাচন বোর্ড কিংবা অন্য কোনো নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ পালন করে।

ইউএস ইলেকশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্বাচনের রাতে শতভাগ কেন্দ্রের ফল প্রকাশিত হলেও সেটি চূড়ান্ত ফল নয়। সব বৈধ ভোটের হিসাব যুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় যাচাই শেষ হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হয়।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না থাকায় ফল চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে ইলেকটোরাল কলেজের কোনো ভূমিকা নেই। কংগ্রেস, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পদগুলোর নির্বাচনের ফল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নেই চূড়ান্ত হয়।

কংগ্রেস ছাড়া আর কী কী ভোট হয়?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা শুধু কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচন করেন না। একই দিনে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পদেও ভোট হয়।

এবারের নির্বাচনে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত হবেন। পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনিক পদ এবং নাগরিকদের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য একাধিক প্রস্তাব বা গণভোটও ব্যালটে থাকতে পারে।

গভর্নর নির্বাচন
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রধান নির্বাহী হলেন গভর্নর। অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা, বাজেট বাস্তবায়ন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রম তদারক এবং অঙ্গরাজ্যের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে গভর্নর নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এবার ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচন বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। এসব নির্বাচনের ফল সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।

অঙ্গরাজ্যের আইনসভা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব আইনসভা রয়েছে। অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে আইনসভা দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। এসব নির্বাচনে ভোটাররা স্থানীয় আইনপ্রণেতা নির্বাচন করেন। তাঁদের কাজের মধ্যে রয়েছে অঙ্গরাজ্যের জন্য আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গভর্নরের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি
কাউন্টি, শহর ও পৌর এলাকার বিভিন্ন পদেও নির্বাচন হয়। মেয়র, কাউন্টি কমিশনার, শেরিফ, স্কুল বোর্ডের সদস্যসহ বিভিন্ন স্থানীয় দায়িত্বশীল পদে ভোট নেওয়া হতে পারে। এসব পদে নির্বাচিত ব্যক্তিরা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, জনসেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক নাদিয়া ব্রাউন আল জাজিরাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন বেশি মনোযোগ পেলেও অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক সরকারের সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ করেন স্থানীয় রাজনীতির মাধ্যমে। স্থানীয় প্রস্তাব বা গণভোটের সিদ্ধান্ত তাদের প্রতিদিনের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

গণভোট ও স্থানীয় প্রস্তাব
অনেক অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের দিন বিভিন্ন আইন, নীতি বা স্থানীয় প্রকল্প নিয়ে ভোটারদের মতামত নেওয়া হয়। এসব প্রস্তাবের মধ্যে করের হার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা সামাজিক নীতিসংক্রান্ত বিষয় থাকতে পারে। ভোটাররা ব্যালটে এসব প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন। এ ধরনের ভোটকে সাধারণত ‘ব্যালট মেজার’ বা ‘প্রপোজিশন’ বলা হয়। অঙ্গরাজ্যভেদে এগুলোর নাম ও পদ্ধতি আলাদা। কোনো প্রস্তাব পাস হলে তা সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন বা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে ৩ নভেম্বরের এই ভোটের ফল শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেই প্রভাবিত করবে না, বরং অনেক অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় এলাকার প্রশাসনিক গতিপথও নির্ধারণ করবে।

ঠিকানা/এসআর

 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]