প্রবল চাপের মুখে তাওহিদ হৃদয়ের অবিস্মরণীয় ব্যাটিংয়ে ডাবল সেঞ্চুরি

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২০:২১ , অনলাইন ভার্সন
ফিল সিমন্স এমনিতে বেশ নির্লিপ্ত ধরনের মানুষ। আবেগের প্রকাশ তার কম। দলীয় বা ব্যক্তিগত- কোনো সাফল্য উদযাপনেই খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায় না তার। তবে ব্যতিক্রম চিত্র সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন। তাওহিদ হৃদয় দ্বিশতক পূর্ণ করতেই ড্রেসিং রুম থেকে বারান্দায় চলে এলেন বাংলাদেশের প্রধান কোচ। মুখে তখন স্বস্তির হাসি। দিয়ে অভিবাদন জানালেন দলকে উদ্ধার করা ব্যাটসম্যানকে। পরে সংবাদ সম্মেলনেও সিমন্সের কণ্ঠে বয়ে গেল হৃদয়ের জন্য স্তুতির জোয়ার।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শনিবার রূপকথার গল্পই লিখেছেন হৃদয়। স্বীব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার মিছিলে একপ্রান্ত আগলে রেখে ২৪২ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছেন ২৬ ছুঁইছুঁই ব্যাটসম্যান। তার ব্যাটিংয়েই খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।

অথচ কিছুই ছিল না হৃদয়ের পক্ষে। মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসেই বাজেভাবে আউট হওয়ায় অঘোষিত খলনায়ক ছিলেন তিনিই। পরে বাকিদের ব্যর্থতায় সিলেটেও দলের পরিস্থিতিও চলে যায় তার প্রতিকূলে। কঠিন চাপের মুখে তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদকে নিয়ে দারুণ দুটি জুটিতে তিনি দলকে এনে দিয়েছেন লিড।

দিনের প্রথম সেশনে একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের সবার আসা-যাওয়া দেখেন হৃদয়। অন্য প্রান্তে রানের চাকা সচল রেখেই খেলতে থাকেন তিনি। লাঞ্চের পর পুরো দায়িত্বই তিনি নেন নিজের কাঁধে।

একপর্যায়ে ৩ উইকেটে ১২৪ রান নিয়ে মোটামুটি স্বস্তির জায়গায়ই ছিল বাংলাদেশ। তবে মুশফিকুর রহিম, লিটন কুমার দাস, মেহেদী হাসান মিরাজরা হতাশ করলে পরের ৬০ রানের মধ্যে বাংলাদেশ হারায় ৪ উইকেট। ৭ উইকেটে ১৮৪ রানে তখন দলের সামনে বড় লিডের নিচে চাপা পড়ার শঙ্কা।

ততক্ষণে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি করে উইকেটে থিতু হৃদয়। সেটিই তিনি কাজে লাগান তাইজুলের সঙ্গে জুটিতে। নিজের কাছে বেশিরভাগ সময় স্ট্রাইক রেখে সমান তালে রান করতে থাকেন মিডল-অর্ডার এই ব্যাটসম্যান। ১৬৭ বলের জুটিতে তাইজুল মোকাবিলা করেন ৫৬ বল।

তাইজুলকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রান যোগ করার পথে কখনোই খোলসে ঢুকে যাননি হৃদয়। বরং সুযোগ পেলেই আদায় করেন বাউন্ডারি। আর ওভারের পঞ্চম বা শেষ ডেলিভারিতে এক রান নিয়ে নিজের কাছে রাখেন স্ট্রাইক।

দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েই দলকে তিনশ পার করান হৃদয় আর নিজে পৌঁছে যান ডাবল সেঞ্চুরির কাছে। পরে তাইজুল ফিরলে তাড়াহুড়ো না করে আরও ধৈর্য ধরে এগিয়ে নেন দলকে। নবম উইকেটে তারা যোগ করেন ১২১ বলে ৮৫ রান। যেখানে তাসকিনের অবদান ২৮ বলে ১২!

শেষ পর্যন্ত তাসকিন আউট হওয়ায় আড়াইশ বা আরও বড় ইনিংস খেলা সম্ভব হয়নি হৃদয়ের। লড়াকু ব্যাটিংয়ে ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২ চারের সঙ্গে ১১ ছক্কা মেরে অপরাজিত থেকে যান তিনি। তার বীরোচিত ইনিংসে দলও পৌঁছে যায় নিরাপদ অবস্থানে।

দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তাই হৃদয়ের প্রশংসায় কার্পণ্য করেননি সিমন্স।

“অসাধারণ ইনিংস। অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। সীমানায় ফিল্ডার থাকার পরও সে (হৃদয়) জায়গা খুঁজে বের করে বাউন্ডারি মারছিল... ছক্কা মারছিল, এমনকি ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পরও। ডাবল সেঞ্চুরির কাছাকাছি গিয়ে বোঝা যাচ্ছিল, সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবুও সব দিক বিবেচনায় এটি দুর্দান্ত ইনিংস।

“খেলার পরিস্থিতি বোঝা, ঠিক কোন শটটি খেলা উচিত, তা জানা, কিংবা শেষ তিন ব্যাটসম্যানের সঙ্গে স্ট্রাইক ভাগাভাগি করার সময়জ্ঞান- এই ইনিংসে প্রতিটি কাজই অসাধারণ দক্ষতায় সামলেছে।”

এমনিতে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে কখনও উচ্চবাচ্য করেন না বাংলাদেশের প্রধান কোচ। পরিস্থিতির কারণেই হৃদয়কে প্রশংসায় ভাসান তিনি। একইসঙ্গে মনে করিয়ে দেন, সংকটময় মুহূর্তে ক্রিকেটারদের কাছ থেকে এমন কিছুরই চাওয়া থাকে দলের।

“ক্রিকেটারদের কাছে আমাদের চাওয়াটাই ছিল এমন, সুযোগ পেলে সেটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। কেউ যখন মাঠে আছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তার। দলের যা প্রয়োজন সেটাই করতে হবে। সে ঠিক সেই মুহূর্তেই দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছে এবং দল হিসেবে আমাদের যা চাওয়া ছিল, তার সবই করে দেখিয়েছে।”

৩ উইকেটে ১২৪ থেকে ৭ উইকেটে ১৮৪ হওয়ার পর অন্যপ্রান্তে আর স্বীকৃত ব্যাটসম্যান পাননি হৃদয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময়ই দেখা দেয় দ্বিধা। পাল্টা আক্রমণে দ্রুত রান তোলা নাকি লেজের সারির ব্যাটসম্যানকে নিয়েই লড়াই করে যাওয়া- সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রায়ই নেমে আসে আরও বিপর্যয়।

এসব ক্ষেত্রে ড্রেসিং রুম থেকে সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সিমন্স নিশ্চিত করলেন, অতিমানবীয় ইনিংস খেলার পথে হৃদয়ের জন্য ছিল না এমন কোনো বার্তা।

“নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যাটসম্যানদের কীভাবে খেলা উচিত, তা নিয়ে আমরা ড্রেসিংরুম থেকে বার্তা পাঠাই না। বাউন্ডারি লাইন পার হওয়ার পর মাঠের দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। তাদের মাথায় এটাই ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি, উইকেটে যখন খেলছেঅ,, তখন সিদ্ধান্তও তোমার। আমি তো ড্রেসিংরুমে বসে নির্দেশনা দিতে পারব না। সে যা করেছে, নিজের বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত থেকেই করেছে। মুশফিক ও তাইজুলদের সঙ্গে জুটি গড়ে ওভাবেই পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছে।”

গত মে মাসে সিলেটেই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রায় একই পরিস্থিতিতে পড়েন লিটন কুমার দাস। সেবারও তাইজুল ও তাসকিনকে নিয়ে লড়াই করে সেঞ্চুরি উপহার দেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশও পায় লড়াই করার পুঁজি।

ওই ম্যাচের অভিজ্ঞতা থেকেই শনিবার প্রথম সেশনের বিপর্যয়ে বিচলিত হননি সিমন্স।

“আমাদের ড্রেসিংরুমে এমন ক্রিকেটার আছে যারা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। এখানে (সিলেটে) গতবার যখন খেলেছিলাম, লিটন প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতিতে নেমে সেঞ্চুরি করেছিল। আমাদের সবসময় এই বিশ্বাসটা থাকে, পরে যে নামছে, সে দলের চাহিদামতো পারফর্ম করতে প্রস্তুত।”

অথচ হৃদয়ের জন্য পরিস্থিতি একদম সহজ ছিল না। মিরপুরে প্রথম ইনিংসে ৪২ রানে থাকতে অহেতুক বড় শট খেলতে গিয়ে বিলিয়ে দেন উইকেট। পরের ইনিংসে দলের আরও চাপের মুখে ব্যাখ্যাতীত এক শট খেলে রীতিমতো আত্মাহুতিই দেন তিনি।

তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের পরাজয়ের পর চতুর্মুখী সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হন ২৬ ছুঁইছুঁই এই ব্যাটসম্যান। সেখান থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েই সিলেটে তিনি গড়লেন ইতিহাস।

এমন ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনের রহস্য জানা নেই সিমন্সের। তবে তার মতে, খুব দ্রুতই শিখছেন হৃদয়।

“আমার মনে হয় হৃদয়ের সঙ্গে যখন কথা বলার সুযোগ হবে, প্রশ্নটা তাকেই করা ভালো। কারণ এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনের রহস্যটা কেবল সে-ই ব্যাখ্যা করতে পারবে।

“তবে শুরু থেকে সে দারুণ ব্যাটিং করছিল। হ্যাঁ, ঢাকায় সে একাধিক বেপরোয়া শট খেলেছিল। কিন্তু ওটা ছিল তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট, তাই না? ফলে তাকে কাঠগড়ায় তোলা যায় না। আমার ধারণা, ও খুব দ্রুত পরিণত হয়ে উঠছে। আজ মাঠে সেটাই দেখলাম।”

ঠিকানা/এসআর

 
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]