আনচেলত্তির হাত ধরে হেক্সার পথে নতুন ব্রাজিল

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১০:০২ , অনলাইন ভার্সন
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ‘ব্রাজিল’ নামটাই এক চিরন্তন রোমাঞ্চের নাম। সেই নামের জোয়াড়ে কিছুটা ভাটা পড়েছে। চিরচেনা সেই ছন্দে নেই সবচেয়ে বেশি পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। গত কয়েক আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল যেনো নিয়তি হয়ে গেছে সেলেসাওদের। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও পুড়েছে সেই ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’ ট্র্যাজেডিতেই

২০২২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালের ক্রোয়েট ট্র্যাজেডি ভুলে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফির খোঁজে সেলেসাওরা এবার পা রেখেছে উত্তর আমেরিকার মাটিতে। রেকর্ড বিশ্বকাপের টানা ২৩তম আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দল ব্রাজিল।

সাম্প্রতিক সময়টা ভালো না গেলেও কাকতালীয় এক রেকর্ড আশার সঞ্চার করেছে ব্রাজিল শিবিরে। ১৯৭০ সালের পর দীর্ঘ ২৪ বছর তারা শিরোপাহীন ছিল, আর সেই খরা কেটেছিল ১৯৯৪ সালে এই আমেরিকার মাটিতেই।

এবার ২০০২ সালের শেষ ট্রফি জয়ের পর ঠিক ২৪ বছর পেরিয়েছে এবং মঞ্চটাও সেই উত্তর আমেরিকা। তাই কোটি ফুটবল ভক্তের বিশ্বাস, এবার আমেরিকার মাটিতেই বৃত্ত পূরণ করে ষষ্ঠ নক্ষত্রটি জার্সিতে জড়াবে সেলেসাওরা।

ডাগআউটে ডন কার্লো আনচেলত্তি
রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউট ছেড়ে ২০২৪/২৫ মৌসুমের শেষে ব্রাজিলের হাল ধরেছেন ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সফলতম ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সেলেসাওদের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিদেশী প্রধান কোচ।

ব্রাজিলের সঙ্গে অবশ্য আনচেলত্তির ভাগ্য অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির সহকারী কোচ হিসেবে ব্রাজিলের কাছে হেরে টাইব্রেকারে ট্রফি হাতছাড়া করার বেদনা দেখেছিলেন তিনি। এবার সেই ব্রাজিলের ডাগআউটে বসেই বিশ্বজয়ের মিশন সাজাচ্ছেন ‘ডন কার্লো’।

বাছাইপর্বে ব্রাজিল
লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি ব্রাজিল। বারবার কোচ আর অধারাবাহিকতা শেষে কনমেবল অঞ্চল থেকে পঞ্চম স্থানে থেকে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চত করে ব্রাজিল।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ম্যাচ সূচি
গ্রুপ পর্বে আফ্রিকা, ওশেনিয়া এবং ইউরোপীয় মহাদেশের দলের বিপক্ষে লড়বে ব্রাজিল। ১৩ জুন নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আফ্রিকার দেশ মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে ব্রাজিল। ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি। ২৪ জুন মায়ামি স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল।

পজিশনভিত্তিক স্কোয়াডের গভীরতা
চোট ও নানা নাটকীয়তা শেষে আনচেলত্তির ঘোষিত ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রতিভার এক চোখধাঁধানো ভারসাম্য দেখা গেছে। লিভারপুলের অ্যালিসন এবং ফেনারবাহচের এডারসনের মতো বিশ্ব সেরা দুই গোলরক্ষক থাকায় ব্রাজিলের পোস্ট বরাবরের মতোই দুর্ভেদ্য দেওয়াল। তবে প্রথম পছন্দ হিসেবে থাকবেন অ্যালিসনই।

পিএসজির মার্কিনিয়োস এবং আর্সেনালের গাব্রিয়েল মাগালিয়াইসের সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি বক্সে পাহাড়সম দেয়াল তুলে দাঁড়াবে। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্স জুটি এই দুজনের। তাদের সঙ্গে দানিলোর মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ও ইবানেজের মতো তরুণ তুর্কি ডিফেন্সে গতি বাড়াবেন। যদিও ওয়েসলির ছিটকে যাওয়া ব্রাজিলের ডিফেন্সে কিছুটা শক্তি কমিয়েছে।

মাঝমাঠে ক্যাসেমিরোর অভিজ্ঞতার পাশে ব্রুনো গিমারায়েসের গতি খেলা নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে আসল বিস্ফোরণ আক্রমণভাগে! বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই ফরোয়ার্ড রয়েছে ব্রাজিলের স্কোয়াডে— ভিনিসিয়াস জুনিয়র আর রাফিনিয়া। তাদের সঙ্গে গোল করায় পটু ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের গত মৌসুমের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ইগোর থিয়াগো।

বিস্ময় বালক এন্দ্রিক, গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, লুইস হেনরিক, ম্যাথিউস কুনিয়ারাও যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। চোটের কারণে প্রথম ম্যাচে না থাকলেও দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে নেইমারের ফেরা প্রতিপক্ষের চিন্তা বাড়াবে।

স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
ভিনিসিয়াসের বিধ্বংসী ড্রিবলিং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক অস্ত্র। তার সঙ্গে রাফিনিয়া আর গোল করায় পটু ইগোর থিয়াগো ব্রাজিলের স্কোয়াডের বড় শক্তির জায়গায়।

সেই সঙ্গে আনচেলত্তির ঠান্ডা মাথায় বড় ম্যাচের কৌশল সাজানোর ক্ষমতা ব্রাজিলের গত কয়েকটি বিশ্বকাপের চিরচেনা ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

তবে ব্রাজিলের এই স্কোয়াডে বেশ কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেগুলো সেলেসাওদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমার টুর্নামেন্টের টানা হাই-ইনটেনসিটি ম্যাচগুলোতে কতটা ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, তা বড় চিন্তার বিষয়।

একই সঙ্গে দুই উইঙ্গার ভিনিসিয়াস আর রাফিনিয়া ক্লাবের হয়ে দারুণ সময় পার করলেও ব্রাজিলের জার্সিতে সেই ফর্ম দেখাতে পারেন না তারা। যেটি হলুদ শিবিরের জন্য চিন্তার কারণ। একই সঙ্গে নকআউট ম্যাচে টাইব্রেকারে গেলে পেনাল্টি শট এবং সেভ করা দুটোই ব্রাজিলের দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো।   

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলে, জায়েরজিনহো, তোস্তাও ও রিভেলিনোদের নিয়ে গড়া অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন সেই দলটিকে আজও ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা স্কোয়াড হিসেবে গণ্য করা হয়।

স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ শিরোপা জয়ের কীর্তি : ফুটবলে ইতিহাসে ব্রাজিলই একমাত্র দল যারা পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছে। পাঁচবার চ্যাম্পিয়নের মুকুট পড়েছে।
সব আসরে অংশ নেওয়ার একমাত্র দল : ব্রাজিলই একমাত্র দল যারা ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের সবগুলো আসরেই অংশ নিয়েছে। এবার নিয়ে তারা টানা ২৩টি আসরে অংশ নিচ্ছে।

ফেনোমেনন রোনালদোর গোলবন্যা : ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৪টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১৫টি গোল করে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো নাজারিও। ২০০২ সালের ফাইনালে তার জোড়া গোলেই জার্মানিকে হারিয়েছিল ব্রাজিল।

অধিনায়ক কাফুর অনন্য কীর্তি : ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রাইট-ব্যাক কাফু ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২০টি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক।

সবচেয়ে বড় জয় ও মারাকানাজোর ক্ষত : ১৯৫০ সালের ঘরের মাঠে সুইডেনকে ৭-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটিই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। যদিও সেবার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরে ‘মারাকানাজো’ ট্র্যাজেডির শিকার হতে হয়েছিল তাদের।

২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ব্রাজিলকে নিয়ে আলোচনা কিছুটা কম। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের চেনা ছন্দে নেই ব্রাজিল। তবে কার্লো আনচেলত্তির কৌশল আর নেইমার, ভিনিসিয়াস, রাফিনিয়া, ইগোর থিয়াগোদের ওপর ভর করে মিশন ‘হেক্সা’ পূরণ করার লক্ষ্য ব্রাজিলের। ঠিক যেমনটা ১৯৯৪ বিশ্বকাপে এই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই ২৪ বছর পর শিরোপা খরা ঘুচিয়েছিল সেলেসাওরা। পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে দলের প্রাণভোমড়া নেইমারকে ট্রফি দিয়ে বিদায় দিতে চাইবে ব্রাজিল।

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল

গোলরক্ষক : আলিসন, এডারসন মরিস, ওয়েভারটন

ডিফেন্ডার : অ্যালেক্স সান্দ্রো, ব্রেমার, দানিলো, ডগলাস সান্তোস, গাব্রিয়েল মাগালিয়াইস, ইবানেজ, লেও পেরেইরা, মার্কিনিয়োস

মিডফিল্ডার : এডারসন, ব্রনো গুমাইরেস, ক্যাসেমিরো, দানিলো সিনিয়র, ফ্যাবিনিও, লুকাস পাকুয়েতা

ফরোয়ার্ড : এন্দ্রিক, গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, ইগোর থিয়াগো, লুইস হেনরিক, ম্যাথিউস কুনিয়া, নেইমার জুনিয়র, রাফিনিয়া, রায়ান ও ভিনিসিয়াস জুনিয়র

ঠিকানা/এসআর
Thikana
M M Shahin, Chairman, Board of Editors, Thikana
Corporate Headquarter
THIKANA : 7409 37th Ave suite 403 Jackson Heights, NY 11372
Phone : 718-472-0700/2428, 718-729-6000
Fax: + 1(866) 805-8806
Bangladesh Bureau
THIKANA : 70/B, Green Road, (Panthapath), 5th Floor, Dhaka, BD.
E-Mail : [email protected]
For Advertisement : [email protected]