আজ ২১ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ও বেদনাবিধুর দিন। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের এই দিনে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ঘটে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। মুহূর্তের মধ্যে একটি প্রাণচঞ্চল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপ ও আর্তনাদের জনপদে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর ১টা ৬ মিনিটে বিমানবাহিনী ঘাঁটি বীর উত্তম এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়ন করে চীন থেকে সংগ্রহ করা এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি। নিজের প্রথম একক উড্ডয়ন মিশনে ছিলেন তরুণ বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম (সাগর)। উড্ডয়নের প্রায় ১২ মিনিট পর বিমানটিতে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জনবহুল এলাকা এড়িয়ে বিমানটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন পাইলট। তবে অত্যন্ত কম উচ্চতায় থাকায় তিনি ইজেক্ট করার সুযোগ পাননি।
দুপুর আনুমানিক ১টা ১৮ মিনিটে যুদ্ধবিমানটি প্রথমে মাইলস্টোন কলেজের সাততলা ভবন-৭-এর ছাদে আঘাত হানে। এরপর সেটি আছড়ে পড়ে দুই তলা হায়দার আলী ভবনের ওপর। বিকট বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশে। প্রধান ফটক, সিঁড়ি ও নিচতলার বড় একটি অংশ মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। অনেক শিক্ষার্থী তখন ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ৩৬ জন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল শিশু শিক্ষার্থী। আহত ও দগ্ধ হন অন্তত ১৭১ জন, যাদের অনেকেই দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং কেউ কেউ স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হন।
দুর্ঘটনার দিন অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বের করে আনেন। পরে ধোঁয়া, আগুন ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়। আহত শিক্ষিকা মাহফুজা খাতুনও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁদের আত্মত্যাগ আজও মানুষের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষ উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসায় গড়ে ওঠে মানবিক সহায়তার নজির। রক্তদানে এগিয়ে আসেন অসংখ্য মানুষ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোক ও সহমর্মিতার বার্তা।
আজ সেই বিভীষিকাময় ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, নীরবতা পালন, স্মৃতিচারণ এবং ফুলেল শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্বজনরা হারিয়ে যাওয়া প্রাণগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। অনেক অভিভাবকের চোখে আজও অশ্রু, অনেক সহপাঠীর মনে এখনও ভেসে ওঠে সেই ভয়াল দুপুরের স্মৃতি।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত এখনো শুকায়নি। এই দিনটি শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়; এটি নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তারও এক গভীর স্মারক। নিহত শিশু, শিক্ষক, বৈমানিক এবং সব ভুক্তভোগীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ পুরো দেশ তাদের স্মরণ করছে।