প্রখ্যাত লেখিকা আনাইস নিনের (Anais nin) উক্তি, ‘Each friend represents a world in us.’ প্রতিটি বন্ধু আমাদের ভেতরে একটি নতুন জগৎ বা সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রতিটি বন্ধু ভিন্ন। চলা-ফেরা, ব্যক্তিত্বও ভিন্ন। বন্ধুত্বের প্রয়োজনে বন্ধুত্ব। বন্ধু এমন একটি ভুবন-যেখানে মা-বাবা-ভাই-বোন আরও অনেকেরই উপস্থিত নেই। বন্ধু জীবনকে আলোকিত করে। উদার দৃষ্টিভঙ্গি মেলে ধরে। বন্ধু মানে শেয়ারিং-অনেক সুন্দর মুহূর্ত একসঙ্গে কাটানো। বন্ধু মানে অনেক কিছু।
জীবনে চলার পথে বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা আছে। যখন মন খারাপ হয়, তখন বন্ধুকেই বেশি মনে পড়ে। যখন খুব ছোট ছিলেন, তখন বন্ধুত্বের ভাবনা এক রকম। কিশোরী বয়সে এক রকম। এখন অনেক পরিণত বয়স-ভাবনাগুলো আরও অন্য রকম। নতুন কোনো বন্ধুত্বের বয়স বা সময় কোনোটিই নেই। পুরোনো বন্ধুগুলো মনের মাঝে সাড়া তোলে। বন্ধুরা ভিন্ন পরিবেশ থেকে বেড়ে উঠেছি। ভিন্ন পারিবারিক অবস্থান হতে পারে। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রশ্নে সবাই মর্যাদাশীল, সবাই সম্মানিত। সেখানে কোনো ভিন্ন অবস্থান নেই-সবাই চলার পথে সহচর।
একসময় মনে হতো, বন্ধু বিদেশে অবস্থান করছে। কী করে দেখা হবে? কোনো কিছুই সহজ ছিল না। নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম... এমন ভাবনা ছিল। এখন স্যাটেলাইটের যুগ। সামাজিক যোগাযোগ খুবই সহজ। মুহূর্তেই বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্লভ অনেক স্মৃতি সংরক্ষণ করা যায়। প্রগতিশীল মানুষ। এখন শুধু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া নয়; সুদূর ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বন্ধুর অবস্থান জানা যায়।
বন্ধুত্বের ভাবনা থেকে বন্ধু ইউএসএতে (নিউইয়র্কে) বেড়াতে আসে। সেখান থেকে ক্যালিফোর্নিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, ভার্জিনিয়া...। কী বিচিত্র পৃথিবী। বন্ধুর কাছে বেড়াতে যাওয়া...মুহূর্তের ব্যাপার। এভাবেই বন্ধুত্বের সম্পর্কে অকৃত্রিম পরিচয় তুলে ধরে।
এখন বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ নয়। সীমার গণ্ডি ছেড়ে গেছে। অভিবাসীর দেশ। বিভিন্ন সংস্কৃতিমনা মানুষের বসবাস। কাজ শেষে বাড়িতে যাব। প্রায় দিনই দেখা হয়। ফিলিপিনো বান্ধবী। বয়স পঁচাশি। খুবই সুন্দর করে কথা বলে। নরম ভাষায় কথা বলে। দিনে দিনে আমাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়। আরেকজন বান্ধবী মারিয়া। পর্তুগিজ বান্ধবী। অনেক আগে ইউএসএতে সেটেলড। নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স। খুবই স্বাস্থ্যসচেতন। প্রতিদিন কথা হয়। মারিয়া আমাকে সাজেশন দেয়। আমরা একসঙ্গে কিছু মুহূর্ত পার করি। আমাদের বন্ধুত্বে আমরা দুজন প্রাণ খুঁজে পাই।
বন্ধুর উপস্থিতি খুবই আনন্দের। বন্ধুর অনুপস্থিতিও অনেক কষ্টের। খুব কাছের বন্ধুকে নিয়ে লিখছি। খুবই কষ্টের ব্যাপার। শব্দগুলো যথার্থ না-ও হতে পারে। বন্ধুকে স্মরণ করছি-স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাই।
আমার ছেলেবেলার বন্ধু/বান্ধবী শিরীন। একই সঙ্গে স্কুলে ভর্তি হই। হাতেখড়ি শুরু করি। পারিবারিকভাবে আসা-যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়েও সময় পার করেছি। দুজন দুই ভুবনে চলে যাই। দুজনেরই সংসারÑসন্তান, জীবন। অলস মুহূর্তে শুধু শেয়ারিং আর শেয়ারিং-মনের কথার আদান-প্রদান...
আচমকা দমকা বাতাস। আমাদের বান্ধবী শিরীন হারিয়ে গেল। শিরীন অত্যন্ত মেধাবী এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। দেখলে মনে হতোÑপ্রতিটি দিন নিজেকে গড়ছে। প্রতিটি মুহূর্তে সৃজনশীলতার পরিচয়। এখনো বন্ধুদের আসর বসে। শিরীন অন্য ভুবনে অবস্থান করছে। আমাদের স্মৃতিতে শিরীন, ‘আকাশের মিটি মিটি তারা।’
দশম শ্রেণিতে পড়ি। খালা (শিরীনের মা) আমাদের দুজনকে সঙ্গে নেন। বাংলা ছবি দেখি। ছবিটির নাম স্বামী। শিরীন আজ অনেক দূরে। আমার সঙ্গে অনেক স্মৃতি-শুধুই নীরব স্বামী। সত্যকে মেনে নিয়েছি, কিন্তু মনকে মানাতে পারছি না!!!
বন্ধু হতে পারে ‘জীবনের সম্পদ’।
লেখক : ফরমার অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ। ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। নিউইয়র্ক প্রবাসী।