গল্প হলো বাস্তব অথবা কাল্পনিক ঘটনা, চরিত্র ও নিজস্ব জীবনের পর্ব থেকে পর্বান্তরে অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে রচিত একপ্রকার গদ্য বর্ণনা, যা পাঠকের মনে নির্দিষ্ট অনুভূতি, রস বা চিন্তার খোরাক তৈরি করে এবং পাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করে। শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক সিরাজুল হক রচিত ‘বেদনার তিমিরে’ গল্পগ্রন্থ তারই ধারাবাহিক সংযোজিত আখ্যানের প্রেক্ষিত রূপ।
শিল্প-সাহিত্যের শাখা-প্রশাখা বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। ধর্ম, দর্শন, গবেষণা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনীগ্রন্থ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই, জীবনোপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, গল্প-উপন্যাস, শিশুতোষ, কবিতা প্রেম-বিরহ-ভালোবাসার রোমান্টিকতায় ভরপুর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। লেখকের অন্তর্লোকের ঐশ্বর্যধর্মী এসব সৃজনশীল গ্রন্থ পাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
‘বেদনার তিমিরে’ বইটিতে সন্নিবেশিত গল্পসমূহে প্রেম, বিরহ, রহস্য-রোমাঞ্চকর উপলব্ধির পাশাপাশি মানবিকতার বৈশিষ্ট্যসমূহের পাশাপাশি বেদনার্তের প্রতি সহমর্মিতা ও সহানুভূতির বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। অধিকাংশ গল্পের মূল উপাদান হলো নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজ ও গ্রামীণ মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্রকল্প। এই গ্রন্থে সর্বমোট ৩০টি গল্প রয়েছে।
প্রতিটি গল্প সৃজনশীল সাহিত্যের বৈচিত্র্যময়, যা মানুষের ভেতরকার উপলব্ধি ও অনুভূতির মিশ্রণে গ্রাম-বাংলার কথকতার মতো মানবিক ঐতিহ্যের অনন্যতায় সাজানো। গ্রন্থটিতে গ্রাম-বাংলা ও শহুরে মানুষের জীবনের গল্পকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আসলে সহজ কথায় কোনো একটি ঘটনাকে নির্দিষ্ট সূত্র বা ধারাবাহিকতায় সাজিয়ে সাহিত্যিক রূপ দেওয়াই হলো গল্পের প্রধান উপাদান। সেদিক থেকে দেখলে লেখক ‘সিরাজুল হক’ তাঁর সহজাত প্রবণতায় গল্পের কাহিনিবিন্যাসে চমৎকার সাবলীল সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পেরেছেন। বিভিন্ন গল্পের চরিত্র নির্ণয়ানে স্বদেশের মফস্বল, শহর, বন্দর ও নগরীর জীবনের ঘটনাবহুল অনেক হৃদয়স্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে এবং মানুষের প্রতি রয়েছে সৌহার্দ্য, প্রবল মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা। একইভাবে বহির্বিশ্বের কয়েকটি দেশে লেখক কর্মরত অবস্থায় থাকাকালীন নিজের দেখা কিছু কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা করেছেন।
যেমন ‘পোড়ামাটি’ গল্পে আধিপত্যবাদের লেলিয়ে দেওয়া যুদ্ধে কীভাবে অন্যের ভিটেমাটির অস্তিত্বের ধ্বংসপ্রবণ কার্যক্রমে কত মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে যায়। সেই বিধ্বস্ত পোড়ামাটির ভেতর থেকে বেঁচে যাওয়া ছোট্ট মেয়েটির জীবন পরিক্রমের সমৃদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যখন দাঁড়াল, তখনই আধিপত্যবাদী সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মর্মান্তিক ও করুণ পরিণতির বিয়োগাত্মক বর্ণনায় হৃদয় বিগলিত হয়ে ওঠে। এই হৃদয়হীন পৃথিবীর ধ্বংসকামীদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার মানুষের দীর্ঘশ্বাস হাহাকারের বর্ণনা আরও কিছু গল্পের সকরুণ ভাষার প্রকাশ ঘটেছে।
এই গল্পের মূল চরিত্র ‘আতিকা’। পিতামাতাসহ পরিবারের সবাই বোমা হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এই গল্পটিতে যুদ্ধের বীভৎসতর রূপ, বিদেশি লুণ্ঠনকারী ও দখলদারদের সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে নোমানিয়ায় মানববিধ্বংসের করুণ অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে।
‘দখলদার বাহিনীর পৈশাচিক আচরণ আর অত্যাচার-অবিচার চোখে ভাসছে। বিধ্বস্ত পৈতৃক বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেছে।’ (বেদনার তিমিরে : ১২)
ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কিশোরী ‘আতিকা’ একটি সেবা সংস্থার মাধ্যমে ইউরোপে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পায়। ‘আতিকা’ ক্রমেই বেড়ে ওঠে এবং একটি সেবা সংস্থার পরিচালকের সহযোগিতায় সেখানকার একটি হাসপাতালে চাকরি করার সুযোগ পায়। লেখক বইতে উল্লেখ করেন, ‘এ হাসপাতালে তার মতো বেদনাক্লিষ্ট বালক-বালিকা, নর-নারীর কমতি নেই। কীভাবে মানুষের সেবা-শুশ্রƒষা করতে হয়, ‘আতিকা’ তার মেন্টর ‘মিস রিলির’ কাছ থেকে পেয়েছে। ‘রিলির’ নিকট থেকে সংগঠন পরিচালনা করার দক্ষতা অর্জন করে। একদিন সততার একনিষ্ঠতায় সে হাসপাতালে সুনাম অর্জন করে।
‘বেদনার তিমিরে’ শিরোনামের গল্পটি বিরহী প্রেমের নিরেট বিবরণের রূপ বাস্তবতার উপাখ্যান। উত্তম পুরুষে লেখা মূল চরিত্রের নাম মাহফুজার জীবনের কঠিন ব্যাকুলতার কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। যেখানে ঋতু পর্বের নানাবিধ পরিবর্তনের অবগাহন। এই লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায়, তিনিও হয়তো গ্রামীণ জীবনের খণ্ডচিত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন। যেমন এই গল্পের এক স্থানে উল্লেখ করেছেন, ‘ঘাটে বাঁধা একটি ফ্ল্যাটে রুমাল পেতে বসে অতীত দিনের স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। মেঘমুক্ত আকাশে তারকারাজির ঝিকিমিকি, নিচে বিজলি বাতির খেলা, কীর্তনখোলার কুলুকুলু ধ্বনি, অসংখ্য লঞ্চ-স্টিমার ও নৌকার আনাগোনা, মাল্লা-মাঝির ভাটিয়ালি গানÑএসব কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে মোহবিষ্ট করে ফেললো। অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলাম কীর্তনখোলা তীরে।’ (বে-তিমিরে : ২১)।
চরিত্রের মধ্যমণি মাহফুজা ছিলেন গল্পের নায়কের ক্লাসমেট। এখানে মাহফুজার জীবনের ছন্দপতনের অনেক বিষাদময় ঘটনা গল্পের বৈচিত্র্যময় বর্ণনায় এসেছে। হয়তো কখনো মাহফুজার হৃদয়ে ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার প্রেমে তিনি পড়েছিলেন, সমাজ ও বাস্তবতা কঠিনতর পরিস্থিতিতে তিনি তার মনের মানুষকে নিজের জীবনে ফিরে পাননি। এমনও হতে পারে, তার সেই স্বপ্নের মানুষটি লেখক নিজেই।
লেখকের বর্ণনায় উঠে আসে মাহফুজার গুণগত অপরিসীম চরিত্রের রূপ সুন্দর দিকগুলো। মাহফুজার ভেতরে বিশেষ লাজুকলতার মিশ্রণে অপরূপ সৌন্দর্যের মুগ্ধতা রয়েছে। ক্লাসের তার চাঞ্চল্য ও চপলতা, স্মার্টনেস এবং কথা বলার স্টাইল সবাইকে বিমোহিত করে তুলত। কবিতা ও গানে ছিল তার অসাধারণ কণ্ঠ। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় মেয়েদের মধ্যে সে ফার্স্ট হতো।
গল্পকার উল্লেখ করেন, ‘মাহফুজা খুব একটা সুন্দরী ছিল না। কিন্তু তার পরেও সে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল, সেটা অন্য কারণে। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী সবাইকে মুগ্ধ করত। হাসি-তামাশা, গল্প-গুজবে ছিল তার জুড়ি মেলা ভার।’ (বে-তিমিরে : ২৬)।
এই গল্পের ইতি টেনে লেখক উল্লেখ করেন, ‘দু’ফোঁটা চোখের পানিতে সে আমাকে বিদায় দিল। আমাকে আটকে রাখার সাহস মাহফুজার হলো না। কারণ, আমি যে এখন অন্য তারে বাঁধা। আমি অনেক দূরে চলে এসেছি, কিন্তু মাহফুজা তখনো দাঁড়িয়ে...।’ (বে-তিমিরে : ২৮)।
আসলে পৃথিবীটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। মানুষের জীবন সততই কণ্টকাকীর্ণ এবং তাকে কোনো না কোনো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হয়। এই গ্রন্থের ‘সাইক্লোন’ গল্পটির মূল চরিত্রের জমীর আলী ও তার স্ত্রী আমীরজান বানুকে নিয়ে সংসারের সুখ-দুঃখের মধ্যেও মানসিক শান্তির পথে এগিয়ে যেতে চান। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নানাবিধ সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার পরও তারা বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
গল্পের ভাষা এমন : “প্রতিদিন বিকেলে কাঁধে চাঁদপুরী রঙিন গামছাটি ঝুলিয়ে চুলার তীরের সেই চটানে গিয়ে বসে জমির আলী। নদীর স্নিগ্ধ-শান্ত রূপ আর ফসলের বাহার তার মন ভুলিয়ে দেয়। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আমীরজান বানুর সাথে গল্প করে আর তামাকের ধোঁয়া ছুড়ে এক গাল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘স্বর করো, আর কডা দিন পরেই তোমার লাইগ্যা একটা লাল শাড়ি কিনিয়া আনুম।’” (বে-তিমিরে : ১৭৭)।
কী অপূর্ব হাসি এবং শান্তি ও সুখের পরশে নির্ভেজাল পথচলার আনন্দের অবগাহন। একইভাবে জীবনচিত্রের উত্থান-পতনের ঘানি টানতে হয়।
লেখক বলেন, ‘চতলা নদীর তীরে মেঘভাসান গ্রামে আটচল্লিশের ঝড়-বন্যার পরে এরূপ আনন্দ আর কেউ দেখেনি। এটা বুড়া-বুড়িদের কথা। আটচল্লিশ। হ্যাঁ, আটচল্লিশ মানে তেরোশ আটচল্লিশ। সবুজ ধানের হলদে শীষগুলো অন্তঃসত্ত্বা রমণীদের মতোই ভারাক্রান্ত হয়ে নুয়ে পড়েছে।’ (বে-তিমিরে : ১৭৭)।
একসময় জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে জমির আলীর সুখের সংসার বন্যার ভয়াল করালগ্রাসের তছনছ হয়ে গেল। সাইক্লোনের পানিতে হাজার হাজার মানুষের সলিলসমাধি হয়েছে। বন্যার পানির তোড়ে একসময় নিজের ঘরের ভিটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। মুহূর্তেই ঘরের চালা তছনছ হয়ে গেল।
‘আমীরজান বানু, ছয় বছরের মিয়া চাঁদ ও কোলের শিশু রাবেয়া চিৎকার করে আগলে ধরে জমির আলীকে।’ কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। একসময় জমির আলী দেখে পানির স্রোতে সবাই তলিয়ে যায়।
ভোলার সেই জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে স্ত্রী, কন্যা ও সন্তানেরা হারিয়ে গেছে। সর্বত্র লাশ আর লাশ। গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়ে সবকিছুই এখন বিপর্যস্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে। জমির আলী সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে দুর্বল ভগ্ন শরীরে সংবিৎ ফিরে হারিয়ে ক্ষীণতরভাবে ফিরে আসে। তারপর “সে অশ্রুসিক্ত নয়নে চতলার তীরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। রিলিফ দলের একজন এসে তার হাতে কিছু খাবার ধরিয়ে দিলে সে আর্তচিৎকারে দশ দিক বিদীর্ণ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অস্ফুট স্বরে বলতে থাকে, ‘ওগো আমার মিয়া চাঁদ আর রাবেয়াকে আনিয়া দেও! উহ্ খোদা! আ...মী...র...ন !’”
এভাবেই সে আবারও অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তার জ্ঞান আর ফিরে আসেনি।
এই গল্পের সেই লাইনগুলো-‘প্রকৃতির খেলা কী বিচিত্র! খরস্রোত চতলা নদীর কোনো চিহ্নমাত্র এখন নেই। এখানে এখন হাট-গঞ্জ-বাজার বসেছে। কখনো কখনো মাটি খুঁড়তে গিয়ে নরকঙ্কালের সন্ধান লাভ করে অতীতের কথা স্মরণ করে, আর স্মরণ করে এই সবুজ দ্বীপের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ের কথা। তাদের বুক আবারও দুরু দুরু করে কেঁপে উঠে এই কথা ভেবে যে, না জানি এই উত্তাল সাগর আবারও তাদের ওপর রুষ্ট হয়ে ওঠে; আর তাদের ভাসিয়ে নেয় অনন্তের পথে।’
তেমনি ‘মা’ গল্পটিও যেন লেখকের জীবনেরই গল্প। যেমন তিনি শুরুটাই করেছেন এভাবে : ‘আমি যার কোলে-কাঁখে লালিত-পালিত হয়ে মানুষ হয়েছি সে যে আমার মা নয়, এ কথা বুঝতে বেশ দেরি হয়েছিল। .. আমার বয়স তখন আনুমানিক আট পেরিয়ে নয় অথবা দশে পড়েছে। দুষ্ট লোকের ন্যায় কে যেন হঠাৎ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘ওহে তুমি যাকে সারা দিন মা-মা বলে চিৎকার করছ, সে তো তোমার মা নয়।’
আমি যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলাম। ক্লাস থ্রির ‘মা’ কবিতাটি আমার আগাগোড়া মুখস্থ। প্রায় দিনই সন্ধ্যা হলে চাটাই বিছিয়ে হারিকেনের আলোতে যখন পড়তে বসতাম, মা আমাকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘ঐ কবিতাটা একটু পড়ো না।’
‘কোন কবিতা?’
‘মা।’
অমনি আমি-
‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।’
‘মা’ গল্পটি মূলত লেখকের বড় হয়ে ওঠার জীবনচিত্রের নিজস্ব অনুভূতিময় আবেগ-আকুল অসহায়ত্বের মাতৃহীন আত্মোপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ! পৃথিবীর মহাসৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মানুষ, বৃক্ষরাজি, পশুপাখি ও প্রকৃতির লীলাভূমির বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের কথা গল্পের বিভিন্ন চরিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এসব অসাধারণ গল্পের মাধ্যমে লেখক তাঁর গূঢ় অনুভূতির সরল কাহিনিকে উপস্থাপন করেছেন।
প্রাণিকুলের মধ্যে যেমন ‘কাক’ নিয়ে একটি গল্পের মাধ্যমে লেখকের সৃজনশীল মননের প্রকাশ ঘটেছে। ‘বৃষ্টিভেজা কাক’ নামে একটি গল্পে কাকের চরিত্রের সকরুণ বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। ‘পল্লীবাংলার বৃষ্টিভেজা অপরূপ দৃশ্যাবলি দেখতে দেখতে ঝিমিয়ে পড়ি। তখন আটটা। হঠাৎ পরপর দু’জোড়া কাক এসে আমার দক্ষিণের জানালার সম্মুখের বাতাবিলেবু গাছটিতে বসে অত্যন্ত বেসুরো কণ্ঠে কা-কা করছিল। মনে হলো ওরা অনাহারক্লিষ্ট, ভীষণ ক্লান্ত।’ (বে-তিমিরে : ২২৯)।
কাক ও কোকিলের স্বর ও সুরের পার্থক্য বুঝতে পারে সবাই। কিন্তু মানুষ কাককে পছন্দ করে না, কোকিলকে পছন্দ করে। কাকের কা-কা শব্দের চেয়ে কোকিলের সুরকে পছন্দ করে। কিন্তু লেখক কাককে সেভাবে দেখেননি। কাকের ভেতরকার বেদনার স্বর লেখকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এই গল্পে কাক ও কোকিলের বৈশিষ্ট্যের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন, ‘সেদিন আমার কাছে কাকগুলোকে কুৎসিত ও কর্কশ কণ্ঠস্বরবিশিষ্ট বন্য প্রাণী বলে মনে হলো না। ওদের অসহায়ত্ব আমার হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল।’
উত্তম পুরুষে লেখা গল্পের মূল চরিত্রে লেখককে ধরে নিলেও আরেকটি চরিত্র ‘নিশানি’ (তাঁর কন্যা) কাক নিয়ে ‘নিশানি’র সঙ্গে লেখকের মতবিরোধ রয়েছে। নিশানি কোকিল পছন্দ করে, কিন্তু কাকের ওপর তার বিরক্তির শেষ নেই! সে বলে, ‘আব্বু। কাকের আবার কি অধিকার থাকতে পারে? ওরা সারা দিন কা-কা করে আমাদের বিরক্ত করছে। ছোঁ মেরে জানালার ফাঁক দিয়ে অহরহ খাবার নিয়ে যাচ্ছে...।’ (বে-তিমিরে : ২৩২)।
জবাবে নিশানির বাবা বলেন, ‘মানুষের তুলনায় কাকেরা যে অধিক পরিশ্রমী এতে আর আমার কোনো সন্দেহ রইল না। কারণ, রাতের আঁধার শেষ না হতেই ওরা কা-কা করে দশ দিক মাতিয়ে তোলে। অলস নিদ্রায় বিভোর পৃথিবীর মানুষগুলোকে জাগিয়ে তোলে।’ (বে-তিমিরে : ২৩৩)।
এই গল্পের শেষ দিকে টর্নেডো ধেয়ে আসছে। যার তোড় ও তীব্রতায় লেখকের সেই বাতাবিলেবুর গাছটি, যেখানে কাকগুলো সর্বদা এসে বসত, সেই গাছটি ধড়াস করে মাটিতে পড়ে গেল! এ অবস্থায়, ‘অসহায় কাকগুলো আর্তচিৎকারে দশ দিক বিদীর্ণ করে তুলছিল, দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটোছুটি করছিল...। সকাল হলো, মেঘমুক্ত আকাশে চতুর্দিক রাঙিয়ে যখন লাল সূর্যটি উদিত হলো, গ্রামের শতকরা নব্বইটি বাড়িঘর আর গাছগাছালি নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। স্বজন হারানোর বেদনার মতো ওদের জন্য অন্তরে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। সেই স্বল্প সময়ের প্রতিবেশী বন্য পাখিগুলো জীবিত কি মৃত তা আর জানা গেল না!’ (বে-তিমিরে : ২৩৬)।
লেখক তাঁর চিন্তার স্বকীয়তা, ভাবনার গভীরতা ও ভাষার জাদুমন্ত্রে বাংলা সাহিত্যে মনোনিবেশমূলক অনুভূতির শৈলী নির্মাণ করেছেন। এভাবেই একজন লেখক পাঠকের হৃদয়ের মিতালি ঘটাতে সক্ষম হন। গল্পগ্রন্থটির গল্পগুলো যেন মানুষের জীবনচিত্রের একেকটি জীবন্ত উপাখ্যান। প্রতিটি গল্পের মূল চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে নিবিড়ভাবে মিলিয়ে নেওয়ার তীব্র উন্মেষ ঘটানো হয়েছে।
‘এক টুকরো জমি’ গল্পের জমিনে দাঙ্গা ও যুদ্ধপীড়িত মানুষের জীবন থেকে এবং নিজের ভিটেমাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সকরুণ কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারতের বিহারের ‘বেলা গ্রাম’ থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়া হাজারো মানুষের সঙ্গে আহমদ জান ও স্ত্রী আতিয়া বানু সীমান্তের ওপারে ঠাঁই নেওয়ার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি জমিয়েছেন। দেশ বিভাগের পর নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে খুব ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন সেই দুর্গম পথে দেশান্তরিত হয়েছেন। পাকিস্তান-ভারত স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এই দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্গম পথ পেরিয়ে আতিয়া বানু ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সে আহমদকে বলে : ‘আহমাদ! মেরা পা নেহি চলতি’Ñ‘আহমদ! আমার পা যেনো আর চলছে না, বলো কী করি...।’
‘ঘুটঘুটে অন্ধকারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে
ওরা। বন্য বিহঙ্গের বেসুরো আর কর্কশ ডাকে ওদের বুক কেঁপে উঠে।’ (বে-তিমিরে : ২৩৬)।
একইভাবে আহমদ ও তার পরিবারের দীর্ঘ দুর্গম যাত্রাপথে শিবনাথ ও তার স্ত্রী শারদা বালার সঙ্গে দেখা হয়। তারা একসঙ্গে পথে নেমেছিলেন। পথে রামনগর ট্রেন স্টেশনের পাশের গ্রামে রাতভর লুটপাট ও দাঙ্গা হয়েছে, যে কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ। পরবর্তীতে শিবনাথের নিকট আহমদের পরিবার বিদায় নেওয়ার সময় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কিন্তু আহমদ ও আতিয়া, কন্যা মরিয়মসহ সুখের সন্ধানে হিন্দু সম্প্রদায়ের কতিপয় দাঙ্গাবাজের অত্যাচারের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আশ্রয় নিতে নিতেই তাদের জীবন চরমভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তাদের এবং অন্যদের ফেলে আসা বাড়িঘরগুলো এলাকার দুর্বৃত্তরা দখল করে নিয়েছে।
দেশভাগের পর দাঙ্গার তীব্রতায় নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারল না। ভাসমান অবস্থায় ক্ষুধাপীড়িত জীবন যাপন করতে বাধ্য (পথে ঘাটে) আহমদ জানের পরিবারের করুণ অবস্থা আরও বেশি কষ্টদায়ক, বেদনাদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল। এরই মধ্যে তার একমাত্র পুত্র সোহেল টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। শোকে মুহ্যমান আহমদ জান ও আতিয়া বানু ক্লান্ত হয়ে কাতর হয়ে পড়লেন!
এই দীর্ঘ পথের মাঝে বহুজনের সঙ্গে আহমদের পরিচয় ঘটেছে। সেই সব পরিবার ও সমাজের মানুষের হৃদয় নিংড়ানো সহমর্মিতার বলয়ের পরিধি পেরিয়ে সম্প্রীতির অনন্যতায় অনেকের কাছেই তারা ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে।
একটা সময় উদ্বাস্তু জীবনযাপন, অথচ পথে-প্রান্তরে জীবনের অন্তিম লগ্নে আহমদ নিস্তেজ, নিস্তব্ধ-নিথর হয়ে যান। কিন্তু তাঁর ভেতরকার প্রেম, দেশাত্মবোধক চেতনা এবং ভালোবাসার তীব্রতায় সেখানকার ক্ষুধার্ত মানুষদের দুঃখ-দুর্দশায় বেদনার্ত ও শোকাহত করে তোলে।
‘শোকে পাথর আহমদের স্ত্রীর চোখ থেকে তখন শ্রাবণের ধারায় অশ্রু ঝরছিল। সে সবার দিকে কেবল নিমেষে তাকিয়ে রইল। অবলা আতিয়া বানুর মুখ থেকে একটি বাক্যও আর বের হলো না।’ (বে-তিমিরে : ২৪৬)
এই গল্পের হৃদয়গ্রাহী পরিণতিতে সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় উন্মাদনার মধ্যেও কিছু মানুষের অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলতা উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা ছিল, যা পাঠ করলে পাঠকের চোখে জল এনে দেয়।
উল্লিখিত গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই কোনো না কোনো সত্য ঘটনারই বহিঃপ্রকাশ। লেখকের জীবনের বহুমুখী প্রতিভার মধ্যে গল্প লেখার যে টেকনিক সেটি বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটের ওপর কমবেশি ভিত্তি নির্ভর হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলা ছোটগল্পের জনক বলা হয়। তাঁর ‘গল্পগুচ্ছ’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। জমিদারির কাজে যখন তিনি শিলাইদহ, পতিসর বা সাজাদপুরে পদ্মানদীতে বোটে ঘুরে বেড়াতেন, তখন খুব কাছ থেকে বাংলার প্রকৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর সেরা গল্পগুলোর জন্ম।
তেমনি লেখক সিরাজুল হক বাংলা সাহিত্যের পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল এবং প্রচণ্ড ভক্ত। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি সব সময় রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।
গল্পের সৃষ্টিশীলতায় রবীন্দ্রসাহিত্যের বৈশিষ্ট্যের মতো ‘সিরাজুল হক’ তাঁর গল্পে মানুষের সুখ-দুঃখের পাশাপাশি প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়ের জীবন্ত চরিত্র রূপায়ণের চেষ্টা করেছেন। এখানে মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেম এবং রোমান্টিকতা তাঁর গল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়েছে।
একইভাবে বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যের মতো ‘সিরাজুল হক’ আমাদের সামাজিক বাস্তবতা ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
ঢাকার ‘বাড পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন নজরুল ইসলাম বাদল। মূল্য : ১৭৫ টাকা।
বইটির পাঠকপ্রিয়তার জন্য বইটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। গল্পকে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করার প্রয়াসে নিরেট নির্ভেজাল সাহিত্য সৃষ্টির জন্য লেখকের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করি। কেননা তিনি সাধারণ পাঠকহৃদয়কে স্পর্শ করার জন্য অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় লিখেছেন।
উল্লিখিত গল্পগ্রন্থে গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক ছাড়াও সর্বপেশার নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা বিদ্যমান। শিল্পীচৈতন্যের আকরে সহজ ও সাবলীল কথাসাহিত্যের নির্মাণশৈলীর অনুকরণ আছে। একই সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের মনের রেখাপাতের প্রয়াসে নিখুঁত চিত্রায়ণের সনির্বন্ধ প্রয়াস চালানো হয়েছে।
(কুইন্স লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য বিশ্লেষক নীরা কাদরী পরিচালিত লেখকের অঙ্গনের জন্য লেখাটি রচিত)।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।