শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বড় স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা!

​বড় স্বপ্নের বাজেট, বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা!

বিজ্ঞাপন
এক বছর আগে লিখেছিলাম, বাংলাদেশের বাজেট হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি হিসাবি চিত্রনাট্যের মতো-কাগজে-কলমে সবকিছু গোছানো, অথচ দেশের যে গভীর সংস্কার দরকার, তার সাহস নেই। সেবার শেষ করেছিলাম একটি সতর্কবার্তা দিয়ে : সংস্কার যত পেছায়, তত একসময় তা অস্বীকারেই গিয়ে ঠেকে।

এক বছর পর দৃশ্যপট বদলেছে। দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি সরকার তাদের প্রথম জাতীয় বাজেট দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট সাজিয়েছেন প্রবল চাপের মধ্যে-তাঁর নিজের কথাতেই, স্বাভাবিক ছয় মাসের কাজ তিনি সেরেছেন মাত্র দেড়-দুই মাসে। বাজেট বক্তৃতা চলেছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা, সম্ভবত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ। স্লোগানটিও বড়-অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ। কিন্তু আসল প্রশ্নটি থেকেই যায় : এত বড় স্বপ্নের দাম শেষ পর্যন্ত দেবে কে?

এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা-দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। সহজ করে বললে, সরকার আগামী বছর প্রতি ১০০ টাকা খরচের পরিকল্পনা করলে নিজে আয় করবে প্রায় ৭৪ টাকা, বাকি ২৬ টাকা ধার করতে হবে। আবার এই ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৬৫ টাকাই চলে যাবে রাষ্ট্র চালাতে-বেতন, ভর্তুকি আর ক্রমশ ফুলে ওঠা পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে। শুধু সুদ পরিশোধেই লাগবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা গোটা বাজেটের দশ ভাগের এক ভাগেরও বেশি। যে বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশই শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে খরচ হয়ে যায়, সেখানে নতুন স্বপ্ন দেখার জায়গা সত্যিই কম।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এত টাকা আসবে কোথা থেকে। রাজস্ব লক্ষ্য ধরে নিয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তার আদায় প্রায় ২০ শতাংশ বাড়াতে পারবে। অথচ চলতি বছরেই কমিয়ে ধরা লক্ষ্যপূরণে তারা হিমশিম খাচ্ছে; এপ্রিল পর্যন্ত আদায় হয়েছে সংশোধিত লক্ষ্যের মাত্র ৬৫ শতাংশ, আর ১০ মাসেই ঘাটতি ছাড়িয়েছে এক লাখ কোটি টাকা। বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া ব্যর্থতা থেকে হঠাৎ রেকর্ড আদায়ে লাফ দেওয়া আসলে পূর্বাভাস নয়, নিছক আশাবাদ।

এই ঘাটতি পূরণের কথা ঋণ দিয়ে আর এখানেই আসল ঝুঁকি। সরকার বিদেশি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ করতে চায়। অথচ বেশির ভাগ বিদেশি বাজেট সহায়তা এখন শর্তসাপেক্ষ-ঋণদাতারা টাকা ছাড়ের আগে সংস্কারের অগ্রগতি দেখতে চায়। সেই অর্থ আসতে দেরি হলে সরকারকে ঝুঁকতে হবে দেশের ব্যাংকের দিকে, যেখান থেকে এমনিতেই বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। গত দুই বছর যারা অর্থনীতির দিকে চোখ রেখেছেন, তাদের কাছে বিপদটি পরিচিত-সরকার যখন ব্যাংকে ভিড় করে, বেসরকারি ব্যবসা ছিটকে পড়ে, বিনিয়োগ থেমে যায় আর মূল্যস্ফীতি নামতে চায় না। আশঙ্কাটি কল্পনা নয়; দেশের মোট বিনিয়োগ নেমে এসেছে জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশে, যা এক দশকের সর্বনিম্ন, আর বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ২১ শতাংশে। কর্মসংস্থানের আসল ইঞ্জিন বেসরকারি খাত যদি ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণের অভাবে ধুঁকতে থাকে, তবে কোনো বাজেটই জোর করে প্রবৃদ্ধি আনতে পারে না।

যদিও এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু স্বস্তির ছোঁয়া আছে। করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, আর ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে তা সাড়ে ৪ লাখে নেওয়ার পাঁচ বছরের রোডম্যাপও দেওয়া হয়েছে-এই আগাম জানা থাকাটা পরিবার ও ব্যবসার পরিকল্পনায় সাহায্য করে। চাল, মাছ, পেঁয়াজ, তেল, চিনিসহ ৬১টি নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমানো হয়েছে দাম সহনীয় রাখতে-যদিও প্রতিটি ক্রেতা জানেন, এই স্বস্তি রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছায় নাকি ব্যবসায়ীর হিসাবেই আটকে থাকে, সেটি আলাদা প্রশ্ন। ভবিষ্যৎমুখী কিছু পদক্ষেপও চোখে পড়ে, যেগুলো ঠিক গত বছর আমি যে সবুজ ও ডিজিটাল সংকেতের অনুপস্থিতি নিয়ে লিখেছিলাম, তারই জবাব-বৈদ্যুতিক গাড়ি ও চার্জার আমদানিতে বড় ছাড়, সৌরবিদ্যুতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য করহার এবং ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট নির্মাতা ও স্টার্টআপদের জন্য করছাড়। তরুণ ও অনলাইনমুখী কর্মশক্তির জন্য এগুলো অর্থবহ প্রথম পদক্ষেপ। তবে ছোট ব্যবসায়ী নীরবে মূল্য দিচ্ছেন-খুচরা সরবরাহে নতুন শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর, অর্থাৎ প্রতি হাজারে ২ টাকা, করজালকে প্রসারিত করছে মূলত সবচেয়ে ছোটদের টেনে এনে।

নিউইয়র্কসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই বাজেটে এবার সুনির্দিষ্ট কিছু খবর আছে, আর সেটিই আমাদের আলাদা করে দেখা দরকার। অর্থমন্ত্রী প্রবাসী কর্মীদের জন্য একটি বিশেষ প্রবাসী কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছেন, যার সঙ্গে যুক্ত থাকবে প্রবাসীকল্যাণ সেবা, বিমা, ব্যাংকিং সুবিধা ও জরুরি সহায়তা-লক্ষ্য হলো এক কার্ডেই যেন প্রবাসীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও আইনি সুরক্ষা পান। বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া ও নর্থ মেসিডোনিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের বাজার আবার খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৈধ পথে টাকা পাঠানোয় আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনাও বহাল থাকছে। এর ফল মিলছে হাতেনাতে-গত মার্চে প্রবাসী আয় পৌঁছেছে ৩৭৫ কোটি ডলারে, যা একক মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এগুলো নিঃসন্দেহে স্বাগত পদক্ষেপ; কল্যাণ ও সুরক্ষার জায়গায় সরকার এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী। কিন্তু যেটি এখনো অনুপস্থিত, তা হলো প্রবাসীকে নিছক রেমিট্যান্স-দাতা হিসেবে না দেখে বিনিয়োগের অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার কাঠামো। সার্বভৌম গ্যারান্টিযুক্ত ডায়াসপোরা বন্ড, আবাসন ও ছোট-মাঝারি শিল্পে প্রবাসীদের সহজ বিনিয়োগের প্ল্যাটফর্ম, ফিনটেকের মাধ্যমে আরও কম খরচে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণে প্রবাসীদের যুক্ত করা-এসব নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকলে প্রবাসীর কষ্টের টাকা কেবল সংসার চালাত না, দেশের উন্নয়নেও খাটত। অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রেখেও প্রবাসীরা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার টেবিলে বরাবরই কম গুরুত্ব পান; এবারের কল্যাণমুখী পদক্ষেপগুলোকে তাই পরের ধাপে বিনিয়োগ-অংশীদারত্বে রূপ দেওয়াই হবে আসল কাজ।

কিন্তু কিছু জায়গায় নতুন বাজেট অস্বস্তিকরভাবে পুরোনো ছকেই ফিরে গেছে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত, যারা এ বছর ছাড়ের আশা করেছিলেন তাদের জন্য কিছু নেই। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ-অপ্রদর্শিত অর্থকে আবাসনের মাধ্যমে বৈধ করার পথ-আবারও বহাল রাখা হয়েছে, যা সৎভাবে কর দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের প্রতি একধরনের অবিচার। নেই স্পষ্ট বেসরকারীকরণের রূপরেখা, নেই প্রতিশ্রুত সৌরবিদ্যুৎ কাজে লাগানোর মতো স্মার্ট গ্রিডের পরিকল্পনা। অর্থনীতিবিদেরা এই বাজেটকে দেখছেন বাস্তববাদ আর আশাবাদের রশি টানাটানি হিসেবে-একদল বলছেন প্রথম কাজ ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, আরেক দল চান দ্রুত দৃশ্যমান অর্জন। মনে হচ্ছে, খসড়ার টেবিলে আশাবাদীরাই জিতেছেন। তবু সুবিচারের খাতিরে বলতে হয়, অর্থমন্ত্রী উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন ভাঙা প্রতিষ্ঠান, বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত আর জ্বালানির ধাক্কা; অন্তত একটি রোডম্যাপ আর ব্যয়ের চারটি যুক্তিসংগত মানদণ্ড-অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনিয়োগের প্রতিদান, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ-তিনি সামনে রেখেছেন। প্রশ্নগুলো ঠিকই আছে; সমস্যা হলো, বাংলাদেশ কখনো ভালো নিয়ম লিখতে আটকায়নি, আটকেছে সেগুলো প্রয়োগ করতে। শেষ কথা হলো, এই বাজেট আগেরটির চেয়ে বড়, ভাষায় আরও সাহসী এবং সাধারণ মানুষের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল। এটি উচ্চস্বরে স্বপ্ন দেখে-সাড়ে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, এক অঙ্কের মূল্যস্ফীতি, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ। স্বপ্ন দেখা দোষের নয়; একটি জাতির স্বপ্ন থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছাড়া স্বপ্ন কেবল একটি দীর্ঘ বক্তৃতা মাত্র। এই বাজেটের সাফল্য সংসদে ঠিক হবে না-ঠিক হবে সেই কর অফিসে, যাদের প্রতিশ্রুত অর্থ আদায় করতে হবে; সেই ব্যাংকে, যাদের ঘাটতি মেটাতে নিঃশেষ করা চলবে না; আর সেই মন্ত্রণালয়ে, যাদের শুধু খরচ নয়, দক্ষতার সঙ্গে খরচ করতে হবে। সরকার যদি প্রতি তিন মাসে অগ্রগতির হিসাব খোলাসা করে, তথ্য সৎ রাখে আর বেসরকারি খাতের ঋণ সুরক্ষিত রাখে, তবে এই বাজেট হয়ে উঠতে পারে সেই মোড়, গত বাজেট যা হতে পারেনি। আর তা না হলে আগামী জুনে আমরা আবার এখানেই ফিরব-কেবল বছরটা বদলে একই কথা লিখতে। গত বছর লিখেছিলাম, সংস্কার যত পেছায়, তত তা অস্বীকারেই গিয়ে ঠেকে। এ বছর নতুন সরকার ও পরিষ্কার সূচনার সুযোগ নিয়ে কথাটি সামান্যই বদলায়-আর দেশের, বিশেষ করে যাদের ঘামে রিজার্ভ টিকে আছে সেই প্রবাসীদের উচিত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখা : প্রতিশ্রুত সংস্কার এখন আমাদের পাওনা। আর নতুন সরকারের উচিত বাজেটের গুণগত বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া।
লেখক : ব্যবসা ও অর্থনীতি-বিষয়ক সাংবাদিক, আর্থিক খাত বিশ্লেষক।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz