নিউইয়র্কে বড় ধরনের আইস (ICE) অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তবে আতঙ্ক নয়, বাস্তবতা বোঝা এবং যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি কতটা ঝুঁকিতে?
নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, গ্রিনকার্ডধারী, বৈধ ওয়ার্ক পারমিটধারী কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী। তাদের বিরুদ্ধে আইসের সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তবে যাদের-
* কোনো বৈধ ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস নেই,
* আশ্রয় (Asylum) আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে,
* চূড়ান্ত ডিপোর্টেশন আদেশ রয়েছে,
* দীর্ঘদিন ধরে কোর্টে অনুপস্থিত ছিলেন,
* ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত,
তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি
অভিবাসী সমাজে একটি ভুল ধারণা রয়েছে-আইস অভিযান মানেই ব্যাপক ধরপাকড়। বাস্তবে আইস সাধারণত নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক নীতির কারণে অভিযানের পরিধি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গুজব ও ভয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্যই যাচাইবিহীন। ফলে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশিদের করণীয় কী?
১. নিজের ইমিগ্রেশন নথি হালনাগাদ রাখুন
পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট, গ্রিনকার্ড, কোর্টের কাগজপত্র, আশ্রয়-সংক্রান্ত ডকুমেন্ট এবং পরিচয়পত্রের কপি নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।
২. অভিজ্ঞ ইমিগ্রেশন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
যাদের মামলা চলমান রয়েছে অথবা স্ট্যাটাস অনিশ্চিত, তারা অবশ্যই একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নির সঙ্গে পরামর্শ করবেন।
৩. নিজের অধিকার জানুন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অভিবাসীদেরও কিছু মৌলিক অধিকার প্রদান করে।
* আদালতের অনুমোদিত ওয়ারেন্ট ছাড়া বাসার দরজা খুলতে বাধ্য নন।
* নীরব থাকার অধিকার রয়েছে।
* আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার অধিকার রয়েছে।
* কোনো নথিতে স্বাক্ষর করার আগে আইনগত পরামর্শ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
৪. পরিবারকে প্রস্তুত রাখুন
জরুরি পরিস্থিতিতে সন্তানদের দেখাশোনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র কোথায় আছে-এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের অবহিত রাখুন।
৫. অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকুন
আইসের নজরদারিতে পড়ার অন্যতম কারণ হলো ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়া। ট্রাফিকসহ সব ধরনের আইন মেনে চলা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
সংকটের মাঝেও সম্ভাবনা রয়েছে
নিউইয়র্ক এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিবাসীবান্ধব অঙ্গরাজ্যগুলোর একটি। এখানে বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক সংগঠন, আইনি সহায়তা কেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠন অভিবাসীদের পাশে কাজ করছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটি গত তিন দশকে ব্যবসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকানরা রাজনীতি, প্রশাসন, আইন, সাংবাদিকতা এবং উচ্চশিক্ষায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও এটি বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় না।
কমিউনিটির ঐক্য এখন সময়ের দাবি
যেকোনো সংকটের সময় বিভক্তি নয়, ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। মসজিদ, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী ফোরাম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা। একজন অভিবাসীর সমস্যা পুরো কমিউনিটির সমস্যা-এই উপলব্ধি থেকেই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে আইস অভিযানের সম্ভাব্য খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে ইতিহাস বলে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী সমাজ বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশি অভিবাসীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।
ভয় নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা; গুজব নয়, আইনি পরামর্শ; হতাশা নয়, প্রস্তুতি ও ঐক্যÑএই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে কিন্তু সেই সঙ্গে রয়েছে সম্ভাবনা, সংগ্রামের ইতিহাস এবং সফল ভবিষ্যৎ গড়ার অদম্য শক্তি।
লেখক : কলামিস্ট