হাজার বছর ধরে হাজার মানুষ সময় পেলেই ভাবছে,
ভাবনায় ভালোবাসার রঙিন স্বপ্ন দেখে লিখছে।
সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরী। আধুনিক নাগরিকবোধ, নান্দনিক কৌশল প্রয়োগে কবিতাকে বিশ্বমানের উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। চারটি মাত্র বই। ১২৬টি কবিতার ভান্ডার বিস্ময়কর খ্যাতি দিয়েছে। বাংলা ভাষার হাতে গোনা কয়েকজন কবি, গদ্যের পৃথিবীতে সমুন্নত, তার মধ্যে শহীদ কাদরী একজন। গদ্যের ভেতর কবিতা সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, কখনো সেরেভানতিস ও জীবনানন্দ দাস, কনসতানতিন কাভাফির বৈচিত্র্যময় কবিতা নিয়ে লিখেছেন।
তার গদ্যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও প্রসঙ্গে বিশ্বরাজনীতির উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। অর্ধশতাধিক গদ্যলেখক তার গদ্যকে সামনে আনতে চাননি। হয়তো তিনি কবি হিসেবে জীবনযাপন করতে চেয়েছিলেন। ধ্বনি-প্রতিধ্বনি সাহিত্যকেন্দ্রিক সংবাদপত্রে তার সোজাসাপটা বক্তব্যে প্রিয়-অপ্রিয়, সংযম ও সংবেদী ভঙ্গিতে নানান বিষয়ক লেখায় তাৎক্ষণিক তার ছায়া মেলে।
চিলিতে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর পাবলো নেরুদার পরিণতি, আবুল হাসানের সুচিকিৎসা ব্যবস্থার আবেদন, হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমার আঘাতে বেঁচে থাকা মানুষের যন্ত্রণার খতিয়ান, হিটলার, মার্টিন লুথার কিং ও জন এফ কেনেডিকে নিয়ে লেখাগুলোর পাশাপাশি মন-কেমন-করা স্মৃতিদর্শন ও মনোবিজ্ঞান নিয়েও বিশ্লেষণ করেছেন।
দুটি মাত্র গদ্য নিয়ে আজকের আলোচনা।
এশিয়ার আকাশ ও দূষিত ইন্দ্রধনু : এই লেখাটি তিনি ১৯৭২ সালে ঠিক প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদ্্যাপন উপলক্ষে বিশ্বরাজনীতির আলোকে লিখেছেন। যুদ্ধংদেহী শক্তিমত্তার ঝংকারে যে পরিমাণ দুঃখ, হতাশা, নৈরাশ্যের জন্ম নেয়; সেই ছবিটি তুলে ধরে পৃথিবীর নষ্ট রাজনীতির উত্থানের গল্প বলেছেন। পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ ও প্রচেষ্টা কী অপরিমেয় মানবতার পরাজয়, প্রতিবন্ধক ও ব্যর্থতা ছড়িয়ে পড়ে তারই প্রমাণ পৃথিবীজুড়ে।
চীনের লুপানোর নামক পরীক্ষা ক্ষেপণটি ২০০ কিলোটন পরিমাণ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এশিয়ার আকাশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো বিশাল কালো ভারী ধূম্রজাল কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। জাপানের নাগাসিকা শহরের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা সবাই দেখছে, এর তেজস্ক্রিয়তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতিগ্রস্ত দিকটি দেখেও এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ভয় পেয়ে ক্লিন বোম নামে পরিচ্ছন্ন বোমা বানাতে সবাই সোচ্চার, কারণ তাতে কিছু মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও পৃথিবীর আকাশ বিষমুক্ত থাকবে। পৃথিবীর রাজনৈতিক এই পরীক্ষাগুলো পৃথিবীর ধ্বংসকে দু’ধারে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আজকে তার লেখার পঞ্চাশ বছর পর কী দেখছি-রাজনৈতিক খেলার মাঠ বদলে গেছে কিন্তু মরণফাঁদ পাতার রাজনৈতিক পদক্ষেপ, চিন্তাভাবনা একফোঁটাও বদলায়নি। বৃহৎ শক্তির দেশ নাম বদলে গেছে কিন্তু হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। অকাতরে বোম ফাটছে মানুষের ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল সমস্ত প্রতিষ্ঠানে। কানের পাশে বোম ফাটছে, মৃতদেহ সার বেঁধে জমে উঠছে। উদ্ধার বাদ দিয়ে ভাঙচুর, গান বাজছে পৃথিবীজুড়ে।
মানবতার পরাজয় প্রতিবন্ধ পৃথিবীর সমাজ মেনে নিয়েছে অভ্যাসের দাসের মতো। বিজ্ঞান চিন্তাভাবনা আজকের নতুন জগতে শক্তির উৎস নয়, শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবসার জন্য।
দ্বিতীয় গদ্যের আলোচনা : তার লেখা বইয়ের দ্বিতীয় গদ্যের নাম ব্যাক্তিগত বর্ষা। গদ্যের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমার খুব করে তার খুব জনপ্রিয় কবিতা বর্ষার প্রতিচ্ছায়া ভেসে আসে। বৃষ্টির রূপকথা তার চোখের উপর ঘুঙুর পরে কখন কীভাবে আলোর ঝলকানি হয়ে যায় সেটা বর্ণনা করেছেন।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচণ্ড গরম রোদ্দুরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে-ছেলেবেলার বৃষ্টির ছাঁট বড় বড় ফোঁটায় পানি,
ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে এমন আঁধারে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুরির মতো বৃষ্টি তাকে বিপদগ্রস্ত করেছে।
ফুটপাতে, ফুটবলের মাঠে, আশ্বিন অঘ্রান চৈত্র বৈশাখে কখনো রক্তাক্ত কখনো নিশ্চিত নিশ্পাপ সাদা ঝরে। কালো ময়লা একদল ছেলেমেয়েরা বৃষ্টির পানির মধ্যে লাল বল নিয়ে খেলছে, চেনা শহরকে উল্টে দিয়ে যায় বৃষ্টি। এমন দিনে তারে বলা যায়Ñপঙ্্ক্তি থামিয়ে দিয়েছে কবিকে।
এই গদ্যের শেষ পঙ্্ক্তি তাহলে কি আমি যথেষ্ট বৃষ্টির প্রেমিক হয়ে উঠিনি?
বৃষ্টির ভূমিকা জীবনে : এর যথেষ্ট উত্তর কবির কাছে নেই। তাই রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে কিংবা সে সময় নজরুল নির্বাক না হলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন।