কোনো জ্বালায় নয়, প্রশ্নটা করা হয়েছিল তথ্যের প্রয়োজনে। অথচ ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বললেন, কে নিউজ করেছে, কার এতো জ্বালা? রাজনীতির ময়দানে প্রশ্নটা ঘুরছিল অনেকদিন থেকেই। বলা হচ্ছিল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেননি। গত ২৪ আগস্ট সেটারই সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক। হ্যাঁ-না জবাবে না গিয়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে, কার এতো জ্বালা?
এমন মানের শব্দ-বাক্য কোন মানে পড়ে? বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মাথায় গত ২১ আগস্ট মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নতুন পাঁচ মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন কবির টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। শৈশব থেকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা হুমায়ুন কবির দেশটিতে লেবার পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক বলে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের সূত্রগুলোও বলছে, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন, এমন তথ্য তাদের কাছে নেই। এ অবস্থায় সাংবাদিকের এমন প্রশ্ন কি জরুরি ছিল না?
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্য নন, এমন ‘অনধিক এক-দশমাংশ’ (১০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ জনকে) ব্যক্তিকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী করা যাবে। তবে সেই ব্যক্তিকে ‘সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য’ হতে হবে। আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে সংবিধানের ৬৬ ধারার ২(গ)-তে উল্লেখ আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।’ হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে। সে প্রসঙ্গ তুলে সাংবাদিকের প্রশ্ন করা খুব অন্যায় হয়ে গেছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকলে বা আনুগত্য ঘোষণা করলে সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন একটি শর্ত সাপেক্ষে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কিছু প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে। কার নির্দেশে তিনি হুকুমী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন? ফলে বিভিন্ন দলের অন্তত ২২ জন দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে যান। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র দ্বৈত নাগরিকত্বের (অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব) কারণে চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যায়। তা কি ঠিক ছিল না? তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক কি-না, এর জবাব তো এক শব্দেই হতে পারতো। হ্যাঁ অথবা না। যখন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয়ার মুরোদ থাকে না, তখন সংবাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা রাজনীতিবিদদের পুরোনো অসুখ। তাছাড়া চেয়ারে বসলে বুঝি ভাষা এমনই হয়ে যায়?
কোন মানুষ আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। তিনি দেশি নাগরিক হোন বা বিদেশি নাগরিক। সরকারি নথি ও আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ তদন্ত হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে বিদেশি নাগরিকত্বের বিষয়টি জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া উচিত নয়?
বিদেশি পাসপোর্টধারীরা মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে নাÑ এ আইনটা বাতিল করে দিলেই বা কী? তা হলে আর আপনাদের আইন ভাঙার দায় নিতে হবে না। কেউ এতো প্রশ্নও করবে না। কানাডা, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেও পাবলিক অফিস হোল্ড করা যায়। অবশ্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের পাবলিক অফিস হোল্ড করা অনুমোদন করে না। ভারত অবশ্য দ্বৈত নাগরিকত্বই আনুমোদন করে না। আওয়ামী লীগ সরকারেও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী অনেকে মন্ত্রী, এমপি ছিলেন- তখন তো প্রশ্ন করে নাই, এখন কেন করছেন? কেউ কেউ এমন একটি আলাপ সামনে নিয়ে আসছেন। এই আলাপটা অত্যন্ত সমস্যাজনক। যারা এই ধরনের আলাপকে সামনে আনছেন- তারা আসলে ’আওয়ামী লীগের যা কিছু খারাপ কাজ, তার সবকিছুই বিএনপি করতে পারবে, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না’- এমন একটা গ্যারান্টি চান?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।