প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৩৩
•
অনলাইন সংস্করণ
সব সম্প্রদায় বা জাতিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। কিছু থাকে প্রকাশিত, কিছু থাকে অপ্রকাশিত। প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য দিয়েই সাধারণত তাদের চিহ্নিত করা যায়। অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য দিয়ে কোনো জাতি-সম্প্রদায়কে বুঝতে পারা যায় না। সেটা কোনো জাতীয় প্রয়োজনে, জাতীয় অর্জনে, দুর্যোগ বা বিপৎকালে প্রকাশিত হয়। সে প্রকাশেরও ভাবে এবং ভঙ্গিতে দেখা যায় বিভিন্নতা। আমাদের সে কারণে ভাঙনপ্রিয় বা বিভাজনপ্রিয় জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। আমরা যেমন গড়ি, তেমনি ভাঙি। আমরা কখন যে গড়ি আর কখন যে ভাঙি, তা যেমন অনেক সময় নিজেরাও জানতে পারি না; কেন নিজের হাতে গড়া জিনিস নিজেরাই ভাঙি, তার কারণও তেমনি বুঝতে পারি না।
অনেকেই, যারা ধর্মবিশ্বাসী, তারা বলেন, স্বয়ং বিধাতাপুরুষই তাঁর সৃষ্টি নিয়ে ভাঙা-গড়ার খেলায় আনন্দ পান। আমরা তো তাঁরই সৃষ্টি। আমরা তো আনন্দ পাবই। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন তার গানে বলেছেন, ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে ॥’
‘শূন্যে মহা আকাশে মগ্ন লীলা বিলাসে।
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে ॥’
প্রভু নিজেই যখন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে ভাঙাগড়ার খেলায় মত্ত, তখন তাঁর সৃষ্টিই-বা ভাঙাগড়ার খেলায় কেন মগ্ন হবে না? সে কারণে আমরাও যেমন সৃষ্টি করি, আবার নিজেদের সৃষ্টি নিজেরাই ভাঙি। তাই তো এ নিয়ে ঠিকানার ১৯ আগস্ট সংখ্যায় খুবই সময়োপযোগী এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়। মূল শিরোনাম : ‘সবাই পারে আমরা কেন পারি না?’ উপরে আছে : ‘দুই প্যারেড, চার ফোবানা, বিভক্তির বৃত্তে বাংলাদেশি কমিউনিটি’। নিচে : ‘একই পতাকা, একই দেশ তবু আলাদা মঞ্চ কেন?’
প্রতিবেদনটি রচনা করেছেন স্বয়ং ঠিকানার বার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম। প্রতিবেদনটির মূলভাব হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে এসেছি নিজেদের স্বপ্ন, নিজেদের ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে। এসেছি নিজেদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে। বিশ্ববৈচিত্র্যের একটি দৃষ্টান্ত নিজ নিজ দেশের জাতীয় প্যারেড। এসব প্যারেড কেবলই আনন্দ-উৎসবের প্রদর্শনী নয়। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দৃশ্য, মানবতার প্রতিফলন। সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্যরে প্রদর্শনী। নিউইয়র্কে বাঙালিরাও সে সক্ষমতা অর্জন করছে অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু সেই সক্ষমতার পরিচয় দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি, কারণ আমাদের মধ্যে সক্ষমতা বাড়লেও আমাদের বিভাজনও লক্ষণীয়। তাই তো সবাই যা পারছে, আমরা তা পারছি না।
অনৈক্যের উদাহরণও বিভাজনের মতো ভুরি ভুরি। আমাদের প্যারেড দুটি, বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করলেও আমাদের ফোবানা এখন পর্যন্ত চারটি। ভবিষ্যতে কটি হয় কে জানে। আর সংগঠন? আজ একটি তো কালই দুটি। আজ গড়ছি তো কালই ভাঙছি। এই ভাঙনের পেছনে সবচেয়ে ভয়ংকর কারণ হচ্ছে, সামাজিকভাবে এসব সংগঠনের ব্যাপ্তি বাড়ছে। মর্যাদা, সম্পদ বাড়ছে। তাই মর্যাদার লড়াই বাড়ছে। লোভের চৌহদ্দি বাড়ছে। মানুষ এসব সংগঠনের পদ-পদবি দিয়ে প্রবাসে নিজের পরিচিতি, নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ নিচ্ছে। তাই বিভেদ বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন ও বিভাজন-বিভেদ বাড়ছে। নতুন উদ্যোগ নিয়ে নতুন কিছু করার চেয়ে ভেঙে একটি অংশের নেতা হওয়া সহজ। কিন্তু এতে যে আমাদের অর্জনে মালিন্য লাগছে, আমাদের বল যে দুর্বল হচ্ছে ক্রমাগত, সেদিকে আমরা লক্ষ করছি না। আমরা নিজেদের স্বার্থে অন্ধ হয়ে ভাঙনের খেলায় মেতে থাকলে দেখা যাবে আম-ছালা দুই-ই আমরা হারাচ্ছি।
মনে রাখতে হবে সেই আল্টিমেট কথা : ‘ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল’।