মিডলবরো-
একটুখানি মাটির গন্ধে ভেজা ছোট্ট শহর,
ফসলের চাষ আর রিটায়ারমেন্টের অলস বেলা।
দুপুরগুলোতে গাছেরা বসে থাকে গল্প করতে,
মানুষ নয়, ছায়ারা হাঁটে বাজারে-
তারা চুল বাঁধে, সস্তায় সবজি কিনে,
দোকানদারের সঙ্গে দর-কষাকষি করে
এক ফালি নিঃশ্বাসের জন্য।
আমরা এসেছি অতিথি হয়ে,
হোটেলের ঘরে পাখির পালকের ঘুম,
সকালে হঠাৎ ট্রেন-
কমিউটার ট্রেন, দ্বিমঞ্জিলা তার দম্ভে দাঁড়ানো।
আমরা উঠে গেলাম উপরের ডেকে,
জানালার ধারে বসে রেললাইন ছাড়িয়ে
ফিরে গেলাম শৈশবে।
বড়লেখা থেকে সিলেট,
সে রকমই গন্ধ আসছিল
জংলি ফুলের পাপড়ি থেকে।
একেকটা শহর-ঘুমন্ত, দৃষ্টি ভেজা,
একেকটা স্টেশন-যেন স্মৃতির
সিংহদুয়ার, স্বপ্নের সোনালি চুম্বন!
ঝিকঝিক শব্দে ট্রেন কেটে যায়
যেন কোনো গোপন গান,
বাতাসে হাওয়া নয়, হাহাকার বাজে,
আবারও দেখি-বনাঞ্চল!
কত মাইল পেরোলো-শুধু ম্যাপল আর ম্যাপল!
ডান দিকে ম্যাপল,
বাঁ দিকেও তা-ই।
পাতাগুলো যেন আগুনে লেখা লিপি,
গাছগুলো যেন বলছে,
‘আমরা আছি, আমরা জন্ম দিচ্ছি রস!’
আমি মোবাইল খুলে হিসাব কষি-
কানাডা আর আমেরিকায় যত ম্যাপল গাছ হয়
যদি সব গাছ ট্যাপ করে,
যদি রস ঝরায়,
তাহলে এক বছরের উৎপাদন দিয়ে পুরো পৃথিবীর জন্য
দু’বছরের সিরাপ তৈরি হবে!
আল্লাহ এত দয়ালু, এত উদার!
তিনি ম্যাপলের পাতায় পাতায় আশীর্বাদ লিখে দিয়েছেন-
আফসোস! কেউ দেখে না, কেউ পড়ে না!
আমেরিকানরা কি জানে?
কানাডার কৃষক কি মাথা নিচু করে প্রার্থনা করে?
‘ধন্য তুমি, প্রভু!
তুমি আমাদেরকে ম্যাপলের দেশ করেছ-
আমাদের হাড়ে রস, চেতনায় গন্ধ,
আর ইতিহাসে অরণ্য!’
হঠাৎ দেখি ট্রেন ঢুকে পড়েছে শহরের রক্তে-
বস্টন তার পথ খুলে দেয়,
আলো-ছায়ায় ঢেকে ফেলে প্রান্তিকতা।
আমি বসে আছি এখনো, জানালার পাশে,
আমার চোখে ম্যাপল পাতার মতো
কাঁপছে এক শালিকের ডানা-
‘মিডলবরো থেকে বস্টন,
এই যাত্রাপথে আছে বিশ্ব প্রভুর নিরন্তর ইশারা।’