প্রবাসে, বিশেষ করে নিউইয়র্কে শত শত সংগঠন গড়ে উঠেছে। অবশ্য একটা কথা এখানে বলা প্রয়োজন, সব সংগঠন গড়ে ওঠার আগে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্ক। এ সংগঠনকে সবাই বলে ‘মাদার সংগঠন’। বাংলাদেশের যেকোনো মানুষ, যারা যেকোনোভাবে আমেরিকায় বসবাস করেন, কারও গ্রিনকার্ড আছে, কারও আছে আমেরিকার পাসপোর্ট, কিংবা কেউ পার্মান্যান্ট রেসিডেন্সি লাভের প্রক্রিয়ায়, তারা সবাই বাংলাদেশ সোসাইটির সদস্য লাভের যোগ্য।
এখন সবাই বাংলাদেশ সোসাইটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও নিজ নিজ এলাকা বা অঞ্চলকেন্দ্রিক সংগঠন গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সে পথ ধরে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত সংগঠন খুঁজে পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন-কেন এত এত সংগঠন? বাংলাদেশ সোসাইটি ব্যতীত আর প্রায় সব সংগঠনই ভাঙনের কারণে একই সংগঠন একাধিক সংগঠনে পরিণত। সোসাইটি নিয়েও ঝগড়া-বিবাদ হয়। তবে এখনো সোসাইটি ভাঙনের কবলে পতিত হয়নি। এসব সংগঠনের নির্বাচনকালে অনেকেই দেশের জাতীয় নির্বাচনের মতো আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন, পকেট থেকে হাজার হাজার ডলার ব্যয় করতেও কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন না।
এরাই আবার যেকোনো ছুতোয় কিংবা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদপ্রাপ্তির আকাক্সক্ষায় এমন উন্মত্ত হয়ে ওঠেন যে, তারা তখন একজন আরেকজনের মাথায় আঘাত হানতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এ জন্য মামলা-মোকদ্দমাতেও হাজার হাজার ডলার খরচ করতে সবাই উদার হয়ে ওঠেন। এখানেও গোষ্ঠীর স্বার্থে কিছু করা নয়। নিজের গরিমা, নিজের অহমিকা বজায় রাখতে গিয়ে বৃহত্তর স্বার্থ ভুলে যায় সবাই। বললে হয়তো ভুল হবে না, গরিষ্ঠ প্রবাসী মানুষের কত রকম সংকট, কত রকম সমস্যা। সেসবে আর ক’জনের দৃষ্টি থাকে। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।
তাই তো ঠিকানার গত ৯ জুলাই সংখ্যার একটি প্রতিবেদন : “টার্গেট প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি পদ, কাজের বেলা ‘ঠনঠন’/ প্রবাসে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে সংগঠন”। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সব সংগঠনেই সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদ একটি করে। কিন্তু একাধিক ব্যক্তি এ দুটি পদেই আগ্রহী। সবাই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে চান। যার অবশ্যম্ভাবী ফল সংগঠনে ভাঙন। আর এই ভাঙনে নিজের গ্রুপকে শক্তিশালী করতে সবাই ব্যস্ত থাকেন বলে জনগণের প্রতি তাদের সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা ভুলে যান। অথচ যেকোনো সংগঠনের যাত্রাকালে তাদের লক্ষ্য থাকে এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
সব বাংলাদেশ সোসাইটি নিয়ে একটি ফেডারেশন গড়ে তোলা হয়েছিল। নাম ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)। প্রতিবছর বিভিন্ন স্টেটে একটি সম্মেলন হতো। একসময় কত আকর্ষণ ছিল প্রবাসীদের এই ফোবানার প্রতি। পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই যোগ দিতেন ফোবানা সম্মেলনে। সেই ফোবানা এখন ভেঙে চার টুকরো। যারা কর্মকর্তা, এখন তারাই ফোবানার দর্শক। ফোবানা এখন বিবর্ণ। সব আকর্ষণ হারিয়েছে। না বিনোদন আছে, না শিক্ষণীয় কিছু আছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির উৎসের খোঁজ রাখি না।
প্রবাসে যে দু-চারজনকে সুধী বা প্রবাস কমিউনিটির সুহৃদ ভাবা হয়, সবার প্রতি তাদের আহ্বান, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ, পদের মোহ ত্যাগ করে জনকল্যাণে নিজেদের নিবেদিত করুন, তাহলেই সংগঠন করার সার্থকতা মিলবে। মানুষ খুশি হবে, উপকৃত হবে।