Thikana News
২৯ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশে বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই

আর্থিক ও সামাজিক জীবনে আমাদের দেশে বেকারত্বকে একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল। বেকারত্ব তারুণ্যের সব সম্ভাবনা নষ্ট করে দিচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াটা বেকারত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে
বাংলাদেশে বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে কর্মসংস্থান সংকট, দক্ষতার ঘাটতি এবং টেকসই অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে কারিগরি শিক্ষা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তা ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি চাকরির খাত খতিয়ে দেখলে কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটা অনুধাবন করা অনেকটা সহজ হবে।

দেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরির খাত বা প্রাতিষ্ঠানিক সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সশস্ত্র বাহিনী, সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষক, ব্যাংক ও সংস্থা ইত্যাদি। এর পরিমাণ মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে খুবই সীমিত, প্রায় শতাংশ। বেসরকারি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বলতে বোঝায় সেই কর্মসংস্থান, যা সাধারণত ফরমাল চুক্তি ছাড়া, শ্রম সুরক্ষা ছাড়া, অনেক সময় অস্থায়ী/আংশিক বা নিজ উদ্যোগে হয়। এই খাতে কর্মরতদের অংশ মোট শ্রমশক্তির ৮৪-৯৫ শতাংশ। আর্থিক ও সামাজিক জীবনে আমাদের দেশে বেকারত্বকে একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল। বেকারত্ব তারুণ্যের সব সম্ভাবনা নষ্ট করে দিচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াটা বেকারত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫ বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকার দ্বিগুণ, কর্মসংস্থান নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ বাড়ছে। ২০১৭ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকার ছিলেন ৪ লাখ। ২০২২ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক অনুযায়ী, বেকারত্ব হার ৪.৬৩ শতাংশ, বেকার সংখ্যা ৯ লাখ (২.৭৩ মিলিয়ন)। সম্প্রতি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আপ-টু-ডেট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সর্বশেষ পাওয়া বেকার সংখ্যা ২৭.৩ লাখ এবং বেকারত্বের হার৪.৬৩ শতাংশ। কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশে বেকারত্বের বাস্তব হার অফিশিয়াল তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি।

দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৪০ ভাগ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বসবাস করছে। বেকারত্ব সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে বহু অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন। আমি সেদিকে না গিয়ে শুধু কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায় বেকারত্ব উত্তরণের সুফলগুলো ব্যাখ্যা করছি। এবার আসুন বাংলাদেশের আয়ের প্রধান দুটি খাতের ওপর আলোচনা করি।
বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বর্তমানে কর্মরত মানুষের সংখ্যার সর্বাধিক আপডেটেড ও বিশ্বাসযোগ্য রেঞ্জ ৪ থেকে ৫ মিলিয়নের মধ্যে। সরকারি বক্তব্য অনুসারে, এই সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশের গার্মেন্টস-সামগ্রীর বিশাল বাজার রয়েছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পোশাক তৈরির জন্য যে উপাদানগুলো দরকার, সেগুলোও আমরা উৎপাদন করতে পারি না। এমনকি পোশাকের সুতা কিংবা বোতামও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের পোশাকের সরঞ্জামাদি, বিশেষ করে সুতা, বোতামসহ এ জাতীয় জিনিসগুলো কেন দেশে তৈরি করতে পারি না?

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জিডিপিতে আয়ের জোগান দিচ্ছে বৈদেশিক রেমিট্যান্স। ২০২৪-২৫ সালের পত্রপত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক রেমিট্যান্স জিডিপিতে ৫ থেকে ৭ শতাংশ অবদান রাখছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের হিসাবে তা ৬-৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে ধারণা। দেশের শিক্ষিত জনশক্তি বেকারত্বের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন কর্মসংস্থানের জন্য। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় ডিগ্রি নিয়ে এই প্রবাসীদের বেশির ভাগই সাধারণ লেবারের কাজ করছেন কিংবা ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। অথচ ওই প্রবাসীরা যদি কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতেন, তাহলে তাদের জীবনযাত্রার মান বহুগুণে উন্নত হতো। কর্মদক্ষতা অনুযায়ী তাদের ইনকাম অনেক উপরে থাকত, যা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেত। সুতরাং উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বর্তমানে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বেশি করে প্রাধান্য দিতে পারলে তা দেশের বেকারত্ব কমাতে সক্ষম ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীন আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় কমিয়ে নিয়ে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে আজ দেশটির প্রতিটি ঘরে একেকটি কারখানা তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে সেখানে পণ্যবিপ্লব সাধিত হয়েছে। বিশ্বের অত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো চায়না সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের বেকারত্ব দূর করার জন্য কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাকে সরকার এবং সাধারণ জনগণের গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষা কেন দরকার : কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো পেশাগত দক্ষতা (যেমন ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, অটোমোবাইল মেকানিক, গ্রাফিক ডিজাইনার ইত্যাদি) অর্জন করে। এর মাধ্যমে চাকরির সুযোগ বাড়ে। দেশ ও বিদেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা অনেক। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ নিজেই ব্যবসা শুরু করা যায়। শিক্ষা শেষে ডিগ্রি অর্জন করার পরই উপার্জন শুরু করা সম্ভব।

সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার বিষয়সমূহ (বাংলাদেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে)
১. ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি : চাকরিক্ষেত্র-বিদ্যুৎ, টেলিকম, কনস্ট্রাকশন সেক্টরে। বিদেশে উচ্চ চাহিদা (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে)।
২. কম্পিউটার ও আইটি টেকনোলজি : চাকরিক্ষেত্র-ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং। এটি ফ্রিল্যান্সিংয়ের বড় ক্ষেত্র।
৩. মেকানিক্যাল টেকনোলজি : চাকরিক্ষেত্র-ফ্যাক্টরি, গাড়ি মেরামত, মেশিনারিজ। দেশ-বিদেশে চাকরির সুযোগ আছে।
৪. রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং (RAC) : ঘরোয়া ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রচুর চাহিদা। বিদেশেও এই ট্রেডে প্রচুর নিয়োগ হয়।
৫. ড্রেস মেকিং ও গার্মেন্টস টেকনোলজি : বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল চাহিদা। উদ্যোক্তা হওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
৬. ওয়েল্ডিং ও ফেব্রিকেশন টেকনোলজি : নির্মাণ ও ভারী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে কাজের অনেক চাহিদা।
৭. ফার্মেসি ও হেলথ টেকনোলজি : চাকরিক্ষেত্রÑহাসপাতাল, ক্লিনিক, ওষুধ কোম্পানি। এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
৮. ফুড প্রসেসিং ও বেকারি টেকনোলজি : খাদ্যশিল্পে দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার ভালো সুযোগ।
৯. ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট : চাকরিক্ষেত্র-হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ভ্রমণশিল্প। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি।
১০. গ্রাফিক ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া : ফ্রিল্যান্সিং ও মিডিয়া শিল্পে চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০০০ কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আনুমানিক ৫০০, টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (TSC) ৬৪, ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (VTI) ৪০০, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (TTC) ৭০।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকার-সবাই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে চালু ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন :
১. শিক্ষার মান উন্নয়ন : প্রযুক্তি ও শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম তৈরি করা। প্রশিক্ষকদের নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দক্ষতা মূল্যায়ন (skill-based assessment) চালু করা।
২. শিল্পের সঙ্গে সমন্বয় : স্থানীয় শিল্প-কারখানা ও কোম্পানির সঙ্গে টিভেট (TVET) প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া।
৩. প্রযুক্তি সংযোজন : কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার সংযুক্ত করা। ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ।
৪. সামাজিক সচেতনতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি : সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী উপযুক্ত ট্রেড নির্বাচন করতে সহায়তা করা।
৫. উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান : আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদান। কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান প্রদান।
৬. নীতিমালা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা : কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা। বাজেটে কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।
সব দিক বিবেচনা করে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জন ও প্রসার করলে বাংলাদেশের বেকারত্ব দূর করার জন্য এটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিশেষে বলব, বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস সব সময় বলেন, অন্যের কাজ করার চিন্তা ঠিক নয়। প্রবাসে অবস্থানরত বিত্তবানরা তাদের নিজ এলাকায় কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে গরিব জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, আমাদের নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিখারিকে ভিক্ষা দেননি, তার জামা বিক্রি করে কুঠার কিনে দিয়েছিলেন, যাতে সে কর্ম করে খেতে পারে।
লেখক : কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট

কমেন্ট বক্স