পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থির করার যাবতীয় উসকানি চলছে। এর স্টিয়ারিং দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে। বাংলাদেশের পানি ঘোলা করার ষোলো আনা আয়োজনে মাছ শিকারের অংশ হিসেবে একের পর এক জাল ফেলা হচ্ছে। কিছু শিকার ধরাও পড়ছে। পরিস্থিতি সরকারের জানার বাইরে নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনে যে এর একটা রিহার্সাল হবে, লাশ ফেলার ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাও সরকারের জানা। তা নিশ্চিত হয়েই ডাকসু নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত। এর বিপরীতে চলছে শেষতক ডাকসু নির্বাচন ভণ্ডুলের কারসাজিও। আদতে তা জাতীয় নির্বাচন বানচালের চেয়েও শক্ত হাতের খেলা। ডাকসুসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের নির্বাচন আগামী জাতীয় নির্বাচনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনার মাঝেই চলছে কারসাজিটি। যা প্রকারান্তরে আগামী সংসদ নির্বাচনেরই টেস্ট বা ড্রাই রান। ২০০৮ সালের পর তরুণেরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, নতুন ভোটার তালিকায় প্রায় ৪০ শতাংশ রয়েছেন, যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। যা পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা-নির্ধারণী সংসদ নির্বাচনে তারুণ্যের প্রধান নিয়ামক শক্তির আভাস। ঘটনার পরম্পরায় তারুণ্যের সেই শক্তির পুরোধারাই এখন মহাফাঁপরে। কয়েকজন পড়ে গেছেন জীবন সংকটেও। তাদের গড়া দল এনসিপির নিবন্ধন এখনো হয়নি। নির্বাচন কমিশনে অচিরেই নিবন্ধন পেলেও শেষ মুহূর্তে তাদেরকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখার একটি গেমও চলছে। জুলাই সনদ আর আগামীর মসনদের মধ্যে এক সার্কাসের অংশ হিসেবেই এ গেম। এত গেমের মাঝেই রাজনীতি-কূটনীতিতে ঢুকে পড়েছে পাকিস্তানি গেম। সমানতালে চরমপন্থা, দক্ষিণপন্থা, মৌলবাদের নতুন ন্যারেটিভের চাষবাসও। বাংলাদেশে যেন চরমপন্থা ও মৌলবাদের উত্থান না ঘটে, সে জন্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেকের সোচ্চার হয়ে ওঠার পেছনে আরেক জালের বিস্তার।
জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদের তকমায় দেশে নৈরাজ্যের জের হিসেবে ওয়ান ইলেভেন আনার আয়োজকেরা সম্প্রতি নতুন করে আশাবাদী। কিন্তু কুলাতে পারছে না প্রধান উপদেষ্টা নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্ব যশ-খ্যাতির কারণে। এর পরও আশা ছাড়ছে না তারা। পারলে ড. ইউনূসকেই ওসামা বিন লাদেন মাপের জঙ্গি সর্দার বানিয়ে দেয়। এমন এক জটিল অবস্থায়ও ড. ইউনূস ভেতরে ভেতরে ডেমকেয়ার অবস্থানে। কাউকেই বিশেষভাবে আমলে নেওয়া বা কাছে টানার চেষ্টা করছেন না। তিনি চলছেন নাক বরাবর। গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব নোবেলজয়ী ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ায় ভারত মহাক্ষিপ্ত। তার ওপর হাউডি মোডি দিয়ে শুরু হলেও সময়ের ব্যবধানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সম্পর্ক শীতল হয়ে গেছে। ট্রাম্পের নিষেধ করা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা কোনোভাবেই বন্ধ করেনি মোদি সরকার। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মোদি তেল কেনা অব্যাহত রাখায় ট্রাম্পও সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ করেছেন। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সৌহার্দ্য এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ‘মধ্যস্থতার ইচ্ছা’ও ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ক্ষুব্ধ করেছে। দুরবস্থা সামলাতে নরেন্দ্র মোদি তাদের চিরশত্রু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অনেক দূর এগিয়েছেন। বাংলাদেশের আলোচিত সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও চীনে হাইপ্রোফাইল সফর সেরে এসেছেন। এ রকম সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি-সমঝোতাসহ ইউনূস সরকারের বিশেষ কূটনীতি ভারতের জন্য একটি মারাত্মক চপেটাঘাত। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরির সূক্ষ্ম চেষ্টাও চলে। সামনে আনা হয় একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাসহ পুরোনো প্রসঙ্গ। ইসহাক দার জানিয়ে দিয়েছেন, এটি তামাদি ইস্যু। এ বিষয়ে ১৯৭৪ ও ২০০২ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও পারভেজ মোশাররফের দুবার দুঃখ প্রকাশের কাজ শেষ হয়েছে। ইসহাক দার তার এ সফরে বিএনপির চেয়ারপারসন অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে তার গুলশানের বাসভবনে গেছেন। বিষয়টি দুদিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
এর মাধ্যমে ইসহাক দার একদিকে এ দেশের বয়োজ্যেষ্ঠতম নেতাকে শ্রদ্ধা জানালেন। খালেদা জিয়াও তার ঔদার্য্য দিয়ে পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার প্রতি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সৌজন্য দেখালেন। গোটা এ পরিস্থিতি বিএনপি এবং ইউনূসবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তির মাথা বিগড়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ তাদের দেশি-বিদেশি শাখা-প্রশাখা ও হিতাকাক্সক্ষীদের দিয়ে দেশে নৈরাজ্য পাকানোর ব্যাপক অ্যাজেন্ডা নিয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে দেশে-বিদেশে যেখানেই পাবে এ সরকারের সংশ্লিষ্টদের অপমান-অপদস্থ করার। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে নিউইয়র্কে হেনস্তার চেষ্টা ওই অ্যাজেন্ডারই অংশ। ইউনূস সরকারে সম্পৃক্ত দেশে-বিদেশে অবস্থানকারী আত্মীয়-স্বজনদের ওপর প্রতিশোধমূলক নিপীড়ন চালানোর কাজে শিগগিরই মাত্রা যোগ করার আয়োজন রয়েছে তাদের। ৫ আগস্ট বিপ্লবের অন্যতম সমন্বয়ক এনসিপি নেতা সারজিসের শ্বশুরকে বিচারপতি করাকে বড় ইস্যু বানানোর প্রস্তুতিও জোরদার। এ নিয়ে দেশের বিচারাঙ্গনে তোলপাড় ঘটানোর পরিকল্পনায় মত্ত আওয়ামী লীগ ঘরানার আইনজীবী ও ৫ আগস্টের ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া বিচারপতিদের একটি গ্রুপ।
এসবের ফাঁকে সনদ বা ঘোষণা ছাড়া জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমন্বয়কদের ‘ইনডেমনিটি’ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এটি তাদের জন্য মহা আতঙ্কের। জীবন-মরণের প্রশ্নও। কারণ, আন্দোলন বা অভ্যুত্থানটি সহিংস হয়েছে। প্রচলিত বা বিদ্যমান আইনে তা রাষ্ট্রদ্রোহ। সনদের মাধ্যমে ইনডেমনিটি দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রদ্রোহ বা সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে তাদেরকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। কেবল পুলিশ হত্যার জন্যই তাদের অনেকে কঠিন বিচার ও শাস্তিযোগ্য হবেন। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট শাসকদের পতন ও পলায়নের পর ক্ষোভের আগুনকে কাজে লাগিয়ে লুটপাট যেমন হয়েছে, তেমনি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ঘটনাও ঘটেছে। সেগুলোও ফৌজদারি অপরাধ। সেই অভিযোগের তীর ছাত্র সমন্বয়কদের দিকেই। স্থানিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি-কূটনীতির এমন জটিল সময়ে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনও করতে হয়েছে। কক্সবাজারে তিন দিনের এ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে বলতে হয়েছে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত দেশ। পরিস্থিতিও স্থিতিশীল আছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ও জাতিগত নির্মূল থেকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সম্মেলনের উদ্বোধনীতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ৭ দফা প্রস্তাবও দিয়েছেন, যা আরেক কূটনীতি। কূটনীতির ওপর কূটনীতি। কারণ বিষয়টি এখন আর বাংলাদেশ-মিয়ানমারে সীমিত নয়। সমস্যা সমাধানে দরকার আন্তর্জাতিক বিশ্বের জোর সমর্থনসহ কার্যকর সহায়তা। ভারত এর ঘোরতর বিরোধী। সেখানে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা ১১টি দেশ। দিয়েছে যৌথ বিবৃতিও। বাস্তবতা হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান, চীনের বিশেষ সহায়তা ছাড়া এ সমস্যা উতরানোর মতো নয়। এটিও আরেক অতি-কূটনীতি।