সই হতে পারে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল, তিস্তা প্রকল্পেও আলোচনার সম্ভাবনা
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১৫:০৭
•
অনলাইন সংস্করণ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় দলিল স্বাক্ষরিত হতে পারে। সম্ভাব্য দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা (অ্যাকশন প্ল্যান) এবং একটি প্রটোকল। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
তিনি বলেন, “বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আলোচনা শেষে মোট ১৫ থেকে ১৭টি দলিল স্বাক্ষর হতে পারে।”
পররাষ্ট্র সচিব জানান, আগামীকাল রোববার (২১ জুন) থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর শুরু হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তার প্রথম বিদেশ সফর। কূটনৈতিক মহলে সফরটিকে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্ব জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছোট কিন্তু কার্যকর প্রতিনিধিদল
সরকার সফরে ব্যয় সাশ্রয় ও কার্যকারিতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রতিনিধিদলের আকার সীমিত রেখেছে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২৭ সদস্য এবং চীন সফরে ২৮ সদস্যের প্রতিনিধিদল থাকবে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রতিনিধিদলের আকার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছি। সফরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”
মালয়েশিয়া সফরে গুরুত্ব পাবে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ
সফরের প্রথম ধাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফর করবেন। সেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
চীন সফরে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সহযোগিতা
মালয়েশিয়া সফর শেষে সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও স্টেট কাউন্সিলের প্রিমিয়ার লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এই সফরে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
‘সামার দাভোস’-এ প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ
চীন সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম বার্ষিক ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলন বা ‘সামার দাভোস ফোরাম ২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ।
চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের বন্দরনগরী দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৭০০ প্রতিনিধি অংশ নেবেন।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ বা ‘বৃহৎ পরিসরে উদ্ভাবন’। সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, সবুজ অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং শিল্পায়নের নতুন দিকগুলো তুলে ধরার জন্য এটি প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম।
লি চিয়াং ও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। বৈঠকে বাণিজ্য ভারসাম্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন, শিল্প সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
এরপর ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং–এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিস্তা প্রকল্পে নতুন অগ্রগতির আশা
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব জানান, তিস্তা নদী উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পও আলোচনার এজেন্ডায় থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটিতে চীনের আগ্রহ রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব (কূটনীতি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়) এ কে এম শহিদুল করিমসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।