দেশের বিভিন্ন জেলায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত দুই মাসে পাঁচ জেলায় শতাধিক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটাকাটি এবং মৃত পশুর সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এ রোগ ছড়াচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধ, নিয়মিত টিকাদান এবং দ্রুত রোগ শনাক্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অ্যানথ্রাক্স দেশে নতুন কোনো রোগ নয়। বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চলসহ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সেখানে প্রায় ৩২৬ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আগস্টে ৩৮ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৮ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন। আক্রান্তদের অনেকেই অসুস্থ ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়া করার সময় সংক্রমিত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলাতেও সংক্রমণ বেড়েছে। সেখানে নতুন করে তিনজন শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া রংপুরের পীরগাছা ও মিঠাপুকুর এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরেও অসুস্থ গরুর মাংসের সংস্পর্শে এসে অন্তত ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন।
অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুর একটি সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস, চামড়া বা মৃতদেহের সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত ত্বকীয় অ্যানথ্রাক্স দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে ক্ষত, ফোলা বা কালচে ঘা তৈরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ গুরুতর হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত পশু জবাই এবং মাংস কাটাকাটির সময় অসতর্কতার কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি। তাই অসুস্থ বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। কোনো পশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ করা, কাটা বা খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।
রোগটি নিয়ন্ত্রণে গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীকে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত পশু হাটবাজারে নেওয়া বা অন্যত্র স্থানান্তর করা উচিত নয়। অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে কোনো পশু মারা গেলে নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেটি মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। কারণ, এ রোগের জীবাণু মাটিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে আবার সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানিয়েছেন, শুধু পাঁচ জেলা নয়, দেশের সব জেলাতেই অ্যানথ্রাক্স শনাক্তে নজরদারি কার্যক্রম চালু রয়েছে। কোনো এলাকায় সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আইইডিসিআরের দল সেখানে গিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা, সংক্রমণের ধরন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যাচাই করে। বর্তমানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও প্রতিষ্ঠানটির একটি দল কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আক্রান্ত পশু শনাক্ত, নিয়মিত টিকাদান এবং নিরাপদ মাংস ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।