বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

হজ খরচেও কেন গরমিল?

হজ খরচেও কেন গরমিল?

বিজ্ঞাপন
 যে বাংলাদেশ একসময় বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করতে পারেনি, সেই বাংলাদেশই এখন ৭৮ হাজার ৫০০ আসনের বাইরে থাকা আরো ২০ হাজারের বেশি মানুষকে হজে পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত কোটার অনুরোধ। নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৫'শ জনের কোটা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সৌদি সরকারের কাছে আরো ২০ হাজার হজ কোটা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- হাব। বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হজ কোটা এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন থাকলেও বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হজযাত্রীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকে। এজন্য সৌদি সরকার ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের হজ কোটা কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ জন ঠিক করে দেয়। নির্ধারিত সময়ে এ কোটা পূর্ণ হয়ে গেছে। অপেক্ষমান রয়েছে ২০ হাজারের বেশি হজযাত্রী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের কিছু সদস্য নিবন্ধিত হয়েছেন। এখন অপেক্ষার হাল ছেড়ে দেবে তারা?
এখন পর্যন্ত জবাব নেই এ প্রশ্নের। একসময় বড় কোটা পেয়েও তা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। আর এখন কমে যাওয়া কোটার সব আসন প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও ২০ হাজারের বেশি মানুষের হজে যাওয়ার সুযোগের আবদার। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে সৌদি সরকার এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজ কোটা দিলেও তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালের প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে ৮৩ হাজার ৫২৭ জন নিবন্ধন করায় ৪৩ হাজার ৬৭১টি আসন খালি থাকে। কিন্তু ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের কোটা কমিয়ে ৭৮ হাজার ৫০০ জন করে দেয়ায় পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। সৌদি আরব এখন অতিরিক্ত কোটা না দিলে কী হাল হবে?
২০২৭ সালে বাংলাদেশেরর কোটা কমে যাওয়া কি কেবল সৌদি আরবের একক সিদ্ধান্তেই হয়েছে? না, তা নয়। আরো কারণ আছে। গত কয়েক বছরে বড় কোটা পূরণ না হওয়া, বাংলাদেশের হজযাত্রীদের জন্য তুলনামূলক বেশি ব্যয় এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপও ছিল। এবার তো বিমানভাড়া কমানো হয়েছে। প্যাকেজ কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। আগের কয়েক বছরের তুলনায় মানুষের আর্থিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে হজে যাওয়ার আগ্রহও বেড়েছে। মানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজ কোটা পেয়ে আসছিল। ২০২৪ সালেও একই পরিমাণ কোটা ছিল। কিন্তু ওই বছর ৮৫ হাজার ২৫৭ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন। ফলে প্রায় ৪২ হাজার আসন অব্যবহৃত থাকে। ২০২৫ সালেও এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের কোটা দেয়া হয়। কিন্তু প্রাথমিক নিবন্ধন শেষে মাত্র ৮৩ হাজার ৫২৭
জন নিবন্ধন করায় ৪৩ হাজার ৬৭১টি আসন খালি থেকে যায়। ২০২৫ সালে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যসহ প্রায় ৮৭ হাজার ১০০ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ হাজার ১০০ জন। এখন কি টানা কয়েক বছর বাংলাদেশের প্রকৃত হজযাত্রীর সংখ্যা সৌদি আরবের নির্ধারিত কোটার তুলনায় এভাবে কমতে থাকার জের? বছর দুয়েক আগেও হজের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একই সময় তুলনামূলক কম খরচে ওমরাহ পালন করা সম্ভব হওয়ায় অনেকে হজের পরিবর্তে ওমরাহর দিকে ঝুঁকেছেন। ২০২৪ সালে সর্বনিম্ন সরকারি হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪০ টাকা। তখনকার হিসাবে, প্রায় দেড় লাখ টাকার মধ্যে ওমরাহ পালন করা সম্ভব ছিল। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশে একটি পরিবারের জন্য একসঙ্গে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা বা তার বেশি ব্যয় করা বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ থাকায় হজের ব্যয় চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। ওমরাহ নিয়ে ভুল প্রচারও আছে। ওমরাহকে 'ছোট হজ' বলে উৎসাহিত করার একটি সুক্ষ কায়কারবার আছে। গত বছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ওমরাহ পালন করেছেন। তাদের একটি অংশ হজে গেলে বাংলাদেশের হজের কোটা কি পূরণের বাইরে থাকতো?
হজের মোট ব্যয়ের বড় অংশ সৌদি আরবের আবাসন, পরিবহন, মিনা ও আরাফাতের সেবা, খাবারসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। হিসাব করলে তা হজের মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। বাকি এক-চতুর্থাংশ ব্যয় হয় বিমানভাড়াসহ বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট খাতে। সামনের হজের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃ 'পক্ষ মক্কা ও মদিনার আবাসন, পরিবহন, ক্যাটারিং, তাঁবু ও অন্যান্য সেবাকে সমন্বিত সার্ভিস প্যাকেজের আওতায় এনেছে। আগের চারটি সার্ভিস ক্যাটাগরির পরিবর্তে তিনটি করা হয়েছে এবং হাফ-বোর্ড ক্যাটারিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া মিনা ও আরাফাতের সর্বনিম্ন সার্ভিস ক্যাট- াগরি বাতিল করায় একজন হজযাত্রীর ব্যয় প্রায় ৭০০ সৌদি রিয়াল বা ২৩ হাজার ২৪০ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে খাবারের জন্য ৩৯ হাজার ৫০৮ টাকা এবং রিয়ালের বিনিময় হার সমন্বয়ের কারণে আরো ৩ হাজার ৮২৫ টাকা যোগ হয়েছে। ২০২৭ সালের জন্য সর্বনিম্ন সরকারি হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা। সরকার এবার হজের বিমানভাড়া কমিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ হাজার ৮৩০ টাকা কম। বিমানভাড়া কমলেও সর্বনিম্ন সরকারি প্যাকেজের ঘোষিত মূল্য ২০২৬ সালের ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৭সালে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা হয়েছে। দুই বছরের প্যাকেজ সরাসরি তুলনা করলে প্রকৃত ব্যয়ের চিত্র কি আসলে মেলে? ২০২৭ সালের প্যাকেজে খাবারসহ কিছু ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের প্যাকেজে আলাদাভাবে বহন করতে হতো। একই মানের সেবা বিবেচনায় প্রকৃত ব্যয় কমেছে। তা হলে কী দাঁড়ালো হিসাবটা?
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz