বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশপ্রেমিক জনগণের মধ্যে প্রতিবাদের চেতনা আরও তীব্র করেছিল। তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে মানুষের মধ্যে নতুন করে জাগরণ তৈরি হয়েছিল। ৭ অক্টোবর (বুধবার) বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেছেন, আবরারকে হত্যা করে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মূলত পুরো জাতির মধ্যে ভয় তৈরি করতে চেয়েছিল। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আবরার যে প্রতিবাদ করেছিলেন, সেটিই তার জন্য ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তাকে হত্যা করে সেই প্রতিবাদ থামানো যায়নি।
রিজভী বলেছেন, আবরারকে হত্যা করে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মূলত পুরো জাতির মধ্যে ভয় তৈরি করতে চেয়েছিল। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আবরার যে প্রতিবাদ করেছিলেন, সেটিই তার জন্য ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তাকে হত্যা করে সেই প্রতিবাদ থামানো যায়নি।
বিগত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ওই সময়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে পার্শ্ববর্তী দেশের স্বার্থ রক্ষার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ভারতকে যা দেওয়া হয়েছে, তা তারা মনে রাখবে। এই নতিস্বীকারের বিরুদ্ধে আবরার যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার পরিণতিতে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতীয়তাবাদী শক্তির অবস্থান তুলে ধরে রিজভী বলেন, কোনো আগ্রাসী শক্তির কাছে জাতীয়তাবাদী শক্তি কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহর পাশে বসার স্মৃতিচারণ করেন রিজভী। তিনি বলেন, আবরারের বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ১৯৯০ সালের রাকসু নির্বাচনে তাকে ভোট দিয়েছিলেন। শহীদের বাবার কাছ থেকে নিজের অতীত নির্বাচনের এমন স্মৃতি শুনে তিনি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছেন বলে জানান।
মানবিকতার প্রসঙ্গ তুলে টলস্টয়ের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে রিজভী বলেন, অন্যের বেদনা অনুভব করতে পারাই মানবিক অস্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবরারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পুরো জাতি সেই বেদনা অনুভব করেছিল।
ছাত্রদলের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা রাজপথে বারবার নির্যাতন ও হামলার শিকার হয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ধারাকে ধারণ করে তারা কোনো গোপন বা ছদ্মবেশী রাজনীতির আশ্রয় নেননি। রাজপথে আঘাত সহ্য করেই নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন।
সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আবরার হত্যার মাধ্যমে তৎকালীন সরকার একটি ভয়ভীতির বার্তা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনা উল্টো সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনে যেসব ঘটনা ভূমিকা রেখেছিল, আবরারের শাহাদাত তার অন্যতম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মানবিক বোধ ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানবিকতা হারিয়ে ফেললেই আবরার ফাহাদের মতো ঘটনা ঘটে। গত ১৬ বছরে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা যে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, সেটিকে শক্তিতে পরিণত করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হবে।
আবরার ফাহাদ হত্যাসহ সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বলেন, আবরার হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রতিবাদ করেছিল ছাত্রদল। গত সাড়ে ১৫ বছরে সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হলেও তারা রাজপথ ছাড়েননি।
ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার অঙ্গীকার করে রাকিব বলেন, আবরার ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। ছাত্রদল বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো আপসহীন পথেই রয়েছে। বাংলাদেশে কোনো ধরনের ভারতীয় আগ্রাসন মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
শহীদ আবরারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে রিজভী বলেন, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’- এই প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবরারের আত্মত্যাগ দেশের স্বার্থে আপসহীন থাকার শিক্ষা দিয়ে গেছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গনেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন এবং শহীদ আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব ইউনিটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।