আমেরিকায় বাংলাদেশিদের উপজেলা, জেলা ও বিভাগভিত্তিক শত শত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে। বছরজুড়ে এসব সংগঠনের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ, সম্মেলন, নির্বাচন, অভিষেক, বনভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংবর্ধনাসহ নানা আয়োজন চলে। কোনো কোনো অনুষ্ঠানের বাজেট কয়েক হাজার থেকে লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। হল ভাড়া, ব্যানার-ফেস্টুন, সাউন্ড-লাইটিং, ফুলের তোড়া, অতিথি আপ্যায়ন, শিল্পীর সম্মানী সবকিছুর জন্য সংগঠনগুলোর বাজেট আছে; কেবল নেই মিডিয়া বাজেট। প্রশ্ন হলো—সংগঠনগুলোর বিশাল আয়োজনকে প্রবাসে-স্বদেশে-বিদেশে প্রচার-প্রসারে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, সেই পেশাদার মিডিয়ার জন্য বাজেট নেই কেন?
গণমাধ্যম হিসেবে আমরা কমিউনিটির এসব কর্মকাণ্ডকে বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ঠিকানার প্রিন্ট সংস্করণ, অনলাইন, ফেসবুক, অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ঠিকানা টিভিতে সংগঠনগুলোর সংবাদ, ছবি ও ভিডিও নিয়মিত প্রচার করা হয়। কিন্তু একটি সংবাদ পাঠকের হাতে বা দর্শকের পর্দায় পৌঁছানোর পেছনে কত মানুষের শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় হয়—আমাদের সম্মানিত সংগঠকেরা কি কখনো সেই হিসাবটি ভেবে দেখেছেন?
একজন পেশাদার সাংবাদিককে অনুষ্ঠানস্থলে যেতে হয়। যাতায়াত করতে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে থাকতে হয়, তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, বক্তব্য শুনতে হয়, নাম-পদবি যাচাই করতে @হয়, ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে হয়। সংবাদ অফিসে পৌঁছানোর পরও তাঁর কাজ শেষ নয়। সংবাদ লেখা, টাইপ, সম্পাদনা, প্রুফ, পৃষ্ঠা বিন্যাস এবং শেষ পর্যন্ত ছাপাখানায় পাঠানো—প্রতিটি ধাপে পেশাদার জনবল কাজ করেন। ছাপা শেষ হলে পত্রিকা আবার বিভিন্ন গ্রোসারি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে হয়।
টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে কাজটি আরও বহুমাত্রিক। ক্যামেরাপারসন ফুটেজ ধারণ করেন, কখনো সরাসরি সম্প্রচার হয়। পরে ফুটেজ অফিসে আসে, স্ক্রিপ্ট লেখা হয়, ভয়েস দেওয়া হয়, ভিডিও সম্পাদনা হয়, গ্রাফিক্স ও শিরোনাম যুক্ত হয়, তারপর টেলিভিশন, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপযোগী করে আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়। দর্শক হয়তো তিন মিনিটের একটি প্রতিবেদন দেখলেন; কিন্তু সেই তিন মিনিটের পেছনে কত কর্মঘণ্টা, কত দক্ষ মানুষ, কত প্রযুক্তি এবং কত অর্থ ব্যয় হয়েছে—সে হিসাব কি আমরা কখনো করি?
তাহলে প্রশ্নটি খুবই সহজ : হল কর্তৃপক্ষ বিনা ভাড়ায় হল না দিলে, ক্যাটারার বিনা মূল্যে খাবার না দিলে, শিল্পী বিনা সম্মানীতে গান না গাইলে, সাউন্ড কোম্পানি বিনা পয়সায় মাইক না দিলে—একটি পেশাদার সংবাদমাধ্যমের কাছেই শুধু বিনা মূল্যে সেবা প্রত্যাশা করা কতটা যৌক্তিক?
সংবাদ অবশ্যই পণ্য নয়; জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। কোনো সংবাদ প্রকাশের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া এবং কোনো সংগঠনের বিজ্ঞাপন, স্পন্সর- কনটেন্ট, অনুষ্ঠান কাভারেজ বা বাণিজ্যিক মিডিয়া সেবা দেওয়া এক বিষয় নয়। এই সীমারেখা পরিষ্কার রাখা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বুঝতে হবে—গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান চালাতে সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, অফিস, ক্যামেরা, প্রযুক্তি, ছাপাখানা, পরিবহন, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিতরণব্যবস্থা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশাল খরচ রয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি প্রশ্নও জরুরি : একটি সংগঠন যখন নিজের অনুষ্ঠান সফল করতে হাজার হাজার ডলার ব্যয় করতে পারে, তখন যে গণমাধ্যম সেই আয়োজনকে হাজার হাজার কিংবা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, তার পেশাগত সেবার মূল্য কেন শূন্য ধরা হবে? একটি বিজ্ঞাপন দিতে কেন এত কষ্ট?
ঠিকানার মতো দীর্ঘদিনের একটি কমিউনিটি সংবাদমাধ্যমের প্রিন্ট, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি সংগঠন শুধু একটি সংবাদ প্রকাশের সুযোগ পায় না; তার কর্মকাণ্ড কমিউনিটির বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে যায়, সংরক্ষিত হয় এবং প্রবাসের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। সেই পুরো ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে পেশাদার মানুষের শ্রম ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয় হয়।
আমাদের কমিউনিটি এখন অনেক বড় হয়েছে। সংগঠনগুলোর বাজেট বেড়েছে, আয়োজনের পরিধি বেড়েছে, পেশাদারিত্বও বেড়েছে। তাহলে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে চিন্তাটা এখনো কেন পুরোনো থাকবে?
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি পেশাদার সাংবাদিকতার মূল্য বুঝতে শিখেছি, নাকি এখনো মনে করি সংবাদকর্মীর সময়, শ্রম, মেধা, প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিপুল ব্যয়—সবই বিনা মূল্যে পাওয়া আমাদের অধিকার?
কমিউনিটির সংগঠনগুলোকে নিয়ে গণমাধ্যম যেমন দায়িত্বশীল, তেমনি একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও পেশাদার কমিউনিটি মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও কি সংগঠনগুলোর কোনো দায়িত্ব নেই?
পরিশেষে বলব, একটি প্রাণবন্ত ও সচেতন কমিউনিটির জন্য যেমন সংগঠন প্রয়োজন; তেমনি প্রয়োজন স্বাধীন, পেশাদার ও শক্তিশালী গণমাধ্যম। সংগঠনগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কমিউনিটিকে এগিয়ে নেয়, আর গণমাধ্যম সেই কর্মকাণ্ডের খবর, সাফল্য ও ইতিহাস বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরে। এই সম্পর্ক তাই একতরফা নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক। তাই আমরা এমন একটি কমিউনিটি চাই, যেখানে সাংবাদিকের শ্রমকে সম্মান করা হবে, গণমাধ্যমকে শুধু ‘ফ্রি প্রচারের মাধ্যম’ হিসেবে দেখা হবে না এবং সংগঠন ও মিডিয়া পরস্পরের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি, ঠিকানা ও সাবেক এমপি।