আবীর আলমগীর: জীবন যে কতটা অনিশ্চিত, কতটা নির্মম হতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে রইল তাসিন ফেরদৌসের আকস্মিক মৃত্যু। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, জীবনের সম্ভাবনাময় সময়ে, স্বামী, শিশুসন্তান, মা-বাবা আর অসংখ্য প্রিয়জনকে রেখে চিরবিদায় নিলেন নিউইয়র্কের মেধাবী নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাসিন ফেরদৌস।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই স্বামী এড্রিয়ান ও শিশুপুত্র লুকাসকে নিয়ে কুইন্সে নিজেদের সদ্য কেনা নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তাসিন। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন করে সংসার সাজানোর কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা! কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার আর সাজানো হলো না। নতুন বাড়িতে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে না হতেই চিরদিনের জন্য থেমে গেল তাসিনের জীবন। একটি সাজানো সংসারের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোক আর অপূরণীয় শূন্যতায়।
তাসিন ছিলেন নিউইয়র্কের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস এবং বিশিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জাফর ফেরদৌসের একমাত্র কন্যা। গত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্বামী এড্রিয়ান, শিশুপুত্র লুকাস, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে বয়সে নিজের সন্তানকে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখার কথা, নতুন বাড়িতে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার কথা, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার কথা, ঠিক সেই বয়সেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তাসিন।
সামান্য হাতব্যথা থেকে মৃত্যু, কী ঘটেছিল সেই কয়েক দিনে : তাসিনের মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি আপাতসাধারণ শারীরিক সমস্যা এত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনল? পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাসিন তাঁর হাতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। ব্যথা নিয়ে প্রথমে তিনি নিউইয়র্কের মাউন্ট সাইনাই হাসপাতালে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, পেশিতে টান বা মাসল পুলের কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু ব্যথা কমেনি। পরবর্তী সময়ে একই সমস্যা নিয়ে তিনি নিউইয়র্ক প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালেও যান। পরিবারের দাবি, সেখানেও তাঁর শারীরিক সমস্যাকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যথা কমানোর ওষুধ দিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার হাতে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করলে তাসিন তাঁর মা এ্যানি ফেরদৌসকে ফোন করেন। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা শুনে উদ্বিগ্ন মা ছুটে যান তাঁর বাসায়। সেখানে গিয়ে মেয়ের হাতের অবস্থা দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এ্যানি ফেরদৌস। তাসিনের হাত ফুলে গিয়েছিল। পাশাপাশি হাতে ছোট ছোট ক্ষতও দেখা যাচ্ছিল। পরিবারের পরিচিত একজন চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো হলে তিনি আর দেরি না করে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। ওই শুক্রবার রাতেই তাসিনকে কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয়।
পরিবারের কাছ থেকে জানা যায়, হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণের আশঙ্কা করেন। ততক্ষণে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসিন দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তাসিন। শুক্রবার রাত থেকে রোববার ভোর, এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত তরুণীর এমন করুণ পরিণতি পরিবার, স্বজন এবং পরিচিতজনদের কাছে এখনো অবিশ্বাস্য।
কোন ব্যাকটেরিয়ায় মৃত্যু? চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন পরিবারের: তাসিনের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণের বিষয়টি জানিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কা করা হলেও কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটল কেন, এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত বা অটোপসির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে পরিবার আশা করছে।
তবে মৃত্যুর কারণ জানার পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর চান তাসিনের মা-বাবা। প্রথম দুইবার হাসপাতালে যাওয়ার পরও কেন তাঁর শারীরিক সমস্যার গুরুতর কোনো কারণ শনাক্ত করা গেল না? হাতে প্রচণ্ড ব্যথা অব্যাহত থাকার পরও কেন আরও বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়নি? সংক্রমণটি কি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল? সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া গেলে কি তাসিনের জীবন বাঁচানো যেত? এসব প্রশ্ন এখন শোকাহত পরিবারের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিবার পুরো ঘটনার যথাযথ তদন্ত চায়। বিশেষ করে প্রথম দুটি হাসপাতালে তাসিনের চিকিৎসার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবুও একটি পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি রয়েছে কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল এবং এমন মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল কি না, তা জানার গভীর আকুতি।
নতুন বাড়িতে শুরু হয়েছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন: তাসিনের মৃত্যুর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকগুলোর একটি হলো, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই স্বামী এড্রিয়ান ও শিশুপুত্র লুকাসকে নিয়ে কুইন্সে নিজেদের কেনা নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে নিজেদের একটি বাড়ি কেনা, সেখানে নতুন করে সংসার সাজানো, সন্তানকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, সবকিছুই ছিল তাঁদের জীবনের এক আনন্দময় অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু কে জানত, সেই আনন্দের স্থায়িত্ব হবে এত অল্প সময়ের! নতুন বাড়ির প্রতিটি ঘর, প্রতিটি কোণে হয়তো জড়িয়ে ছিল তাসিনের অসংখ্য স্বপ্ন। কোথায় কী থাকবে, কীভাবে সাজাবেন নিজের সংসার, কীভাবে বেড়ে উঠবে ছোট্ট লুকাস, এমন কত পরিকল্পনাই না ছিল তাঁর। অথচ নতুন বাড়িতে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই চিরবিদায় নিতে হলো তাঁকে। যে বাড়িতে হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসার নতুন গল্প শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই আজ নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বামী এড্রিয়ানের জীবনে নেমে এসেছে অকল্পনীয় শূন্যতা। আর ছোট্ট লুকাস, যে বয়সে মায়ের স্নেহ আর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই হারাল জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটিকে।
নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ: তাসিন ফেরদৌস শুধু একটি পরিবারের আদরের সন্তান ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত ও সম্ভাবনাময় একটি মুখ। মা এ্যানি ফেরদৌসের হাত ধরেই ছোটবেলা থেকে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনা। নিউইয়র্কের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বাংলা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস বা বিপার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শৈশব থেকেই। বিপার শিক্ষার্থী হিসেবে নৃত্যচর্চা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে নিজেই শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতি, নৃত্য এবং নিজস্ব ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিপার যে দীর্ঘদিনের ভূমিকা, তাসিন ছিলেন সেই সাংস্কৃতিক ধারারই একজন নিবেদিত কর্মী।
বাংলা সংস্কৃতিকে ভালোবেসে, নিজের শিকড়কে ধারণ করে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন আমেরিকার বহুজাতিক সমাজে। শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়, পেশাগত জীবনেও ছিলেন দায়িত্বশীল ও মেধাবী। তিনি নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনের একজন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা, নৃত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। বিশেষ করে ব্রুকলিনের কেনসিংটনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের নাগরিক অধিকার, সামাজিক সচেতনতা এবং কমিউনিটির কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। নিজের পেশাগত জীবন, পরিবার, সংস্কৃতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধকে তিনি সুন্দরভাবে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ তাই শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।