প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি। প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও সাধারণ প্রবাসীদের একটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও মেলেনি- এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ সোসাইটি সাধারণ মানুষের জন্য কী করেছে?
আগামী ২৫ অক্টোবর রোববার বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন। প্রায় ৩৫ হাজার ভোটার নিয়ে এবারের নির্বাচনে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই। প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণা, ভোটার নিবন্ধনসহ সব মিলিয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয়ের আলোচনা রয়েছে। কারও কারও হিসাবে এই ব্যয় ২০ লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, নেতৃত্ব নির্বাচনে এত অর্থ ও শ্রম ব্যয় করা সম্ভব হলে তার সামান্য অংশও কেন প্রবাসীদের কল্যাণে ব্যয় করা যায় না?
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলগুলোর ইশতেহারে রয়েছে নানা আশাব্যঞ্জক প্রতিশ্রুতি। এসব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সোসাইটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী কমিউনিটিগুলোর জন্য একটি আদর্শ সংগঠনে পরিণত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দী পরও কেন মৌলিক সেবার প্রতিশ্রুতি দিতে হচ্ছে? বিগত দিনের নেতৃত্ব এসব ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছে, তারও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ইফতার মাহফিল, জাতীয় দিবস উদ্যাপন, কবরস্থানের ব্যবস্থা কিংবা সীমিত পরিসরে বাংলা স্কুল পরিচালনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু লাখো প্রবাসীর প্রতিনিধিত্বের দাবিদার একটি আমব্রেলা সংগঠনের দায়িত্ব কি এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে?
এই কমিউনিটিতেই অসংখ্য মানুষ কর্মসংকট, বাসাভাড়া পরিশোধে অক্ষমতা, অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তার অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। নতুন অভিবাসীদের আবাসন, চাকরি ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রামও কম নয়। এসব মানুষের পাশে বাংলাদেশ সোসাইটি কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারছে, সেটিই হওয়া উচিত সংগঠনটির সাফল্য বিচারের প্রধান মানদণ্ড।
একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে বিপুলসংখ্যক ভোটার নিবন্ধন, ব্যয়বহুল প্রচারণা ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার পেছনে উদ্দেশ্য কী—শুধুই সমাজসেবা, নাকি অন্য কোনো প্রত্যাশাও রয়েছে? এমন প্রশ্নের জন্ম হলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহিই পারে নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে।
এবারই প্রথম বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করা হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগও বেশি। এই তিন বছরে একটি কার্যকর প্রবাসী সহায়তা কেন্দ্র, কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সেবা, অভিবাসন ও আইনি পরামর্শের ব্যবস্থা এবং বিপদগ্রস্ত পরিবারের জন্য জরুরি সহায়তা তহবিল গড়ে তোলা অসম্ভব কোনো লক্ষ্য নয়।
অতীতের সীমাবদ্ধতা ভুলে নতুন নেতৃত্বের কাছে সাধারণ প্রবাসীদের প্রত্যাশা- বাংলাদেশ সোসাইটি সত্যিকার অর্থেই একটি কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। নির্বাচন শেষে বিজয়োৎসবের পাশাপাশি শুরু হোক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ।
কারণ, একটি সংগঠনের সাফল্য কত হাজার মানুষকে ভোটার বানাতে পেরেছে, তা দিয়ে নয়; কত হাজার বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে, তা দিয়েই বিচার হওয়া উচিত।