বাবা জন্মদাতা-মহান স্রষ্টা এ সম্মান দেন। বাবার অনেক পরিচয় থাকতে পারে। একজন বাবা-এটাই তার সেরা পরিচয়। অনেকে শিশু বয়সে বাবা হারান। বাবার অবর্তমানে কেউ এগিয়ে আসেন, স্নেহের হাত বাড়ান। কিন্তু বাবার অভাব পূরণ হয় না। কেউ কেউ বাবার মতন কিন্তু বাবা নন। বাবা পরিবারের বটগাছ। যে গাছের ছায়ায় অনেক চারাগাছ আশ্রয় পায়? একসময় বড় হয়। শাখা-প্রশাখা গজায়। বাবা-শিকড়ের টান, রক্তের বাঁধন।
মেয়েটি সাত ভাই চম্পা। নিজে পছন্দ করে এবং তাকেই বিয়ে করে। বাবা-মা রাজি ছিলেন না। কিন্তু তারা বাধ্য হন। বিয়ের পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে। সেখানে অনুভব করে-সে বা তার স্বামী অবহেলিত, অসম্মানিত। একধরনের কষ্ট পায়। বাবার বাড়িতে আসা-যাওয়ার যবনিকা পড়ে। ছেলেটির কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। কাঠের ব্যবসা শুরু করে। কাঠের দরজা-জানালা তৈরি করে। আসবাবপত্র বানায়। মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সবাই তাকে চেনে-একজন কাঠুরিয়া। মেয়েটি পরিচিতি পায় ‘কাঠুরিয়ার বউ’। কাঠুরিয়া দম্পতির ঘরে নতুন মেহমান। নাম সুখী। কন্যা সুখীকে নিয়ে দম্পতির ‘সুখের সংসার।’
দীর্ঘ ২০ বছর পর। বাবা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে আছেন। দেখার কেউ নেই। মা অনেক আগেই বিদায় নেন। সাতটি ভাই পৃথিবীর সাত প্রান্তে। মেয়েটি ও তার স্বামী ছুটে যান। দিন-রাত সেবা করেন। বাবাকে সুস্থ করে তোলেন। এবার বিদায়ের পালা। স্নিগ্ধ শীতল বারান্দা। শীতের সকাল, মেয়েটি অসীম বিস্ময়ে বাবাকে দেখছে-সংসারের কোলাহল থেকে বাবা আজ অনেক দূরে। মেয়েটি বলল-বাবা, এখন আমাদের বিদায় দাও! বাসায় সুখী একা। তোমার ওষুধগুলো বুঝে নাও! বাবা চমকে ওঠেন, মা-তোমরা যাবে বৈকি। আমার কি সাধ্য আছে তোমাদের ধরে রাখব। দুজনে আমার পাশে একটু বসবে? দুজনই শান্ত হয়ে পাশে বসে। বাবা কাঠুরিয়া জামাইর হাতটি ধরেন, বাবা, তোমাকে একটি কথা বলতে চাই।
-জি বাবা, বলুন।
-বাবা, আমার সাতটি ছেলে-পৃথিবীর সাত প্রান্তে। তাদের হাতে সময় ও সুযোগ নেই। আমার শেষ যাত্রায় তুমি আসবে তো? আমার এ ভারী বোঝা বইবে তো?
জামাইর ক্লান্ত কণ্ঠ-আমি একজন সামান্য কাঠুরিয়া, আমি কি সে ক্ষমতা রাখি? কী করে আপনার ভারী বোঝা বইব?
শ্বশুরের স্নেহসুর-বাবা, ঝিনুকের ভেতর মুক্তো থাকে। মুক্তো কি সবাই খুঁজে পায়? এ আমার ব্যর্থতা। আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।
মেয়েটার চোখে জল-বাবা, আমি গত ২০টি বছর অপেক্ষা করেছি! কবে তুমি বলবে মুক্তো খুঁজে পেয়েছ! কবে বাবা, কবে? মেয়ে, বাবা, জামাইÑতিনজনই বুঝতে পারে-সুখের ঘরে ‘অনন্য সময়’, ‘অরুণের আভা’।
সন্তান জন্মের সূচনায় বাবার পরিচয় চাই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবার পরিচয় চাই। কর্মক্ষেত্রে ঢুকবে, সেখানেও প্রয়োজন। এমনকি সেদিন, যেদিন, ‘বিয়ের আসর’ কাজি সাহেব-সবার সম্মুখে তুলে ধরছেন-কে আমি? কী আমার পরিচয়? বাবার পরিচয় চাই-ই চাই।
এক জীবন থেকে আরেক জীবনে যাব-বাবার পরিচয় চাই। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই বাবার পরিচয় চাই, বাবা-এক অনন্য পরিচয়।
লেখক : অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ। ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, নিউইয়র্ক প্রবাসী।