বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

তাজিয়া মিছিল ও মাতমে কারবালার শোক স্মরণ, রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা

তাজিয়া মিছিল ও মাতমে কারবালার শোক স্মরণ, রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা

বিজ্ঞাপন
কালো পোশাক, খালি পা, হাতে কালো শোকের পতাকা। চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে—‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে কারবালার শোক ও ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে রাজধানীতে ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের করেছে শিয়া সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ।
 
শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনী দালান ইমামবাড়া প্রাঙ্গণ থেকে মিছিলটি শুরু হয়। পরে এটি বকশীবাজার, আজিমপুর, নিউমার্কেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ধানমণ্ডির প্রতীকী ‘কারবালা’ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
 
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীরা ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শহীদ হন। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর আশুরার দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শোকানুষ্ঠান ও তাজিয়া মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে রাজধানীর হোসেনী দালান থেকে এই মিছিল বের হয়ে আসছে।
 
সকাল থেকেই পুরান ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, পুরুষ, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মানুষ মিছিলে যোগ দিতে হোসেনী দালানে সমবেত হন। কারও চোখে অশ্রু, কেউ বুক চাপড়ে মাতম করেছেন, আবার কেউ নীরবে হেঁটে কারবালার বেদনা স্মরণ করেছেন। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল শোক, সংযম ও আত্মত্যাগের চেতনা।
 
মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়া পারভেজ রেজা বলেন, "প্রতি বছর এই দিনে আমরা মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনকে স্মরণ করি। ইসলামের জন্য তিনি ও তাঁর পরিবারের যে আত্মত্যাগ, সেটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চাই, কী নির্মমতার মধ্য দিয়ে কারবালায় সত্যের পক্ষে থাকা মানুষগুলো শহীদ হয়েছিলেন।"
 
তিনি আরও বলেন, "অনেকে এটিকে বিদআত বলে সমালোচনা করেন। কিন্তু আমরা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে এবং ইমাম হোসেনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই এই শোক পালন করি। তাই এই আয়োজন বন্ধ করার চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক।"
 
মিছিলে অংশ নিতে আসা কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, "আজ আমরা শোক প্রকাশ করতে এসেছি। ইসলামের জন্য ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতি বছর এই মিছিলে অংশ নিই।"
 
হাজারীবাগ থেকে সন্তানদের নিয়ে আসা সামিনা রহমান বলেন, "আমার শাশুড়ি বহু বছর ধরে আসেন। আমিও এখন পরিবারের সঙ্গে অংশ নিই। শোক পালনের পাশাপাশি ঘোড়ার পা ধোয়া দুধ সংগ্রহ করে গায়ে মাখি এবং বাড়িতেও নিয়ে যাই। আমাদের বিশ্বাস, এতে মনের অনেক বাসনা পূরণ হয়।"
 
তবে এ ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার ইসলামের মূল ধর্মীয় বিধানের অংশ নয়; এটি কিছু অংশগ্রহণকারীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
 
এবারের তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশ, র‍্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। মিছিলের পুরো পথজুড়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
 
নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আগেই নির্দেশনা দিয়ে জানিয়েছিল, তাজিয়া মিছিলে দা, ছোরা, তলোয়ার, বল্লম, কাঁটা, লাঠি, আতশবাজি, বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু কিংবা আত্মআঘাতমূলক কোনো সরঞ্জাম বহন করা যাবে না। অংশগ্রহণকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বানও জানানো হয়।
 
অংশগ্রহণকারীদের ভাষায়, কারবালা শুধু একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের স্মৃতি নয়; বরং সত্য, ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগের এক চিরন্তন প্রতীক। সেই চেতনা ধারণ করেই প্রতিবছরের মতো এবারও শোক, সংযম ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে রাজধানীতে পালিত হলো পবিত্র আশুরার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আয়োজন—তাজিয়া মিছিল।
 
ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz