শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
​সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ♦ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল ♦ ট্রাম্পের উদ্যোগে বড় ধাক্কা

স্বস্তিতে লাখো অভিবাসী পরিবার

স্বস্তিতে লাখো অভিবাসী পরিবার

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে বড় ধরনের রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত রায়ে স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রচেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খেল। এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী পরিবার, বিশেষ করে গ্রিনকার্ডবিহীন, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, ভিসাধারী এবং অনথিভুক্ত (আনডকুমেন্টেড) অভিবাসীদের জন্য স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এমন শিশুদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়, যাদের বাবা-মা মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা নন।
হোয়াইট হাউজের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া উচিত নয় এবং বর্তমান নীতির কারণে ‘বার্থ রাইট’ ও অনিয়মিত অভিবাসন উৎসাহিত হচ্ছে। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং অভিবাসী অধিকার সংগঠন এই আদেশকে অসাংবিধানিক দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয়।
৬-৩ ভোটে দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং এই সাংবিধানিক সুরক্ষা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না।
আদালত ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্র বনাম ওং কিম আর্ক মামলার নজির পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী অধিকাংশ শিশুই নাগরিকত্বের অধিকারী। 
এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নির্বাহী আদেশ বাতিলের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতিকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা বহাল থাকল। লাখো অভিবাসী পরিবারের মধ্যে অনিশ্চয়তা দূর হলো। ভবিষ্যতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পরিবর্তন করতে চাইলে কেবল প্রেসিডেন্টের আদেশ নয়, সংবিধান পরিবর্তনের মতো কঠিন প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে।
রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আদালতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে বর্তমান জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং এটি সংস্কার করা প্রয়োজন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা রায়কে সংবিধান ও আইনের শাসনের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন, অভিবাসী অধিকার সংগঠন এবং আইনজীবীরা বলেছেন, এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর সমান সাংবিধানিক অধিকারকে পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাদের মতে, নাগরিকত্ব কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত একটি মৌলিক অধিকার।
এই রায়ের ফলে অনথিভুক্ত (আনডকুমেন্টেড) অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। বৈধ ভিসাধারী বিদেশি নাগরিকদের সন্তানরাও পূর্বের মতো জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে। গ্রিনকার্ড বা নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়ায় থাকা বহু পরিবারের অনিশ্চয়তা কমবে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই রায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রাখলেও অভিবাসন আইন, আশ্রয়নীতি বা সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত অন্যান্য নীতিতে এর কোনো সরাসরি পরিবর্তন আনছে না।
নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষার্থী ভিসা, আশ্রয় আবেদন কিংবা অন্যান্য অভিবাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবস্থান করছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তে এসব পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৪তম সংশোধনীর দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যাকে পুনরায় শক্তিশালী করেছে এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতিকে বহাল রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সুপ্রিম কোটের প্রধান বিচারপতি জন জি. রবার্টস জুনিয়র সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখতে গিয়ে বলেন, নাগরিকত্ব অতীতেও যেমন ছিল, এখনও তেমনি মানুষের মৌলিক অধিকার ভোগের ভিত্তি। এটি রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক স্বাধীন ব্যক্তির জন্য যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আদালত আজ সেই প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করছে।
রায়ে আদালত কার্যত পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা সংবিধানের স্পষ্ট নাগরিকত্ব সুরক্ষাকে বাতিল বা সীমিত করতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, অনথিভুক্ত অভিবাসী বা অস্থায়ী বিদেশি নাগরিকদের সন্তানরা ১৪তম সংশোধনীর পূর্ণ সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। প্রশাসনের দাবি ছিল, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রচলিত ব্যাখ্যা অভিবাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রবণতা বাড়িয়েছে। কিন্তু আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি।
এই মামলায় প্রধান বিচারপতি রবার্টসের সঙ্গে আদালতের তিন উদারপন্থী বিচারপতি এবং বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে যোগ দেন। বিচারপতি ব্রেট কাভানফও নির্বাহী আদেশ বাতিলের পক্ষে ছিলেন, যদিও তিনি তার সিদ্ধান্তে সাংবিধানিক যুক্তির পাশাপাশি ফেডারেল আইনের ভিত্তিকেও গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস, নিল গরসাচ ও স্যামুয়েল আলিটো ভিন্নমত পোষণ করেন।
প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার রায় ও ভিন্নমত এই মামলার রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও সামাজিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করেছে। আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর অভিবাসী অধিকার সংগঠন, নাগরিক অধিকার কর্মী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা একে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ধারণার পক্ষে বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব শুধু অভিবাসন ইস্যু নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৪তম সংশোধনী গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া মানুষদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত হয়েছিল। সেই সংশোধনী আজও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া মানুষের নাগরিকত্বের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষাকবচ।
অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য এই রায় বিশেষ স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে কোটি কোটি অভিবাসী পরিবার বসবাস করছে, যাদের অনেকের সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়ায় মার্কিন নাগরিক। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে এসব পরিবারের শিশুদের নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, সামাজিক সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন আদেশ কার্যকর করা প্রশাসনিকভাবেও জটিল ও ব্যয়বহুল হতো। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথিপত্র স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে পরিচালিত হয়। বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থা যাচাই করে নবজাতকের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে গেলে একটি বিশাল, জটিল এবং ত্রুটিপূর্ণ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হতো। এতে ভুল সিদ্ধান্ত, বিলম্ব এবং বৈষম্যের ঝুঁকি বাড়ত।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের ‘অ্যাঙ্কর বেবি’ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন। তাদের দাবি, এসব শিশু ভবিষ্যতে পরিবারের অন্য সদ দের যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অবস্থান পেতে সহায়তা করে। তবে অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। মার্কিন নাগরিক সন্তান ২১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের জন্য গ্রিন কার্ডের আবেদন করতে পারলেও অনথিভুক্ত বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন, দীর্ঘ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
অনেক ক্ষেত্রে অনথিভুক্ত অভিভাবকদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও থাকে। ফলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে সহজ পথে অভিবাসন বৈধ করার ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
রায়ের পর অভিবাসনপন্থী সংগঠনগুলো স্বস্তি প্রকাশ করলেও রক্ষণশীল মহলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিরোধীরা আদালতের সিদ্ধান্তকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। কিছু রক্ষণশীল সংগঠন বলেছে, এই ইস্যুতে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংশোধনীর দাবি উঠতে পারে। তবে সংবিধান সংশোধন একটি অত্যন্ত কঠিন প্রক্রিয়া এবং এর জন্য কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যগুলোর ব্যাপক সমর্থন প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz