সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ :
• মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে পুলিশের সতর্ক অবস্থান, যান চলাচল স্বাভাবিক • বাণিজ্য মেলার প্রধান ফটক ভেঙে ক্যাম্পাসে ফিরলেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা • ভূমিকম্প মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর • ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু: টাকার কার্লসন • শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আটক ১ • পোশাকশিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে, সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের • পোশাকখাতে অস্থিরতার পেছনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মালিক-শ্রমিকরা দায়ী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী • ভারতের মণিপুরে নতুন করে জাতিগত সহিংসতায় নিহত ৫ • মধ্যবর্তী নির্বাচন ও মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস • গাজীপুরে ফের শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে এবং তারা কংগ্রেসের অন্তত একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে বলেই সাধারণভাবে সবাই মনে করছে।
তবে সম্ভাব্য সেই জয়ের ব্যবধান কতটা বড় হবে, তা আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে জয়ী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার আকার বা আসনসংখ্যার ব্যবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এই ব্যবধান এত তাৎপর্যপূর্ণ, তা বুঝতে ফিরে তাকাতে হবে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে; যখন নাটকীয় দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচন গোটা জাতির রাজনৈতিক গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া দুই ঐতিহাসিক মধ্যবর্তী নির্বাচন
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যাকে রাজনীতির ‘পুনর্বিন্যাস’ বা ‘রি-অ্যালাইনমেন্ট’ বলেন, উনবিংশ শতকের শেষভাগে দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচন তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল:

১৮৭৪: বদলে যাওয়া আমেরিকার গতিপথ
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ‘পুনর্গঠন’ (রিকনস্ট্রাকশন) পর্ব কীভাবে শেষ হয়েছিল, তা নিয়ে একটি সরল ইতিহাস প্রায়ই পড়ানো হয়: ১৮৭৬ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রাদারফোর্ড বি হেইজ পপুলার ভোটে হেরেও একটি আপস চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেন।

সেই চুক্তির শর্ত ছিল, দক্ষিণাঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কৃষ্নাঙ্গদের সুরক্ষায় নিয়োজিত কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। হেইজ হোয়াইট হাউজে বসলেও এর চরম মূল্য দিতে হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের।

সংবিধানে পাওয়া তাদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার হরণে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোর সামনে আর কোনো বাধা থাকেনি।

কেন্দ্রীয় সরকারের সেনা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাটরা মুক্ত ও প্রাক্তন দাস কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সব রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়।

সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আপস চুক্তিটির পটভূমি রচিত হয়েছিল আরও দুই বছর আগে, ১৮৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্র্যান্টের প্রশাসন তখন নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক ধসে বিপর্যস্ত।

সেই সুযোগে দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক অনিয়ম ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের মধ্যেই ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে (হাউজ) ৯০টির বেশি আসন ছিনিয়ে নেয়।

এর মধ্য দিয়ে ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকনের জয়ের পর থেকে চলে আসা প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে।

শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা সহিংসতা চালিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটদানে বাধা দিয়ে দক্ষিণের রাজ্য সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।

কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট দেওয়া বন্ধ করতে নানা বৈষম্যমূলক আইন চালু করা হয়। এর হাত ধরেই আফ্রো-আমেরিকানদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী নির্যাতন ও বিভাজনের 'জিম ক্রো' যুগের সূচনা হয়, যা পরে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বহাল ছিল।

প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে যাওয়ায় ‘পুনর্গঠন যুগের’ মৃত্যুঘণ্টা আসলে ১৮৭৪ সালেই বেজে গিয়েছিল; ১৮৭৬ সালের কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিটি ছিল কেবল তার আনুষ্ঠানিক পরিণতি।

১৮৯৪: রিপাবলিকানদের পুনরুত্থান ও অচলাবস্থার অবসান
১৮৭৪ সালের পর টানা দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্ষমতা নিয়ে প্রধান দুই দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান)মধ্যে তীব্র অচলাবস্থা চলছিল।

কখনও ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করত, তো সেনেট থাকত রিপাবলিকানদের হাতে, আবার হোয়াইট হাউজে ক্ষমতার অদলবদলের ফলে কোনও দলই দীর্ঘস্থায়ী নীতি প্রণয়ন করতে পারছিল না।

১৮৬8 ও ১৮৭২ সালে ইউলিসিস এস. গ্র্যান্টের বিজয়ের পর থেকে ১৮৯৬ সালে উইলিয়াম ম্যাককিনলির জয় পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনও প্রেসিডেন্টই পপুলার ভোটের ৫০% বা তার বেশি পাননি।

এই সময়কালকে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘অচলাবস্থার যুগ’ বলা হয়। কোনও একক দল টানা দুই বছরের বেশি প্রতিনিধি পরিষদ, সেনেট ও হোয়াইট হাউজ, এই তিনটির নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে ধরে রাখতে পারেনি।

ফলে জাতীয় নীতিনির্ধারণে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। ১৮৯৬ সালে ম্যাককিনলির জয়ে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি রিপাবলিকান আধিপত্যের নতুন যুগ শুরু হয়।

পরে তারই উত্তরসূরি থিওডোর রুজভেল্ট প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা সম্প্রসারণ করে আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্সির ভিত গড়ে তোলেন। তবে নির্বাহী ক্ষমতার এই রূপান্তরের বীজ বোনা হয়েছিল ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

১৮৯৩ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের দ্বিতীয় মেয়াদটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বিপর্যয়কর সময়।

১৮৯৩ সালের মহামন্দা, বড় ধরনের রেল ধর্মঘট এবং ওয়াশিংটনে বেকার শ্রমিকদের বিক্ষোভ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ১৯৩০-এর দশকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর আগে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা।

এরপর ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুনামি বলেই অভিহিত করেছেন।

সেই নির্বাচনে ক্ষুব্ধ ভোটাররা ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ১০০টিরও বেশি আসন হারায়।

নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল (২১৮-১২৪)। কিন্তু নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের আসন কমে

মাত্র ১০৪টি তে নেমে আসে, আর রিপাবলিকানরা একলাফে ২৪৪টি আসন জিতে কক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর মাধ্যমেই শুরু হয় ক্ষমতার ঐতিহাসিক পুনর্বিন্যাস।

‘ওয়েক-আপ কল’ ও আধুনিক প্রেসিডেন্টদের অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের নজিরবিহীন পরাজয়কে প্রায়ই ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

১৮৭৪ বা ১৮৯৪ সালের নির্বাচনের মতো বড় রাজনৈতিক সুনামি সচরাচর ঘটে না। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ব্যবধানে (৪০ বা তার বেশি) আসন হারানো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য ‘ওয়েক-আপ কল, যা তাকে পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

১৮৯৪ সালের সেই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পর থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত, মার্কিন ভোটাররা বারবার হোয়াইট হাউজের নীতি প্রত্যাখ্যান করে প্রেসিডেন্টদের এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

আধুনিক যুগে বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ওয়েক-আপ কলের মুখোমুখি হয়েছেন। যেমন: ১৯৪৬ সালে হ্যারি ট্রুম্যান, ১৯৫৮ সালে ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার, ১৯৬৬ সালে লিন্ডন বি জনসন, ১৯৭৪ সালে জেরাল্ড ফোর্ড, ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন, ২০১০ সালে বারাক ওবামা এবং ২০১৮ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প। এই প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল হাউজে অন্তত ৪০ বা তার বেশি আসন হারায়।

তবে এই সতর্কবার্তার প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে এক হয়নি। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েও রাজনৈতিক কৌশল বদলে ট্রুম্যান, ক্লিনটন ও ওবামা পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করেন।

অন্যদিকে, আইজেনহাওয়ার সাংবিধানিক নিয়মে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া লিন্ডন বি জনসন স্বেচ্ছায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

ওদিকে, জেরাল্ড ফোর্ড (জিমি কার্টারের কাছে) ও ডনাল্ড ট্রাম্প (জো বাইডেনের কাছে) পরবর্তী নির্বাচনে হেরে বিরোধী দলের প্রার্থীর হাতে হোয়াইট হাউজের চাবি তুলে দিতে বাধ্য হন।

২০২৬ সালের সমীকরণ: ইতিহাস কি এবারও কথা বলবে?
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ১৮৭৪ বা ১৮৯৪ সালের মতো বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কম। তবে একটি সতর্কবার্তা বা ‘ওয়েক-আপ কল’ প্রত্যাশা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘদিনের ধারা অনুযায়ী, হোয়াইট হাউজে যে দলই থাকুক না কেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে এক ধরনেরর ‘সতর্কবার্তা’ দিয়ে দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এসে ২০২৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনী সমীকরণ হুবহু অতীতের সেই ঐতিহাসিক পটভূমিগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজের সবকটি (৪৩৫টি) আসনেই ভোট হচ্ছে। বর্তমানে এখানে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে (২১৮-২১২)।

ইতিহাস বলছে, ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি মধ্যবর্তী নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল গড়ে প্রায় ২৬ থেকে ২৭টি আসন হারিয়েছে। ব্যতিক্রম কেবল ১৯৯৮ (ক্লিনটন) এবং ২০০২ সালের (বুশ) নির্বাচন।

বর্তমান জনমত জরিপ এবং উলফ রিসার্চ-এর মতো রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ৯০ শতাংশেরও বেশি পূর্বাভাস বলছে, ইতিহাস এবারও কথা বলবে এবং ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেবে।

ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনসমর্থন এবং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রা ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কারণে এই ধারণা আরও জোরাল হয়েছে।

তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ‘জেরিম্যান্ডারিং’ (দলীয় স্বার্থে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ)-এর কারণে এবছর যুক্তরাষ্ট্রে হাউজের নিয়ন্ত্রণ বদলাতে কোনও দলেরই বড় কোনও ঢেউয়ের প্রয়োজন পড়বে না।

প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের কেবল অল্প কয়েকটি আসন দখল করলেই চলবে।

প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র পাঁচটি আসন হাতবদল হলেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাবে এবং সেক্ষেত্রে ব্রুকলিন থেকে আসা ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস হতে পারেন পরবর্তী হাউজ স্পিকার। সেক্ষেত্রে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হাউজ স্পিকার।

তবে সব সমীকরণ উল্টে দিয়ে রিপাবলিকানরা যদি কোনোভাবে হাউজে তাদের বর্তমান সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ধরে রাখতে পারে, তবে সেটি হবে হ্যারি ট্রুম্যানের আমল থেকে চলে আসা আট দশকের ঐতিহাসিক ধারায় এক অভূতপূর্ব ব্যতিক্রম।

ইতিহাসের সেরা ১০টি প্রভাবশালী মধ্যবর্তী নির্বাচন:
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ের নির্বাচনগুলো মূলত সরকারের নীতি ও কাজের ওপর এক ধরনের গণভোট।

ইতিহাসে কেবল দুইবার ক্ষমতাসীন দল তাদের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন বাড়াতে পেরেছে। তবে সব মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব এক ছিল না; কিছু নির্বাচন জাতীয় ইতিহাসের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছিল:

১৮২৬: সৌহার্দ্যের যুগের অবসান
যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও রাজ্যের অধিকার নিয়ে বিরোধ কিছুটা স্তিমিত হয়ে ১৮১৫ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত ‘সৌহার্দ্যের যুগ’ চলছিল।

তবে ১৮২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামসের দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।

এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে মার্টিন ভ্যান বিউরেন আধুনিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভিত গড়েন এবং ১৮২৮ সালে অ্যান্ড্রিউ জ্যাকসন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।

অ্যান্ড্রু জ্যাকসন পপুলার ও ইলেক্টোরাল—উভয় ভোটে এগিয়ে থেকেও ম্যাজিক ফিগার না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত যায় প্রতিনিধি পরিষদে।

সেখানে হেনরি ক্লে-র সমর্থনে জন কুইন্সি অ্যাডামস প্রেসিডেন্ট হন। ১৮২৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে অ্যাডামসের জাতীয়তাবাদী ও ব্যয়বহুল অর্থনৈতিক নীতি মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।

জ্যাকসনের অনুসারীরা কংগ্রেসে একজোট হয়ে অ্যাডামস প্রশাসনের সব কর্মসূচি আটকে দেন। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থাই ‘সৌহার্দ্যের যুগ’-এর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

১৮৫৮: বিভক্ত কংগ্রেস ও গৃহযুদ্ধের পটভূমি
১৮৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি, যা সরাসরি গৃহযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।
দাসপ্রথা নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মধ্যকার চরম বিরোধ এই নির্বাচনের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আইনসভা বিভক্ত করে দেয়।

অর্থনৈতিক মন্দা এবং দাসপ্রথা নিয়ে দেশ যখন চরম বিভক্ত, তখন কানসাস রাজ্যে দাসপ্রথাপন্থি একটি বিতর্কিত সংবিধানকে সমর্থন দেন ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট জেমস বিউকানন।

এতে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ভাঙন ধরে ( উত্তরের ডেমোক্র্যাট এবং দক্ষিণের ডেমোক্র্যাট- এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়)। দাসপ্রথার বিস্তার রোধের অঙ্গীকার নিয়ে মাত্র চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রিপাবলিকান পার্টি তখন নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে সর্বাধিক আসন (প্লুরালিটি) লাভ করে।

রিপাবলিকানদের সেই অভূতপূর্ব উত্থানের পর, দক্ষিণাঞ্চলের দাসপ্রথাপন্থি রাজ্যগুলোর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ভয় চরম রূপ নেয়।

ক্ষুব্ধ দক্ষিণাঞ্চল হুমকি দেয়, কোনও রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শাসন বা ফেডারেল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেই হুমকিই গৃহযুদ্ধের বাস্তবতায় রূপ নেয়।

১৮৭৪: পুনর্গঠন যুগের সমাপ্তি
ইউরোপ ও আমেরিকার ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক ধস এবং ওয়াশিংটনে একের পর এক দুর্নীতির জেরে ইউলিসিস এস গ্র্যান্টের রিপাবলিকান পার্টি হাউজে ৯৬টি আসন হারায়।

এই বিপর্যয়ের মাধ্যমেই গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পর্ব মুখ থুবড়ে পড়ে এবং ১৮৭৬ সালের চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত হয়।

১৮৯৪: ডেমোক্র্যাটদের রেকর্ড পতন
চরম অর্থনৈতিক মন্দা ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ১১৬টি আসন হারায়, যা মার্কিন ইতিহাসে কোনো দলের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের রেকর্ড। সেনেটেও ৫টি আসন হারায় তারা।

দক্ষিণাঞ্চল ছাড়া পুরো দেশে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব গুঁড়িয়ে দিয়ে রিপাবলিকান আধিপত্যের নতুন যুগের সূচনা করে এই নির্বাচন।

১৯১০: রিপাবলিকানদের গৃহবিবাদ
শুল্ক নীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে নিজ দলের প্রগতিশীল অংশের আস্থা হারান প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট।
১৯১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৭টি এবং সেনেটে ১০টি আসন হারায়।
দলে ভাঙন ধরায় ১৯১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্যাফটের বিরুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট বিদ্রোহী প্রার্থী হন, যার সুযোগে মাত্র ৪২ শতাংশ পপুলার ভোট পেয়ে ডেমোক্র্যাট উড্রো উইলসন জয়ী হন।

১৯৩০: মহামন্দা ও ‘নিউ ডিল’-এর পদধ্বনি
১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধসের পর শুরু হওয়া মহামন্দাকে খাটো করে দেখে প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভার দাবি করেছিলেন, মানুষের আয় কমেনি বরং অহেতুক আতঙ্ক কাজ করছে।

সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তার জবাবে ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ৪৯টি এবং সেনেটে ৮টি আসনে হারিয়ে দেয়।

এই ক্ষোভের ওপর ভর করেই কৃষক, ট্রেড ইউনিয়ন ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি নিয়ে ১৯৩২ সালে ক্ষমতায় আসেন ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ছিল রাজনীতির সেই ঐতিহাসিক মোড়, যা হুভারের রক্ষণশীল যুগের অবসান ঘটিয়ে রুজভেল্টের প্রগতিশীল ও আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

১৯৪৬: ‘কিছু-না-করা’ কংগ্রেস বনাম ট্রুম্যান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দুর্বল অর্থনীতি ও আসন্ন স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানকে অনেকেই দুর্বল ভাবছিলেন।

১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হাউজে ৫৬টি এবং সেনেটে ১৩টি আসন জিতে ১৯২৮ সালের পর প্রথমবারের মতো উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।

তবে এই পরাজয়কেই কৌশলে শক্তিতে রূপান্তর করেন ট্রুম্যান। তিনি চালাকি করে ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, দেশের যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক কষ্টের জন্য প্রেসিডেন্ট দায়ী নন, বরং আইনসভায় বসে থাকা নিষ্ক্রিয় ও ধনকুবেরপন্থি রিপাবলিকানরাই দায়ী।

আর তাই রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনসভাকে ‘ডু-নাথিং কংগ্রেস’ (কিছু-না-করা কংগ্রেস) আখ্যা দিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে ১৯৪৮ সালের নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেন ট্রুম্যান।

১৯৬৬: জনসনের প্রতি ভোটারদের অনাস্থা
১৯৬৪ সালে ভূমিধস বিজয় পেয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার ও নাগরিক অধিকার আইন পাস এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্প্রসারণের রাজনৈতিক খেসারত দিতে হয় তাকে।
১৯৬৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউজে ৪৭টি ও সেনেটে ৩টি আসন হারায়।

এর মাধ্যমেই শুরু হয় ডেমোক্র্যাট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের নিউ ডিল এর অবক্ষয়, যা ১৯৬৮ সালে রিপাবলিকান রিচার্ড নিক্সনকে হোয়াইট হাউজে পৌঁছে দেয়।

১৯৯৪: রিপাবলিকান বিপ্লব
স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের ব্যর্থতা ও সামরিক বাহিনীতে সমকামীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ার পর নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে জ্বলে ওঠে রিপাবলিকান পার্টি।

টানা ৪২ বছর পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষের দখল নেয় তারা; ডেমোক্র্যাটরা হাউজে ৫৩টি এবং সেনেটে ৭টি আসন হারিয়ে রক্তক্ষরণের শিকার হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পরামর্শে ক্লিনটন মধ্যপন্থার নীতি গ্রহণ করে ১৯৯৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন।

তবে দুই বছর পর এই রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউজেই মনিকা লিউইনিস্কি কেলেঙ্কারিতে অভিশংসনের মুখে পড়েন তিনি, যদিও সেনেট তাকে বেকসুর খালাস দেয়।

২০০২: ঐতিহাসিক স্রোতের বিপরীত যাত্রা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর শতবর্ষী ধারা ভেঙে দিয়েছিল এই নির্বাচন। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কোনও নতুন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা ক্ষমতাসীন দলকে ব্যালট বাক্সে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। কিন্তু ২০০২ সালে ঘটেছিল তার ঠিক উল্টো।

তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়াদের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি আসন হারানোর পরিবর্তে উল্টো কংগ্রেসের দুই কক্ষেই আসন সংখ্যা বাড়িয়েছিল।

২০০১ সালের ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ এবং প্রেসিডেন্ট বুশের আগ্রাসী প্রচারণার কারণে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা ৬টি এবং সেনেটে ২টি আসন বাড়ায়।

২০০১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় সেনেট ৫০-৫০ আসনে বিভক্ত থাকায় বুশ প্রশাসনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ‘টাই-ব্রেকিং’ ভোটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।

তবে ২০০২ সালের নির্বাচনে ওই জয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে রিপাবলিকানরা।

১৯৩৪ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের আমলে ডেমোক্র্যাটদের ৯টি আসন বাড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনও প্রেসিডেন্টের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন বাড়ার এটিই ছিল দ্বিতীয় ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে যতটা উন্মুখ থাকেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ততটা আগ্রহ দেখান না।

তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ রদবদল নয়, বরং এটি জাতীয় রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।

২০২৬ সালের নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই ধারণা করা যায়। এর পরিণতি কতটা গভীর হবে এবং তা কোনও নতুন রাজনৈতিক যুগের জন্ম দেবে কি না তার চূড়ান্ত রায় এখন কেবল মার্কিন ভোটারদের হাতে।

ঠিকানা/এসআর

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

 
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz