‘পৃথিবীর ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এমন ভয়াবহ শঙ্কার কথা বলেছেন প্রযুক্তি-জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি বিল গেটস। তাঁর এই সতর্কবার্তা কোনো আতঙ্কের গল্প নয়, বরং এ বছর সেপ্টেম্বরজুড়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নটিকে নতুন করে মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা উঠে এসেছে।
৮ সেপ্টেম্বর একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘সহস্রাব্দের অন্যতম জটিল ও প্রায় অসমাধানযোগ্য’ একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করেছে—এমন সাফল্যের ঘোষণা দিয়ে প্রযুক্তি-দুনিয়া যখন উচ্ছ্বসিত, অন্যদিকে এআই-নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা এক গবেষকের পদত্যাগের খবর নতুন অস্বস্তির জন্ম দেয়। তাঁর আশঙ্কা, এআই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। অর্থাৎ একই প্রযুক্তিকে নিয়ে একই দিনে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি—একদিকে মানুষের বুদ্ধির অসাধারণ সম্প্রসারণ, অন্যদিকে সেই বুদ্ধিই একদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। এর পরের ঘটনাগুলোও স্বস্তি দেয়নি।
১১ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রোপিক জানায়, তাদের এআই মডেল ব্যবহার করে বিপজ্জনক জৈবিক অস্ত্র তৈরির মতো গবেষণা এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের চেষ্টা তারা শনাক্ত ও প্রতিহত করেছে। এর মধ্যে একটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেটিকে আরও বেশি সংক্রামক ও ক্ষতিকর করে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত হুমকি-বিশ্লেষণে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে রোগজীবাণু ও সাইবার অপারেশনের মতো উচ্চঝুঁকির কর্মকাণ্ডে সহায়তা নেওয়ার চেষ্টার কথাও উঠে আসে। পরদিনই অ্যানথ্রোপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই প্রকাশ্যে এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম রাশ টেনে ধরার আহ্বান জানান। তার এমন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অনেকটাই একমত হয়েছেন, ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান, গুগলের এআই-প্রধান ডেমিস হাসাবিস এবং এক্সএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক।
বেশির ভাগ বিজ্ঞানী-গবেষকের ধারণা, প্রযুক্তির অতিবুদ্ধিমত্তার এমন দানবকে নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে তা হবে সভ্যতার অপমৃত্যু। যাঁদের হাতে এই দানব প্রাণ (সত্তা) পাচ্ছে, তাঁরাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না—এই দানবকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও ভয়ংকর কিছু শঙ্কা সামনে আসে। কোনো দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী যদি এআইকে ব্যবহার করে বিপজ্জনক রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্র তৈরির জ্ঞান অর্জন করে? যদি স্বয়ংক্রিয় এআই সাইবার ব্যবস্থায় প্রবেশ করে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল করে দিতে পারে? আর যদি কোনো একদিন এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র মানুষের চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে?
অর্থাৎ প্রশ্নটি এআই থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এআই-এর ক্ষমতার লাগাম, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
এখানেই সামনে আসে বিশ্বরাজনীতির জটিল বাস্তবতা। এআই এখন শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই-প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, ততই নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি জটিল হয়ে উঠছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই-কে কেবল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে অভিহিত করতে চান না; তিনি এটিকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ হিসেবেই উল্লেখ করতে পছন্দ করেন। তাঁর মতে, ‘সুপার পাওয়ার’ হতে হলে সুপার ইন্টেলিজেন্সের অন্য কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, চীনকে কোণঠাসা করতে হলে কোনো যুক্তিতেই এমন শক্তিশালী প্রযুক্তিকে ঠেকানো উচিত হবে না।
গেল ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে এলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এআই নিয়ে আলাপ করেন। শি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত’। দুই ‘সুপার পাওয়ার’-এর দুই নেতা মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে করমর্দন করে যে যার পথে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁদের পেটের কথা বের করে আনার জন্য আজও কোনো এআই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের খবর জানা যায়নি।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের ১৬ তারিখে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাংবাদিকদের ডেকে পাঠিয়েছেন। বর্তমানে মানবজাতির ভালো-মন্দ যাঁর কাঁধে, সেই মহাসচিব মানবজাতির অস্তিত্বের সামনে তিন ভয়ংকর হুমকি আঁচ করতে পেরেই এমন উদ্বিগ্ন হয়েছেন। তিনি মনে করছেন, মানুষের অস্তিত্ব আজ এক গভীর ও বহুমাত্রিক হুমকির মুখোমুখি। মানবজাতির প্রতি তাঁর সতর্কবার্তায় উঠে এসেছে আসন্ন তিনটি বিপদের কথা। তিন জানিয়েছেন, অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষে মানুষে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মানুষকে খুব দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির কৃষ্ণগহবরের দিকে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, মানবজাতি এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছে, যখন প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন অভাবনীয় সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি ভুল নিয়ন্ত্রণের কারণে তা অভাবনীয় ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে।
এর ঠিক কয়েক দিন পর, ২২ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুতেরেস বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি যুদ্ধ ও শান্তি, বৈষম্য, জলবায়ু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের চারটি প্রধান ‘ক্ষমতার পরীক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত কখনোই যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
আগুন আবিষ্কার মানুষকে সভ্যতার একটি বড় ধাপে পৌঁছে দিয়েছিল। অথচ সেই আগুন দিয়েই মানুষ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য; সেই শক্তিই মানবজাতিকে এক মুহূর্তে পৃথিবী ধ্বংস করার ক্ষমতা দিয়েছে। প্রশ্ন তাই, এআইও কি সেই একই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে?
যদি এআই মানুষকে নীরোগ এবং দীর্ঘায়ু লাভের পথ দেখায়, খাদ্য উৎপাদন বাড়ায়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে এবং জ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়—তাহলে সেটি হবে মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।
কিন্তু যদি সেই একই প্রযুক্তি মানুষের প্রতারণা, যুদ্ধ, সাইবার হামলা, জৈবিক, রাসায়নিক অস্ত্র কিংবা স্বয়ংক্রিয় হত্যাযন্ত্র তৈরির ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই : আমরা কি এমন একটি শক্তি সৃষ্টি করছি, যার ব্যবহারের নিয়ম তৈরির আগেই তার ক্ষমতা আমাদের নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম করে ফেলবে?
অনেকেই মনে করেন, সময় হয়তো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার মতো সময় মানুষের হাতে আর আছে কি? কারণ অতিবুদ্ধিমত্তার কোনো দানব যদি একদিন সত্যিই মানুষের দুয়ারে মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয়, তখন তাকে থামানোর জন্য নতুন কোনো বুদ্ধিমান প্রযুক্তি আবিষ্কারের সুযোগ হয়তো মানুষের হাতে থাকবে না।
আর এখানেই আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে-মানুষের মৃত্যুঘণ্টা কি বেজে গেছে?
লেখক : প্রাবন্ধিক, ফ্রান্সপ্রবাসী।