সমগ্র বিশ্বটাই যেন এখন এক কঠিন সংকট এবং অস্থিরতায় আক্রান্ত। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি—সবকিছুতেই সংকট। সংকট আন্তর্জাতিক সম্পর্কে। মানুষের মনস্তত্ত্বেও সংকট। আর সংকট সৃষ্টির পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করছে কখনো মানুষের যা খুশি তা-ই করার প্রবণতা। কখনো রুদ্র প্রকৃতির প্রতিশোধস্পৃহা। প্রকৃতি দারুণ রুষ্ট মানুষের খেয়ালিপনায়, অদূরদর্শিতায়। তাই তো কোথাও যুদ্ধ, কোথাও ভূমিধস, জলোচ্ছ্বাস, আবার কোথাও-বা ঘূর্ণিঝড়, সুনামি, আম্ফান বা বজ্রপাত। কোথাও বিক্ষোভ, স্বাধীনতার অভিলাষ। কোথাও আধিপত্য বিস্তার এবং কাউকে পদানত করে রাখার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা।
যুদ্ধ চলছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে। মানবতার অপমান, পদদলিত হচ্ছে ফিলিস্তিন, গাজা, লেবাননে। মানুষ মরছে, রক্ত ঝরছে, পঙ্গুত্ব বরণ করছে। ইয়েমেন-সৌদি আরব, হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধ। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতাবঞ্চিত করে রাখার লড়াই। বলতে গেলে কি, মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই টালমাটাল অবস্থা। ভূমিধস, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে নেপাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কত জনপদ, খোঁজ মিলছে না প্রিয়জনদের। রাজনৈতিক অস্থিরতায় টালমাটাল ইউরোপের ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম। কোথাও তেলাপোকার উৎপাতে ক্ষমতাসীনরা দিশেহারা। আবার কোথাও বিতাড়িত নেতার স্বদেশ ফেরার ঘোষণায় সংঘাত, রক্তপাতের আশঙ্কা। অবহেলা এবং অদূরদর্শিতায় ডেঙ্গুতে মরছে জাতির ভবিষ্যৎ হাজার হাজার শিশু। একই কারণে প্রতিবছর ডেঙ্গুতে মারা যায় শত শত মানুষ। পাশাপাশি আছে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায়। হাম, ডেঙ্গুর এই হন্তারক পরিস্থিতি আর কোথাও নয়—এ আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশে।
আমরা দেশের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা সংবাদ নিয়ে সম্পাদকীয় রচনা করে থাকি। এবার নজর দেব মানুষের গাফিলতি এবং বঞ্চনার ফলে সৃষ্ট হাম-ডেঙ্গুতে কীভাবে স্বদেশে অসহায়ের মতো শিশু এবং বয়স্ক মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে প্রতিবছর। সঠিক শুমারিও হয় না এসব মৃত্যুর। মানুষের অবহেলায় মানুষের এমন করুণ মৃত্যুর কষ্ট সহ্য করা কঠিন। একসময় মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হতো। অনেক মানুষের মৃত্যু হতো কলেরায়। সেই ম্যালেরিয়া এখন ইতিহাসের পাতায়। মশা আছে, ম্যালেরিয়া নেই। মাঝেমধ্যে দু-একজন আক্রান্ত হয় ম্যালেরিয়ায় এখনো। মৃত্যুর কথা কমই শোনা যায়। সে কোন আমলের কথা।
আমরা এখন বসবাস করছি একুশ শতকে। তারও এক-চতুর্থাংশ শেষ হয়ে গেল। বিজ্ঞানের কী সব বিস্ময়কর সৃষ্টি। মানুষ চাঁদে যাচ্ছে। ইনফরমেশন টেকনোলজি কোথায় চলে গেছে। মানুষের সৃষ্ট এআই এখন মানুষকে চালাচ্ছে। রোবট ড্রোন—কত কী। বিজ্ঞানের গতির সঙ্গে মানুষ পেরে উঠছে না। সেই গতি কি এতটাই নির্মম, এতটাই নিষ্ঠুর যে, মানুষের সব আবেগ, সব ভালোবাসা, বিবেক, মনুষ্যত্ব হরণ করে নিচ্ছে। নাকি সবই আছে, কেবল ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কীসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’—এই বেদনা, সহমর্মিতার বোধ নেই।
দুই সপ্তাহ আগের খবর, ডেঙ্গুতে ৩০০ এবং হামে ১১৭০ মৃত্যু ছাড়িয়ে গেছে। কে জানে, এর মধ্যে আরও কত মায়ের কোল খালি হয়েছে। কেননা হামে সবই শিশুমৃত্যু ঘটছে। আর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই-বা কে জানে। এর মধ্যে প্রকোপ কমার কোনো সংবাদ নেই। উল্টো হাম এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। সংবাদটি ঠিকানার ১৪ অক্টোবর সংখ্যায় ৩ পৃষ্ঠায় প্রকাশ পেয়েছে। সংবাদটিতে হাম-ডেঙ্গুতে কেন এত মৃত্যু—বিশেষজ্ঞদের মতামতে তার কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ এতটা প্রবল হওয়ার কারণ : দীর্ঘদিন ধরে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এ বছর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এ কারণে যে, ২০২৫ সালে হামের টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা এবং চলতি বছরের শুরুতে প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এখানেই বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য। মানুষের কল্যাণ করবেন, দেশের উন্নতি করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা রাজনীতি করেন, তাদের রাজনীতি সার্বক্ষণিক হলেও মানুষের প্রতি দায়দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা সব সময় ক্যাজুয়াল। এমনটা হওয়ার কথা কখনো ছিল না। যারা ’৭১ ভুলে যান, ’২১, ’৬৯, ’৯০, ২০২৪ ভুলে যান, বাংলাদেশে তারা রাজনীতি কেমন করে করেন, সত্যি বুঝতে পারা যায় না। কত রক্ত, কত জীবন দান, মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, শিশুমৃত্যু, কত ধ্বংস, হাহাকার। এর পরও মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, আন্দোলন—সত্যিই অবিশ্বাস্য। মানুষকে সচ্ছলতা, মানুষকে নিরাপত্তা, জীবনযাপনে শান্তি দেওয়ার কথা বলে যারা মানুষের ভোট এবং সমর্থন নিয়ে সংসদে বসেন, সরকার চালান, তারা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, আরাম-আয়েশ নিয়ে ব্যস্ত হবেন আর জনগণকে দেওয়া ওয়াদা, জনস্বার্থ ভুলে যাবেন, স্বাধীন বাংলাদেশে এমনটা কেউ কল্পনাও করেনি।
কেন মানুষের প্রতি মানুষের এই অবহেলা, এমন উদাসীনতা? স্বাধীনতা অর্জনের পর ৫৫ বছর কেটে গেল—আর কত? এর কি কোনো শেষ নেই, সীমা নেই।