শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

হামে-ডেঙ্গুতে মহামারি : তবু নির্বিকার  ভাব কেন?

তায়েব মিল্লাত হোসেন | প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫
হামে-ডেঙ্গুতে মহামারি : তবু নির্বিকার  ভাব কেন?
বিজ্ঞাপন
চারদিকে নানান বিষয়। কিন্তু যেসবের সঙ্গে রাজনীতিটা আছে, সেগুলোতে চোখ বেশি সকলের। সংবাদমাধ্যমও সেভাবেই দিয়ে যাচ্ছে খবরের সেবা। এতে দেশের চলমান বড় একটি সংকট অনেকটা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। সেটা স্বাস্থ্য খাত-সংক্রান্ত। বলছি হাম ও ডেঙ্গু মহামারির কথা। এখন সন্ধ্যার পর যদি রাজধানী ঢাকার রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে কেউ যান, দেখতে পাবেন রোগীর ভিড় আর ভিড়। এদের বেশির ভাগই কিন্তু ডেঙ্গু আক্রান্ত। এ কারণে ওষুধের দোকানগুলো আবার ওরাল স্যালাইন বিক্রি করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দাম অনেক বেশি হলেও নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে ভ্যানে থাকা ডাব।
এসব ডেঙ্গু জ্বরের প্রভাব। এর পাশাপাশি আগে থেকেই তো দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। দুটো রোগ মিলিয়ে বাংলাদেশ একধরনের মহামারি পরিস্থিতি পার করছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারসহ স্বাস্থ্য খাতের অন্য অংশীজনরা সেভাবে তৎপর কি? গণমাধ্যমও কি এখন একধরনের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হিসেবে নিচ্ছে হাম-ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে? সে ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থাকে মহামারি বলব কি না, একটু সংশয়ে ছিলাম। তাই বিষয়টি এআই-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তার উত্তর এমন—জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক যে সংজ্ঞা, সে মোতাবেক বাংলাদেশে বর্তমান হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে নিশ্চিতভাবেই মহামারি বলা যায়। কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ হারের চেয়ে যখন কোনো রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় বা বেশি থাকে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে মহামারি (এপিডেমিক) বলা হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থাও বর্তমান পরিস্থিতিতে দাপ্তরিকভাবে ডেঙ্গু ও হামকে মহামারি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
আমাদের দেশের অবস্থা আসলেই ভয়াবহ। সেটা শুধু সরকারি পরিসংখ্যান বিচার করলেই নিশ্চিত হওয়া যায়। চলতি বছর বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ ভয়াবহতা নিয়ে অবস্থান করছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি আর অস্বাভাবিক। মূলত ৬৪টি জেলাতেই হামের বিস্তার ঘটেছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বছরের এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে। এর কারণে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৫ অক্টোবর সোমবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৪ অক্টোবর রোববার দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৮২। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩ জন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে যে হামে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, এটা তো এখন দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। দেশি-বিদেশি নানা সংস্থাই এমন কথা বলেছে। বিএনপি সরকার টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। তবু প্রাদুর্ভাব থামছে না কেন? হামে আক্রান্তদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারের কাছে আরও সক্রিয়তা আশা করছি। টিকাদানে সুনাম অর্জন করা বাংলাদেশ আবার আগের সেই জায়গায় ফিরে যাবে, এই রূপরেখা নিয়ে কাজ করতে হবে। হামে শিশুমৃত্যুর মিছিল অবশ্যই থামাতে হবে, এটা সরকারের প্রধান এক কর্তব্য হিসেবে দেখতে চাই।
ডেঙ্গু জ্বরেও বড় শিকার দেশের শিশুরা। তবে এটা হচ্ছে ছোট-বড় সবারই। এর প্রাদুর্ভাব এখন মৌসুমের সর্বোচ্চ ধাপ পার করছে। সাধারণত ডেঙ্গুকে একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। এই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এর তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৬ হাজার ৪৫৮ জন ছাড়িয়েছে। আর মৃতের সংখ্যা অন্তত ২৬২ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে রেকর্ড ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭৬ শতাংশ বেশি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর রোগ নয়। এটি এখন দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এখন বিষয় হচ্ছে, ডেঙ্গু কি এভাবেই থেকে যাবে? এর প্রতিরোধ কি নেই? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরেই ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তার ভাষ্যমতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ এডিস মশা নিধন নয়। সেটা করতে হবে, তবে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধ করতে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মারা গেলে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে। কিন্তু প্রজননস্থল থেকে গেলে সেখানে আবার নতুন মশা জন্ম নেয়। তাই স্থায়ী প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে আমাদের সবাইকে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা বিনাশ করতে হবে। আর হাম প্রতিরোধে শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দিতে হবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক— তিন পক্ষকেই সমান সক্রিয় থাকতে হবে। কোনো একটি পক্ষ যদি নির্বিকার থাকে, তবে রোগবালাই ঠিকই প্রবেশের ফাঁকটি পেয়ে যাবে। তাই মহামারিকে হারাতে আমাদের কারও আর নির্বিকার থাকা চলবে না।
কমেন্ট বক্স
© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz