বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে দেশের পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বের মান নির্ণয়ে বলা যায়, এক নম্বর। মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং বিশ্বপল্লির দর্শনের এই যুগে কোনো দেশ এখন আর বলতে পারবে না, বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ একা থাকব, একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে। এমনকি কোনো পরাশক্তিও এমন কথা বলার সাহস দেখাতে পারবে না। প্রতিটি দেশই একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করে চলে। যেখানে সহপথে, সহমতে চলা দেশগুলো সেই বলয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সে বিবেচনায় পররাষ্ট্রনীতি দেশের এক নম্বর জরুরি বিষয়। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি সমাজ-সংস্কৃতিও পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করে। পররাষ্ট্রনীতি মানে কূটনীতিতেও এগিয়ে থাকা; ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও অগ্রসরমান। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-একটি নির্দোষ-নির্ঝঞ্ঝাট অবস্থান। অবশ্যই সততা এবং বিনয়ের একটি দর্শন। বন্ধুত্বের পথ নিয়ে চললেও কখনো কখনো বৈরিতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। সকল সময় বন্ধুত্বের পথ অনুসরণ করে চলতে হলে সৎ প্রতিবেশী এবং বিশ্বস্ত মিত্রের প্রয়োজন হয়। সর্বক্ষেত্রে স্বদেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষা করতে চাইলে এমন প্রতিবেশী এবং মিত্র পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশ এদিক থেকে অনেকটাই দুর্ভাগা। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তে দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার। জলসীমান্তে চীন। এর মধ্যে ভারত সব থেকে নিকটবর্তী প্রতিবেশী। কোনো প্রতিবেশীকেই শত্রু বলা যাবে না। তবে একেবারে নিঃশর্ত মিত্র, তা-ও বলা যাবে না। মিয়ানমার দীর্ঘ দিন থেকে ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। তারা এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা এখন বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সব আলোচনাই বিফলে গিয়েছে। এখন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সংকট সৃষ্টি করে চলেছে। বহুপক্ষীয় আলোচনায় এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা চীনের পক্ষেই রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের বহুমুখী স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তাই চীন যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের ভূমিকাও প্যাসিভ। আবার জাতিসংঘে সক্রিয়তাও নির্ভর করে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ইশারায়।
বাংলাদেশে সদ্য গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি চীন সফর করে এসেছেন। সরকারপ্রধান হিসেবে চীনই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। সে সফরে তিনি খুব কার্যকর কিছু অর্জন করে এসেছেন বলেও মনে হয় না। রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় স্থান করে নিতে পেরেছিল কি না, সে সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর তাই কতটা সফল বা কতটা ব্যর্থ, তা নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও তেমন কিছু জোটেনি, এ কথাও বলা যাবে না।
এদিকে মিয়ানমার ইস্যুতে চীনের অতি সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বাংলাদেশকে গভীর শঙ্কায় ফেলেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির সরকার কঠিন অবস্থানে। তারা বিমান হামলা জোরদার করেছে। মিয়ানমারের যেকোনো উত্তেজনার চাপ বাংলাদেশের গায়ে লাগে। দেশটির জান্তা সরকারের পেছনে রয়েছে চীনের কঠিন সমর্থন।
তারেক রহমানের চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি কয়েকটি সমঝোতা স্মারক, চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষায় চীনের সমর্থন এবং তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ কথা ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ফ্রেমে’ বাংলাদেশ-চীন। তার পরও শি জিনপিং যখন বলেন, ‘বিশ্ব যতই বদলাক, চীন তার মূল দর্শনে অটল থাকবে’-এ কথার অর্থ যদি হয় সকল সম্পর্কের ওপরে নিজ দেশ ও মানুষের স্বার্থ, তাহলে আর যা-ই হোক নিজ স্বার্থকে নিঃশর্তভাবে অন্যের ভরসায় ছেড়ে দিলে পস্তানোর আশঙ্কাই অধিক। এ কথা অস্বীকার করার কোনো পথ নেই।
একটা কথা মনে রাখা জরুরি, অন্যের সহায়তা-সহযোগিতায় দাঁড়ানো যায় হয়তো কিন্তু হাঁটা বা দৌড়ানো যায় না। আজকের বিশ্ব বাস্তবতায় অন্যের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক রক্ষা করে চলার পাশাপাশি নিজেকেও সময়ের যে কূটনীতির ধারা, তার সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য প্রথম প্রয়োজন নিজেদের প্রস্তুত করা। কূটনীতিতে নিজেরা যদি ব্যর্থ হই, তবে সবাই তার ফায়দা লুটবে। তাই শুধু কৌশলগত কাঠামো পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলে সেটাই সব নয়। সময়ের সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করা জরুরি সর্বাগ্রে। যেখানে বাংলাদেশ অনেকখানিই পিছিয়ে। তাই মিত্রতার বেশে সবাই সেই দুর্বলতার সুযোগ নেবে-সেটাই স্বাভাবিক।