শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

এক বাংলা ভাষা ও সন-তারিখ প্রচলন বাঙালির মিলনের দিগ্দর্শন

এক বাংলা ভাষা ও সন-তারিখ প্রচলন বাঙালির মিলনের দিগ্দর্শন

বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কাগজে-কলমে বাংলা ভাষাকে সেই পাকিস্তান আমলেই ১৯৫৬ সালে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকার করে নেওয়া হয়। বাংলা একাডেমি ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতিষ্ঠাও হয় একই সময়ে। কিন্তু এই দীর্ঘ ৭০ বছরেও আমরা সর্বস্তরে বাংলাকে চালু করতে ব্যর্থ হয়েছি। স্বাধীন হয়েছি তাও হলো ৫৫ বছর! আজও আমাদের বাংলা ভাষা ও বাংলা সন-তারিখকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে হয়। ভাষা আন্দোলন স্মৃতি রক্ষা পরিষদ ও অন্যান্য সচেতন মহলের নিরবচ্ছিন্ন দাবি ও সংগ্রাম এবং জনসংযোগের ফলে সরকারকে ধীরে হলেও উদ্যোগ নিতে হচ্ছে বলে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন এবং বাংলা সন-তারিখের ইতিবাচক ব্যবহার শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বাংলা ভাষা ও সন-তারিখ তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে অচিরেই।

বাংলা ভাষা ও তার ব্যবহারকারীরা শুধু এই ‘বাংলাদেশ’ ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়, বাংলা এবং বাঙালি আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। ৩০ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। পৃথিবীতে ৬০৬০টির মতো ভাষা আছে। এর মধ্যে বাংলা চর্চার দিক দিয়ে ৫ম স্থান দখল করে আছে। বাংলার মতো মিষ্টি ভাষা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ইউনেসকোর অধীনে পরিচালিত জরিপে বাংলা ভাষা ‘Sweetest Language of the world’ নির্বাচিত হয়েছে। পৃথিবীর একমাত্র ভাষা বাংলা, যা বলার-লেখার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বাঙালিরা জীবন দিয়ে এই ভাষার সম্মান রক্ষা করেছে এবং তাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। যার সূত্র ধরে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা আজ বিশ্বে ১৯৩টি দেশে পালিত হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে লাখ লাখ বাঙালির বসবাস। আবার এটাও ঠিক, ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা হলো বাংলা। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড ও আরবের কোনো কোনো দেশে বাংলা স্কুল আছে। আজকাল বিভিন্ন দেশে ভোটের ব্যালট পেপারেও বাংলা নির্দেশিকা দেখা যায়। বলতে গেলে বিদেশে বাঙালিরা তাদের ভাষার যোগ্য সম্মান আদায় করতে পেরেছে। উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে, প্রবাসে উন্নত জীবনযাপন করতে গিয়ে বা প্রবাসী কর্মজীবীরা যে যে দেশে গেছেন, সেখানেই তারা সুন্দর সামাজিক পরিবেশে একটি একক বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনায় নানা রকম ঐক্যের বন্ধন গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে এবং বাংলা সন-তারিখর ব্যবহার, যেমন পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র-নজরুল জন্ম-মৃত্যুজয়ন্তী ইত্যাদি পালনের ক্ষেত্রে তারা বিভক্ত হয়ে যান। এই বিভক্তিকে পরিহার করে একটি সমন্বিত ভাষাচর্চার রীতি-নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিবসগুলোকে বাংলা সন-তারিখ অনুযায়ী, যা বর্তমানে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ও ইংরেজি তারিখের সঙ্গে সমন্বয়কৃত এবং সেই অনুযায়ী বাংলা তারিখের অনুষ্ঠান কর্মসূচি পালন করতে হবে।

প্রসঙ্গক্রমে আমি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের স্মৃতিকথামূলক ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড : আ মেমোয়ার’ বইটির ‘বাংলা ও বাংলাদেশের ধারণা’ শীর্ষক অধ্যায় থেকে কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই, ‘কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন? অভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসই কি তাদের এক করেছিল? এটা বড় ভূমিকা রেখেছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাঙালির ভাষা এবং এর সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষের গর্ব। বাংলাদেশে ও ভারতের রাজনৈতিক সীমানার উভয় পাশের বাসিন্দাদের বাঙালি পরিচিতির ক্ষেত্রে এই ভাষার একটি আশ্চর্য প্রভাব ছিল।’ তিনি আরও বলেন, “ছাত্র থাকাকালে আমি বিশেষভাবে অভিভূত হয়েছিলাম বাংলার বহুসংস্কৃতির মিলনে। এই ইতিহাস এখন বিস্মৃতপ্রায়। তবে প্রকৃতপক্ষে ‘সন’ নামে বাংলার বর্ষপঞ্জির ইতিহাস স্মরণ করার মতো। এটাই ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র টিকে থাকা পঞ্জিকা। সম্রাট আকবর একটি সর্বভারতীয় এবং কোনো একক ধর্মের নয়, এমন একটি পঞ্জিকা ‘তারিখ -ই- এলাহি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা বর্ষপঞ্জি কাটাছেঁড়া করেন। ১৬ শতকের শেষভাগে যখন চন্দ্রনির্ভর মুসলিম হিজরি পঞ্জিকায় প্রথম সহস্রাব্দ শেষের দিকে এগিয়ে আসছিল, সে সময় আকবর ভারতের জন্য হিন্দু জৈন বা পারস্য পঞ্জিকার মতো একটি সৌরবর্ষ-নির্ভর বহুসংস্কৃতির পঞ্জিকা প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। তবে তাতে মুসলিম হিজরি পঞ্জিকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সমন্বয়ের লক্ষ্য ছিল তাঁর। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ সালে তাঁর ওই বর্ষপঞ্জি গণনা শুরু হয়। হিন্দু শক পঞ্জিকার ১৪৭৮ এবং হিজরি ৯৬৩ সাল ছিল এটা। আকবরের উচ্চাশা সত্ত্বেও তাঁর তারিখ-ই-এলাহি পঞ্জিকা কখনো দিল্লি ও আগ্রার মানুষ গ্রহণ করেনি। যদিও আকবরের আদালতকক্ষে এটা ব্যবহার করা হতো। তবে তা ভালোভাবে গৃহীত হয়েছিল আকবরের সাম্রাজ্যে পরে যোগ হওয়া বাংলায়। আকবরের তারিখ-ই-এলাহির প্রভাবে সংস্কার হওয়া পুরোনো বাংলা বর্ষপঞ্জি আজও বহুল গুরুত্বের সঙ্গে অনুসৃত হয়। যখন আমি এই লাইনগুলি লিখছি, তখন বাংলা ১৪২৭ সন। তাই ধর্মীয় বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নকরণ নয়, বাংলার ইতিহাস হলো মিলনের ইতিহাস। এটাই সেই দর্শন ও বোঝাপড়া, যা একটি ঐক্যবদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের ধারণাকে বাস্তব করেছে। এ কারণেই বাংলাদেশ তার নিজের মতো করে বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে পারছে।” (১৩ আশ্বিন ১৪২৮, প্র. আ.)

পৃথিবীর একমাত্র দেশ বাংলাদেশেরই রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ ক্ষেত্রে আমাদের চর্চাকৃত প্রমিত বাংলা ভাষার চর্চাকেই সারা বিশ্বের বাঙালিদের গ্রহণ করা উচিত। যদিও আঞ্চলিকতা একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং আঞ্চলিক বাংলা এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে পৃথিবীর পঞ্চম স্থান দখল করা ভাষাভাষীর বাংলাকে লেখার ক্ষেত্রে, চর্চার ক্ষেত্রে একমাত্র প্রমিত বাংলাই হতে পারে ঐক্যবদ্ধ বাঙালির চালিকাশক্তি ও অস্তিত্ব বজায় রাখার মূলমন্ত্র। বর্তমানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চায় পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা থেকে ঢাকা এগিয়ে আছে। রাষ্ট্রভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধ বিচারে ঢাকাকে এখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির রাজধানী বিবেচনা করা যেতে পারে। বাঙালিরা এই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হলে বাংলার মানুষেরা বিশ্বদরবারে সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্থানে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হবে।

এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করি, গত তিন দশক থেকে ক্রমাগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ‘বাংলা’কে গ্রহণ করার জন্য ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ বিষয়ে সংস্থাটির মহাসচিবের সঙ্গে পত্রালাপে এই দাবির সঙ্গে অনেকেই শামিল হন। পরে সরকারি ভূমিকা বিষয়টিকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যায় এবং জাতিসংঘ নীতিগতভাবে এই দাবি মেনে নেয়। কিন্তু অর্থনৈতিক জটিলতার জন্য এর বাস্তবায়ন থমকে আছে। তবে তাদের সম্মতিদানের মাধ্যমে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষাকেই বিশ্বদরবার তাদের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিস্থিতিগত ও বাস্তবতার নিরিখে বিশ্ববাংলায় এক বাংলা (ভাষা ও সন-তারিখ) আজ সময়ের দাবি হিসেবে গ্রহণীয় হয়ে উঠতে যাচ্ছে। তাই আমাদের সকল বাঙালিকে খোলা মন নিয়ে এই কর্মপ্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।

লেখক : সভাপতি, ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz