Thikana News
২৯ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

টনিয়ার সাথে একদিন

পরিচয় হলো মেয়েটির সাথে। কে পরিচয় করিয়ে দিল খেয়াল নেই। চমৎকার মিশুক মেয়েটি। বাংলাদেশের ওর টুইনের মতো। নাম টনিয়া ওয়ালিন। কথায় কথায় মিষ্টি করে হাসে। টনিয়া এখানকার স্থানীয়। ওরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডরিস বজিন। ডরিসের বাবা-মা সাবেক যুগোসøাভিয়ার ক্রোয়েশিয়া থেকে এখানে মাইগ্রেট করেছিলেন। ডরিস বেশ রিজার্ভ। লম্বায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। টনিয়া ওর থেকে ইঞ্চিখানেক খাটো। মাঝে মধ্যেই আমি হিমশিম খেয়ে যেতাম এদের দুজনের মধ্যে কে বেশি সুন্দর, তা বের করতে গিয়ে। 
টনিয়ার সাথে একদিন
ক্লাসে মেয়েটিকে দেখেই চমকে উঠেছিলাম। এও কি সম্ভব! কোথায় সেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে বাংলাদেশে ফারজানাকে ফেলে এসেছি। আমার কাছে সেই ফারজানা এখন এক অতীত। কিন্তু এই প্রশান্ত মহাসাগরের তীরের এই মেয়েটি তাহলে কে? সেই একই চোখ, তেমনি গোলাকার মুখ, সেই প্রাণ-ভোলানো হাসি, সেই রকম করে তাকানো...। শুধু রংটা একটু বেশি ফরসা। নাহ্, সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। যে ফারজানাকে আমি দিনরাত ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, সে কেন বারবার আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে? তাহলে কি দুনিয়াটাই আমার ফারজানাময় হয়ে গেছে!! পরিচয় হলো মেয়েটির সাথে। কে পরিচয় করিয়ে দিল খেয়াল নেই। চমৎকার মিশুক মেয়েটি। বাংলাদেশের ওর টুইনের মতো। নাম টনিয়া ওয়ালিন। কথায় কথায় মিষ্টি করে হাসে। টনিয়া এখানকার স্থানীয়। ওরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডরিস বজিন। ডরিসের বাবা-মা সাবেক যুগোসøাভিয়ার ক্রোয়েশিয়া থেকে এখানে মাইগ্রেট করেছিলেন। ডরিস বেশ রিজার্ভ। লম্বায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। টনিয়া ওর থেকে ইঞ্চিখানেক খাটো। মাঝে মধ্যেই আমি হিমশিম খেয়ে যেতাম এদের দুজনের মধ্যে কে বেশি সুন্দর, তা বের করতে গিয়ে। একদিন ডরিস, লিনা আর টনিয়া এল আমার রুমে। ডরিস সাথে করে নিয়ে এসেছে পাঁচ কেজি ওজনের একটি বই, অস্ট্রেলিয়ান আর্ট আর কালচারের ওপর। ওদের সামনে পাঁজাকোলা করে বইটি চোখের কাছে নিয়ে এলাম। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল ওরা তিনজন। পাত্তা দিলাম না আমি। মেয়েদের সবকিছু গুরুত্বের সাথে নিতে নেই। ওরা কখন কী করে, কী মিন করে, তা সে একমাত্র তারা আর সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ বোঝে না। বইটি খুব ইন্টারেস্টিং। আমি কি কয়েক দিনের জন্য বইটি ধার নিতে পারি? আমার কথায় মিষ্টি করে হাসল ডরিস। হৃদয় আমার সাথে সাথে রক্তাক্ত হলো। বোধ হয় আমার মুখেও এর কিছুটা ছাপ পড়েছে। চট করে গম্ভীর হলো লিনা। প্রমাদ গুনলাম আমি। বাঁচিয়ে দিলো ডরিস। সবই লক্ষ করেছে ও। বলল, রাহমান, এটা তো তোমার জন‍্যই এনেছি। কিছুদিন তুমি এটা পড়তে পারো। আমার খুব প্রিয় বই এটি। আর কাউকে দেবে না কিন্তু। সুবোধ ছেলের মতো মাথা নাড়লাম আমি। আড় চোখে লিনার দিকে তাকালাম। নাহ্, ঝড় থেমে গেছে। এবার ডরিস হাতে নিল একটি সিডি। লিনার কাছে শুনলাম, ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক তুমি খুব পছন্দ করো। এটা হলো Dvark-এর। নিশ্চয় জানো এর সম্পর্কে। সত্যবাদী হলাম আমি। দুদিকেই মাথা নাড়লাম। কয়েক মিনিটে ডরিস সুন্দর করে বুঝিয়ে দিল Dvark-কে। তারপর বলল, এটাও তোমাকে দিলাম। মন দিয়ে শুনবে। মাসখানেক পর এসে এ দুটি নিয়ে যাব।

২.
সিডি প্লেয়ারে বিটোভেন-৯ বাজছে। এই মিউজিকটি আমার খুব প্রিয়। বিছানায় শুয়ে দুই চোখ বুজে শুনছি। এমন সময় রুমের ভেতর হট্টগোলে ধ্যান ভেঙে গেল। চোখ মেললাম বিরক্তি নিয়ে। লিনা। সাথে সাথে উঠে বসলাম আমি। চোখের নিমেষে উধাও হলো সব বিরক্তি। সিভিক যাবে? তুমি সাথে গেলে আমি রেডি। শুধু ওয়াশরুমে একবার যেতে হবে। প্রশ্রয়ের হাসি হাসল লিনা। আমি তো যাবই, মেরিও যাবে। আমি একলাফে দরজায় পৌঁছে গেলাম। আমার পাঁচ মিনিট লাগবে, লিনা। আরে দাঁড়াও। তুমি তো শুনলেই না কোথায় যাব। ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। লিনার পরবর্তী কথার অপেক্ষায় আছি। টনিয়া একটা মিউজিক স্টোরে কাজ নিয়েছে। তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। ইচ্ছে হলো লিনাকে জড়িয়ে ধরে গপাগপ কয়েকটি চুমু খাই। কিন্তু বাধ সাধল লিনা। আমার দিকে তাকালেই আমার সবকিছু পড়ে ফেলে ও। কৃত্রিম চোখ রাঙাল ও। আমি চললাম রেডি হতে। তুমি রেডি হয়ে ফয়ের-এ অপেক্ষা করো। সিভিকে (ক‍্যানবেরা মূল শহর) যেতে হলে প্রথমে পায়ে হেঁটে বেলকোনেন বাস টার্মিনাল। সেখান থেকে বাসে করে ১৫-২০ মিনিট। সিভিকে পৌঁছে টনিয়ার মিউজিক স্টোর ১০ মিনিটের হাঁটাপথ। আমাদের দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে উঠল টনিয়া। তিন তরুণীকে একান্তে কথা বলতে দিয়ে আমি সোজা স্টোরের সিডি অংশে চলে গেলাম। তন্ময় হয়ে দেখছি। কোনটা রেখে কোনটা কিনব! একসময় আমার পাশে কথা বলে উঠল টনিয়া। চিন্তায় পড়ে গেছ, তাই না? আমারও মাঝেমধ্যে এ রকম হয়। মনে হয়, এখানেই ২৪ ঘণ্টা পড়ে থাকি। বলতে বলতে চট করে একটা সিডি হাতে তুলে নিল ও। Mussorgsky-র নাম নিশ্চয় শুনেছ। আমার খুব ফেভারিট। অবসর সময়ে আমি প্রায়ই তার মিউজিক শুনি। পছন্দ হলে নিয়ে শোনো। যদি ভালো না লাগে, তাহলে পরে চেঞ্জ করে নিয়ো। সিডিটা নিয়ে কাউন্টারে দাম মিটিয়ে দিলাম। এবার টনিয়ার কাছ থেকে বিদায় নেবার পালা। ইউনিভার্সিটি তো আর কয়েক দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। সামারের বন্ধ তো অনেক লম্বা। এই বন্ধে কোথায় যাবে, ঠিক করেছ তোমরা? সবার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল টনিয়া। আমি কুইন্সল্যান্ড যাব। লিনা বলল। সেখানকার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমি যাব পিএনজি (পাপুয়া নিউগিনি)। মেরি বলল। আমার বাচ্চারা অস্থির হয়ে আছে আমার জন্য। তুমি কী করবে রাহমান? আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করল টনিয়া। এখনো ঠিক করিনি। সত‍্য কথাই বললাম আমি। আমার বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে কথা বলতে হবে। তবে ক‍্যানবেরায় থাকছি না, এটা শিওর। ছোট্ট একটা কাগজে একটা ফোন নাম্বার লিখল টনিয়া। তারপর সেটা আমার হাতে গুঁজে দিল। সিডনি চলে এসো, রাহমান। ওখানে অনেক কিছু দেখার আছে। বিশেষ করে, সিডনি অপেরা হাউস। আমি গোটা সামার সিডনিতেই কাটাব। তোমাকে যে ফোন নাম্বার দিলাম, সেটা আমার খালার বাসার। সেখানেই পুরো সামার থাকব আমি। নির্দ্বিধায় ফোন করতে পারো তুমি। সিডনিতে আমি তোমাকে সঙ্গ দেব।

৩. সিডনিতে আমরা দুভাগে এলাম। আমাদের সিনিয়র দুজন কোথায় উধাও হলো, জানি না। টুনু আর আমি টুনুর পরিচিত এক ভদ্রলোকের অ্যাপার্টমেন্টে উঠলাম। বাসাটা মেসের মতো। সপ্তাহ দুয়েক পর সে বাসা ছেড়ে সিনিয়র দুজন যে বাসায় উঠেছে, সেখানে চলে এলাম। অ‍্যাপার্টমেন্টটি পোশ এলাকা Bondai Sea Beach-এ অবস্থিত। সিনিয়রদের একজন সিরাজ। তার গ্রামের দুই খ্রিষ্টান মেয়ে এখানে এসে নার্স হয়েছে। তারা এই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। ঠিক হলো, বেডরুম দুটিতে তারা থাকবে। আর আমরা চারজন ড্রইংরুমে ফ্লোরিং করব। বাসা ভাড়া সপ্তাহে ১৬০ ডলার। আমরা এর অর্ধেক বহন করব। অন্যান্য আনুষঙ্গিকও অর্ধেক করে। রান্না যার যার। এবার সিডনিতে যে জন্য এসেছি, সেটা করতে নেমে পড়লাম অর্থাৎ কাজ খোঁজার পালা। বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দিই। কোনো খবর হয় না। টুনু আর আমি একদিন গেলাম এক রেস্টুরেন্টে। একটি sky scraper building-এ। এর ৪৪ তলায় রেস্টুরেন্টটি অবস্থিত। অত‍্যাধুনিক রেস্টুরেন্ট। যথারীতি ফরম ফিলআপ করলাম। ইন্টারভিউ দিলাম। কিন্তু ‘অতিরিক্ত বয়স’ হয়ে যাওয়ায় বাদ পড়লাম দুজনই। একটা ব্যাপার অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম। আমাদের সিনিয়র দুজন প্রতিদিন সকালে বের হয়ে যায়। রাতে ফেরে। কিন্তু আমাদের সাথে কিছু শেয়ার করে না। কোনো হেল্পও করে না। একদিন শুনলাম, এক সরকারি অফিসে বেকারদের রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে। পরে সুবিধামতো চাকরির ব্যবস্থা করে। ছুটলাম সে অফিসে। বিশাল লাইন। এক বিরাট দম নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। লাইনের মাঝামাঝি এসেছি, এমন সময় দেখলাম, টুনু এক বাংলাদেশি ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করছে আর মন দিয়ে তার কথা শুনছে। তাকে আমার তেমন আহামরি কিছু মনে হলো না। টুনু এবার হাসতে হাসতে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। সাথে সেই ভদ্রলোক। বজলু ভাই, আর কষ্ট করতে হবে না। আমাদের জব হয়ে গেছে। লাইন থেকে বেরিয়ে আসুন। প্রশান্ত মহাসাগরে ডুবতে ডুবতে অবশেষে তীরের দেখা পেলাম। কোথায়, টুনু? লাইন থেকে তড়িঘড়ি বের হলাম। পাছে অন্য কেউ জবটা নিয়ে নেয়। তখনো পাত্তা দিচ্ছি না ওর পাশে দাঁড়ানো খাটো করে ভদ্রলোককে। না মানে এখনো হয়নি। তবে ইনশা আল্লাহ তাড়াতাড়ি হবে। কে দেবে শুনি? অসহায়ভাবে লাইনের দিকে তাকালাম। আমার জায়গাটা বেদখল হয়ে গেছে। পৌঁছে গেছে কাউন্টারের কাছে। এভাবে ওদিকে তাকায়েন না, বজলু ভাই। শাহ আলম ভাইয়ের কথা শুনুন। শাহ আলম ভাইকে অনুসরণ করে আমরা সিডনির ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায় চলে এলাম। আমাদের বাস ভাড়া তিনিই মেটালেন। এক বিশাল বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। ম্যানেজার আমাকে আজ আসতে বলেছিল। আজ কাজে নেওয়ার কথা। আমি আপনাদের কথা বলব। আশা করছি নিয়ে নেবে আপনাদের। অন্য জায়গায় কাজ খুঁজে নেব আমি। আপত্তি করলাম আমরা। এটা হয় না। আপনার নির্ধারিত জব আমরা নিই কীভাবে? এবার পাত্তা দিলেন না শাহ আলম ভাই। এই শহরে আমি পাঁচ বছর ধরে আছি। এর অলিগলি আমার চেনা। কাজ খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না, ইনশা আল্লাহ। কিন্তু আপনি এটা কী করলেন, শাহ আলম ভাই! আবারও আমাদের কথা গায়ে মাখলেন না তিনি। মৃদু হাসলেন। আপনাদের সাফল্য কামনা করি। আর হ্যাঁ, ফ‍্যাক্টরির ম্যানেজার কিন্তু জিজ্ঞেস করবে তোমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কি না। বলবেন, দেশে থাকতে এ ধরনের কাজ প্রচুর করেছি। চুপি চুপি বললেন, এই একটু মিথ্যে কথা না বলতে পারলে জব হবে না যে! শাহ আলম ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফ‍্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমরা। ম‍্যানেজারের অফিস দোতলায়। রুমের বাইরে ব্যালকনি মতো। সেখানে দাঁড়িয়ে ফ‍্যাক্টরির বিশাল এলাকা চোখে পড়ল। হঠাৎ দূরে দৃষ্টি যেতেই ভয়ানকভাবে চমকে উঠলাম আমি। আমাদের সিনিয়র দুজন সেখানে নিবিষ্ট মনে শ্রমিকের কাজ করছে!

৪. প্রথম সপ্তাহের মজুরি পেলাম ২১০ ডলার। আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। দুই সিনিয়রের অন্যতম আবু আলম। তাকে টনিয়ার কথা বললাম। তিনিও উৎসাহিত হলেন। অন্যজন সিরাজ একেবারে নিরামিষ। না রে বাবা, আমি এসবের মধ্যে নেই। কষ্ট করে ডলার উপার্জন করছি। ঢাকা শহরে একটা ছোট্ট জায়গা কিনব। ওই টাকা শ্বেতাঙ্গ মেয়ের পেছনে ওড়াতে মোটেও রাজি নই আমি। হোক না সে আমাদের ক্লাসমেট। টুনুও রাজি হলো না কোথাও যেতে। ওর অন্য প্রোগ্রাম আছে। হাল ছাড়লেন না আবু আলম ভাই। টনিয়া তোমাকে ফোন নাম্বার দিয়েছে। তুমিই ফোন করো। আমি আছি তোমার সাথে। টনিয়াই ফোন ধরল। টেলিফোনের ওপাশে বেশ কিছু মুহূর্ত আমি শুধু পানির কলকল, ছলছল শব্দ শুনলাম। আন্তরিক ভাবাবেগের ভাষা যে এত বাঙ্ময় হতে পারে তা আমার ধারণা ছিল না। আমার বুকের ভেতর একটা কষ্ট পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠতে লাগল। আহা! যদি আমি ওর সব কটি উচ্চারিত কথা বুঝতে পারতাম! একসময় বোধ হয় টনিয়া উপলব্ধি করল, অপর প্রান্ত শুধুই শুনে যাচ্ছে। কিছু বলছে না। এবার একটু থেমে থেমে জিজ্ঞেস করল, এত দিন পর ফোন দিলে! আমি অর্ধেক ইংরেজি, অর্ধেক বাংলা মিলিয়ে বললাম, জবের সন্ধানে ছিলাম। পেয়েছ জব? অকৃত্রিম আগ্রহ ঝরে পড়ছে ওর কণ্ঠে। পেয়েছি। একটি অ‍্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ফ‍্যাক্টরিতে। দ‍্যাটস আ গুড নিউজ। তোমার নতুন একটা এক্সপেরিয়েন্স হবে। তাই। টনিয়ার সাথে একমত হলাম আমি। এবার বলো সামনের উইকেন্ডে কোথায় যাওয়া যায়। আমাদের সাথে খানও (আবু আলম ভাইকে ক্লাসের সবাই ‘খান’ নামেই ডাকে) যাবে। তাহলে তো খুব জমবে। শোনো রাহমান, আমি ঠিক করেছি সামনের উইকেন্ডে আমরা সিডনি অপেরা হাউসে অপেরা দেখব। কেমন হবে বলো তো? এক্সিলেন্ট আইডিয়া! উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠলাম আমি। আসলে ক্লাসে Great Planning Disasters-এ সিডনি অপেরা হাউস পড়ার পর থেকে এখানে একবার যেতে খুব ইচ্ছে করছিল। তাহলে রাহমান, আমি যে একটি লক্ষ্মী মেয়ে তা নিশ্চয় স্বীকার করবে? হাজার বার, লক্ষ বার। হাসতে হাসতে জবাব দিলাম আমি। তাহলে তুমিও লক্ষ্মী ছেলের মতো আজকের পেপারটা হাতে নাও (তখনো ইন্টারনেট আবিষ্কার হয়নি)। অপেরা হাউসের বিজ্ঞাপন চেক করে আমাকে বলো। অপেরা হাউসের বিজ্ঞাপন চেক করে লিস্ট করলাম। তারপর আবার টনিয়াকে ফোন করলাম। রোববারে Tristan and Isolde. এখনো চলছে শোটা? যদিও একবার দেখেছি আমি। কিন্তু এটি বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। একটু থামল টনিয়া। তাহলে এ কথাই ফাইনাল। তোমার সাথে La Costa রেস্টুরেন্টে দেখা হবে। রেস্টুরেন্টটি অপেরা হাউসের বাম কর্নারে পাবে। টেলিফোন নামিয়ে রাখতে যাচ্ছি, এমন সময় টনিয়া চিৎকার করে উঠল, রাহমান, তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। অপেরা হাউসে ভালো পোশাক পরে যেতে হয়। এটা ওদের নিয়ম। তুমি যদি স‍্যুট না এনে থাকো, তাহলেও চলবে। অ্যাট লিস্ট জিনস পরবে না। কিন্তু বাধ সাধলেন আবু আলম ভাই। টিকিটের দাম ৫৬ ডলার (১৯৯০) দেখে ঢোঁক গিললেন তিনি। বাদ দাও বজলু। এ তো গলাকাটা দাম! তারপর রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া তো আছেই। কিন্তু পিছু হটলাম না আমি।

৫. La Costa রেস্টুরেন্ট ছোট হলেও বেশ ছিমছাম। সামনের দিকে একটা টেবিলে প্রবেশপথের দিকে মুখ করে বসে পড়লাম। টিকিটের দিকে তাকালাম আরেকবার। শো শুরু হবে বিকাল ছয়টায়। টনিয়া পাঁচটায় আসবে বলেছে। আমি সাড়ে চারটার দিকে রেস্টুরেন্টে এসে বসে আছি। কোনো মেয়েকে অপেক্ষায় রাখা শোভনীয় নয়। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। রিস্ট ওয়াচের দিকে শেষবারের মতো তাকালাম। পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। এমন সময় এল ও। যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলে এসেছে সতেজ একটি ফুল। পরনে ফুলেল প্রিন্টের একটা কামিজ। ফরসা লম্বা পা দুটো দেখা যাচ্ছে। এই সাধারণ পোশাকেই অসম্ভব সুন্দরী লাগছে ওকে। আমার ওপর চোখ পড়তেই একটা চমৎকার হাসি উপহার দিল। রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি একসময় আমার সামনের সিটে মুখোমুখি বসে পড়ল। এত কাছাকাছি এই প্রথম। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। কী খাবে বলো? ইংরেজিতে প্রশ্ন করলাম ওকে। স্প‍্যাগেটি আর এক কাপ কফি। ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিলাম। স্প‍্যাগেটি এর আগে কখনো খাইনি। দেখে ঘাবড়ে গেলাম। প্লেটের ওপর একটু মোটা আস্ত নুডলস কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। খাব কীভাবে? আমার নার্ভাস ভাব লক্ষ করেছে টনিয়া। ভাবছ, কীভাবে শুরু করবে? রক্তিম মুখে নীরবে মাথা ঝাঁকালাম। আমাকে ফলো করো। হাসিমুখে বলল টনিয়া। প্রথমে ফর্কে স্প‍্যাগেটির কুণ্ডলীর মাথা পেঁচিয়ে নিল টনিয়া। তারপর টুক করে মুখে পুরে দিল। এরপর দাঁত দিয়ে এক প্রান্ত কেটে দিল। টুক করে কাটা কুণ্ডলী প্লেটে এসে পড়ল। ইশারায় শুরু করতে বলল ও। ইজ্জত রক্ষা করিয়ো, মাবুদ। মনে মনে বললাম আমি। শুরু করলাম। একবার, দুবারের পর ঠিক হয়ে এল। এই তো গুড বয়! মাথা নেড়ে উৎসাহ দিল টনিয়া। খেতে খেতেই নিজের কথা সংক্ষেপে বলল টনিয়া। খালার বাসা গতকালই ছেড়ে দিয়েছে ও। উঠেছে বান্ধবীর বাসায়। খালা খুব ডমিনেটিং। ওর ব‍্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এ দুদিন ভালো কেটেছে ওর। আশা করছে, এ রকম মুক্ত জীবনে বাদবাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারবে ও। খেতে খেতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। বিল মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সূর্যাস্তের সময় এখনো অনেক বাকি। সূর্যকে পেছনে রেখে সামনের দিকে এগোলাম আমরা। লক্ষ সিডনি অপেরা হাউস। সেখানে Tristan and Isolde দেখবো আমরা।

৬. অপেরা হাউসের বাইরের দিকটা যেমন সুন্দর, ভেতরের দিকটাও পাল্লা দিয়ে তেমনই সুন্দর। লবিটা দেখতে অনেকটা বড়লোকদের ড্রইং রুমের মতো। একদিকের দেয়ালে টাঙানো রঙিন কাচের ওয়াল হেঙ্গিং। সেখানে বর্তমানে চলমান অপেরার কিছু ছবি শোভা পাচ্ছে। শৌখিন ফটোগ্রাফার আমি। সুন্দর ছবি দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ি। কিন্তু অপেরার ছবি দেখার সময় ও সৌভাগ্য হলো না। অধিকাংশ দর্শকই থিয়েটারের ভেতরে প্রবেশ করেছে। আমরাও সেদিকে এগোলাম। ভেতরে ঢুকে একটু দমে গেলাম। পুরুষদের সবাই স‍্যুট পরে এসেছে। মহিলাদের পরনেও দামি ড্রেস। এদের মাঝে নিজেদের বড্ড গরিব গরিব লাগছে। টিকিট চেকারের হেল্প নিয়ে আমরা দুজন নিজেদের সিটে বসে পড়লাম। এবার সামনের দিকে তাকালাম। সিটের সারি অনেকটা স্টেডিয়ামের মতো। ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। তবে আসনবিন্যাস সিনেমা হলের উল্টো। আমরা সবচেয়ে কম দামি টিকিটের দর্শক। কিন্তু আমাদের সিট সবচেয়ে পেছনে অর্থাৎ ওপরে। আর দামি সিটগুলো ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে গেছে। এবার মঞ্চের দিকে তাকালাম। অনেকটা জাহাজের ডেকের মতো। এমনভাবে সাজিয়েছে, যেন সমুদ্রের মধ্যে ভাসছে। মঞ্চ থেকে একটু দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় অনেক যন্ত্রশিল্পী একসাথে বসে আছে। কয়েক সারিতে বসেছে তারা। সংখ‍্যায় অনেক। কম করে হলেও দেড়শ-দুইশ হবে। অল্পক্ষণের মধ্যেই অপেরা শুরু হলো। কোনো এক দুর্বোধ্য ভাষায় ওরা চিৎকার করে ডায়ালগ বলছে। তাও আবার একধরনের গানের সুরে। টনিয়াকে জিজ্ঞেস করতেই ও বলল, অস্ট্রিয়ান ভাষা এটা। একটু পর লক্ষ করলাম, কপালের ওপর অনেকটা ছাদের কাছাকাছি একটা সারবিমে (surbeam) ডায়ালগের ইংরেজি সাব-টাইটেল পড়া যাচ্ছে। চমৎকার ব‍্যবস্থা। আরও অবাক হলাম যন্ত্রীদলের পারফরম্যান্স দেখে। কীভাবে মিউজিক ডিরেক্টরের হাতের একটা ছোট্ট কাঠির ইশারায় মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে মিউজিকের! অপেরার সিকোয়েন্সের সাথে তাল মিলিয়ে। ঘণ্টা দেড়েক চলল অপেরা। তারপর ব্রেক। তাও ঘণ্টা দেড়েকের। সবার সাথে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। সবাই ছুটছে ডিনার করতে। আমরা ডিনার করব একটা আফ্রিকান রেস্টুরেন্টে। এটা আমার একটা ফেভারিট রেস্টুরেন্ট। এখানে এলে এই রেস্টুরেন্টে আমি যাবই। হাঁটতে হাঁটতে বলল টনিয়া। তারপর আমাকে বুঝিয়ে বলতে লাগল অপেরাটি। প্রথমে এর কাহিনি। পরে এর দৃশ্যগুলো। কথা বলতে বলতেই আমরা নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টের কাছে পৌঁছে গেলাম। বেশ ভিড়। কোনোমতে একটা টেবিল পেয়ে গেলাম। কী খাবে? জিজ্ঞেস করল টনিয়া। তোমার পছন্দের অর্ডার দাও। খাবার কিন্তু বেশ স্পাইসি আর ঝাল হবে। অসুবিধা হবে না তো তোমার? আমরা তো সব খাবার ঝালই খাই। তাই কোনো অসুবিধা হবে না। মৃদু হেসে জবাব দিলাম। খাবার এল অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়িই। বেশ ঝাল কিন্তু সুস্বাদু। খেতে খেতে টনিয়াকে ধন্যবাদ জানালাম এত সুন্দর একটা রেস্টুরেন্ট চুজ করার জন্য। তোমাকেও ধন্যবাদ আমাকে সঙ্গ দেবার জন্য। তোমার সাথে আমার সময় সুন্দর কাটছে। এতটা আশা করিনি। আন্তরিক ধন্যবাদ তোমাকে। কোনোমতে বললাম আমি। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, আমার মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেছে লজ্জায়। জীবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া। তাও শ্বেতাঙ্গিনী!

৭. অপেরা হাউসের দিকে ফিরে চলেছি আমরা। দর্শকদের সবাই। আমরা এবার একটু আগেই ফিরেছি। তাই এবার স্টিল ফটোগুলো মন উজাড় করে দেখতে লাগলাম। অপূর্ব ছবিগুলো। একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার একজন শিল্পীর দৃষ্টিতে ছবিগুলো তুলেছেন। দেখতে দেখতে অপেরার দ্বিতীয় ও শেষ অর্ধেক শুরুর সময় হয়ে এল। টনিয়া এবার আমার হাতে হাত রাখল। ভেতরে যাবে না? অপেরা শুরু হয়ে যাবে যে! মৃদু হাসলাম আমি। চলো। আমি ভেবেছিলাম, টনিয়া বোধ হয় ভুল করে আমার হাত ধরেছে। তাই আমি আমার হাত টেনে নেবার চেষ্টা করতেই আরও জোরে চেপে ধরল ও আমার হাত। আমি টনিয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই লাজুক হেসে অন‍্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল ও। আর এভাবেই আমরা আমাদের সিটে গিয়ে বসলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই অপেরা শুরু হলো। এবার আর অত দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে না। তা ছাড়া এবার আসার পথে টনিয়া পরবর্তী সিকোয়েন্সগুলো সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলেছে। বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। অপেরা দেখতে দেখতেই হঠাৎ আমার কাঁধে ওর মাথা রাখল টনিয়া। আড় চোখে চেয়ে দেখলাম আশপাশের অনেক মেয়েই তাদের পুরুষ সঙ্গীর কাঁধে মাথা রেখেছে। হাতে হাত। কিন্তু ওরা তো এই দেশীয়, শ্বেতাঙ্গ। হয়তো-বা ওরা কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউবা গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড। কিন্তু টনিয়া-আমি তো কোনো বিচারেই ওদের পর্যায়ে পড়ি না। কী করব আমি? স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার সারা শরীরে রক্তের চলাচল হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। অনেক কষ্টে নিজের মাথা ঠান্ডা রাখলাম। ওদিকে টনিয়ার মধ্যে এসব চিন্তা-ভাবনার বিন্দুমাত্র কোনো বালাই নেই। নেই তার মধ্যে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয়ও। নিবিষ্ট মনে অপেরা দেখছে ও। একসময় আমার ডান হাতটি আলগোছে টেনে ওর বুকের কাছে নিয়ে গেল। কোনোমতে আমি আমার দম স্বাভাবিক রাখলাম। একসময় আমিও অপেরার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। বিয়োগান্ত অপেরাটি হৃদয় আমার ছুঁয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে এলাম। ট‍্যাক্সি স্ট‍্যান্ড পর্যন্ত অনেক দূর পথ হাঁটতে হলো। অল্প অল্প বৃষ্টি পড়ছে। কম-বেশি ভিজলাম দুজনেই। ট‍্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে টনিয়া ওর ঠিকানা বলল। গাড়ি ছেড়ে দিল। টনিয়াকে আজ কথায় পেয়েছে। অনর্গল কথা বলছে ও। কথা বলতে বলতে হাসছে। আবার হাসতে হাসতে আমার শরীরের ওপর এলিয়ে পড়ছে। স্পষ্ট আমি বুঝতে পারছি, টনিয়া আজ আর নিজের মাঝে নেই। ওর জীবনের কোনো ঘটনার সাথে আজকের অপেরার একটা মিল আছে। টনিয়ার কাঁধে হাত রাখলাম আমি। মৃদু চাপ দিলাম। এবার আমার কাঁধে পুরো শরীর এলিয়ে দিল টনিয়া। এভাবে পুরো পথ চললাম আমরা। নির্ধারিত স্থানে এসে থেমে গেল গাড়ি। আমরা দুজন নেমে দাঁড়ালাম। টনিয়াকে বিদায় দিয়ে এই গাড়িতেই বাসায় ফিরব আমি। এবার আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিদায় নেব, এমন সময় দ্রুত অজি একসেন্টে একটা কথা বলল খেয়ালি মেয়েটা। কথাটা পুরোপুরি না বুঝলেও ভাবার্থ বুঝে ভয়ানকভাবে চমকে উঠলাম আমি। মুখে বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা এল না। কী বলব আমি! ট‍্যাক্সি ড্রাইভার অবাক বিস্ময়ে আমাদের দুজনকে দেখছে। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর মাথা নিচু করে ঘরের পথ ধরল টনিয়া। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম আমি। অন্ধকারের বুক চিড়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা।
 

কমেন্ট বক্স