নায়াগ্রা ফলস প্রকৃতির এক অপার সৃষ্টি। জলপ্রপাতটি বিস্ময় আর রোমাঞ্চে এক অপরূপ সৌন্দর্য ভান্ডার। নায়াগ্রা শব্দের অর্থ ‘গর্জে ওঠা জল’। এই নামের যথার্থতা কাছে গেলেই বোঝা যায়। প্রবল গর্জনে জলধারা অবাধে নেমে আসছে। জলপ্রপাতের শব্দ যেন এক মোহনীয় সংগীত সৃষ্টি করেছে। এটি প্রকৃতির এক মহাবিস্ময়, যা সব প্রকৃতিপিপাসী পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। প্রতিবছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন পর্যটক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন এই জলপ্রপাতটি দেখতে। এখন ভ্রমণের সময়, আর কি ঘরে থাকা যায়! তাই তো বাক্সপেটরা গুছিয়ে ছুটে যাই নায়াগ্রা ফলসের উদ্দেশে।
খুব ভোরে উঠেই গ্রেহাউন্ডের বাসে চেপে যাত্রা শুরু করি নায়াগ্রার পথে। আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু পথ বেয়ে আলবেনি, বিংহাম্পটন, সেরাকুইস এবং আরও কিছু ছোট শহর পার হয়ে বাস এসে থামে বাফেলো বাস টার্মিনালে। বাফেলোতে নেমেই মনে পড়ল বব মার্লের সেই বিখ্যাত গান : ‘বাফেলো সোলজার ইন দ্য হার্ট অব আমেরিকা’। বাফেলো বাসস্টেশন থেকে উবার নিয়ে চলে আসি নায়াগ্রা সিটিতে অবস্থিত মোটেল নিউ রেড কার্পেট ইনে। বাঙালি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই হোটেলের ম্যানেজার শাওন ভাই আমাদের স্বাগত জানালেন। সুপরিসর এই মোটেলটি বেশ ছিমছাম এবং গুছানো। এখন ট্যুরিস্ট সিজন, এরপর উইক এন্ড হওয়ায় কোনো হোটেলের রুমই পাচ্ছিলাম না। অনলাইনে সব চেক করে দেশি ভাইদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মোটেলেই উঠলাম। এরপর মোটেলে একটু বিশ্রাম নিয়েই ছুটলাম নায়াগ্রা স্টেট পার্ক ও ফলসের উদ্দেশে, পথে একটু ঝটিকা সফর করলাম নায়াগ্রা ফলস সিটিতে।
ছবির মতো সুন্দর এই ছোট শহরটিতে বাঙালিদের জয়জয়কার দেখে বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছি। একসময় লিটল ইতালিয়া খ্যাত এই শহরটি এখন পুরোদস্তুর লিটল বাংলাদেশ। পথে পড়ল বাংলাদেশি জাতীয় পতাকায় অঙ্কিত একটি ভবন, যা আমার দৃষ্টিতে আটকালো এবং ক্যামেরায় বন্দী হলো। পথে আরও পড়ল ত্রিপল সেভেন ফুডবাজার নামে সুপরিসর গ্রোসারি ও রেস্টুরেন্ট। বাঙালি রেস্টুরেন্টে যাব আর শিঙাড়া-সমুচা খাব না, তা কি হয়? পথে পড়ল হালাল বাইটস নামের আরও একটি রেস্টুরেন্ট। নায়াগ্রা ফলসে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ে বাংলাদেশিরা বেশ এগিয়ে। বেশ কিছু বাঙালি রিয়েল এস্টেট এজেন্টের সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। অনেক বাংলাদেশিই এয়ার বিএনবি করে ভাড়া দিচ্ছেন। কথা হলো এখানকার ব্যবসায়ী বাংলাদেশি মিজানুর রহমানের সঙ্গে। নায়াগ্রা ফলসের পাইওনিয়ার এই বাঙালি জানালেন কয়েক বছর আগেও নায়াগ্রা ফলসে এত বাঙালি দেখা যেত না। এখন প্রতিটি ব্লকেই বাঙালি বাড়ি দেখা যায়। আর বাঙালি যেখানেই যায়, সেখানেই তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে যায়। কোনটি বাঙালি বাড়ি, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। বাড়ির আঙিনায় ঝুলছে কচি লাউ, ফুটেছে দুধসাদা লাউফুল, কুমড়ো ফুল, শিমের লতা। ১৮ নম্বর স্ট্রিটে চোখে পড়ল বাঙালি সুপরিসর মসজিদ মুসলিম সেন্টার আর নায়াগ্রা ফলস। এই শহরে আরও আছে বাঙালি মালিকানাধীন ওয়ানস্টপ শপিংমল। যারা নায়াগ্রা ফলস দেখতে আসবেন, তারা ছবির মতো সুন্দর ছোট এই শহরটিও ঘুরে যাবেন আর বাংলাদেশ থেকে এত দূরে এসেও বাঙালিদের জয়জয়কার দেখে গর্বিত হবেন।
নায়াগ্রা সিটি ঘুরে আমরা এসে থামলাম নায়াগ্রা ফলস স্টেট পার্কে। নায়াগ্রা ফলসের সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। যতই একে দেখি, ততই যেন ভালো লাগে। বারবার দেখেও যেন মন ভরে না। নায়াগ্রা পার্কের বেঞ্চে হাত-পা ছড়িয়ে বসে রিলাক্স মুডে নীল খোলা আকাশ দেখে আর সজীব বাতাস গায়ে মেখে জলপ্রপাতের নান্দনিক দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার চোখে আনন্দাশ্রু এসে যায়। আমি অশ্রুসজল নয়নে সৃষ্টিকর্তার এই অপূর্ব সৃষ্টির মনোলোভা দৃশ্য প্রাণভরে উপভোগ করি। নায়াগ্রা ফলসের দিনের বেলার ডিউ একরকম সুন্দর, রাতের ভিউ আরেক ধরনের সুন্দর। রাতের বেলা নায়াগ্রা ফলসের লাইটিং এবং ফায়ার ওয়াক্স উপভোগ করে ফলস-সংলগ্ন গিফট স্টোর থেকে কিছু গিফট আইটেম কিনে রাতের খাবার সেরে আবার মোটেলে ফিরে যাই।
নায়াগ্রা ফলসে এসেছি আর জলপ্রপাতের পানিতে ভিজব না, তা কি হয়? তাই তো খুব কাছ থেকে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য অবলোকন করতে জলপ্রপাতের বৃষ্টিতে ভিজতে পরের দিন সকালেই নায়াগ্রা ফলসের মেইড অব মিস্ট রাইডে উঠি। যারা নায়াগ্রা ফলস ঘুরে আসবেন, তারা অবশ্যই এই জার্নিটি উপভোগ করবেন। জনপ্রতি ৩০ ডলার করে ভাড়া। ইচ্ছে করলে অনলাইনেও টিকিট কাটতে পারেন, শিপে ওঠার আগে প্রত্যেকের হাতে রেইনকোট দেওয়া হয়। আমেরিকার অংশে যারা তারা পরেন ব্লু রেইনকোট আর কানাডার যারা তারা পরেন রেড রেইনকোট। দুটি দেশের দুই পতাকাবাহী জাহাজ পাশাপাশি এগিয়ে চলে জলপ্রপাতের দিকে।
জলপ্রপাতের কাছে যেতেই ঘন কুয়াশা, জলতরঙ্গের দোলা আর অদ্ভুত ঠান্ডা শীতল পানির পরশ। রেইনকোট ভিজে যায়, সহযাত্রীরা কেউ উল্লাসধ্বনি দেয়, কেউবা মনোলোভা দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দী করেন, কেউ ভিডিওতে ধারণ করেন। আমি রেইনকোট খুলে জলপ্রপাতের বৃষ্টির জলে নিজেকে ভেজাই। এ যেন সব শ্রান্তি-ক্লান্তি ভুলে নতুন প্রাণের পরশ।
শিপ জার্নি শেষে আবার এসে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কোল ঘেঁষে পার্কের বড় বড় পাথরের ওপর অলস ভঙ্গিতে গা এলিয়ে দিয়ে নায়াগ্রা ফলসের চোখজুড়ানো মনভুলানো দৃশ্য দেখে ফলস-সংলগ্ন রেস্টুরেন্টে নানা দেশি ভোজন সেরে আবারও মোটেলে ফিরি। ঠিক সাতটায় নিউইয়র্কে ফেরার লক্ষ্যে বাঁকানো বাস টার্মিনালের উদ্দেশে উবারে উঠি। উবারের ড্রাইভারকে বেশ সজ্জন এবং শিক্ষিত মনে হলো। পাকিস্তানি এই ভাইটি একজন গাইডের মতো আমাদের পথের অনেক দৃশ্য দেখালেন এবং বর্ণনা করলেন। এ-ও বললেন, বাঙালিদের আগমন এই শহরে যদিও বেশি দিন হয়নি কিন্তু বাঙালিদের উত্থান চোখে পড়ার মতো।
কথায় বলে-ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমাদের সাউথ এশিয়ানদের অবস্থাও সেই রকম। একসাথে হলেই রাজনীতির বিষয় উঠে আসে। পাকিস্তানি এই উবার চালকের বাংলাদেশ নিয়ে রয়েছে বেশ আগ্রহ। বাংলাদেশ-পাকিস্তান একসময় ভাই ভাই ছিল। পাকিস্তানিরা যে বাংলাদেশকে শোষণ করেছে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন, সেই সময়কার জেনারেলদের ওপর যথেষ্ট ক্ষোভও ঝাড়লেন। রাজনীতিবিদ ইমরান খানের ভক্ত এই পাকিস্তানি কথায় কথায় বহুবার শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দেখে মনে হলো-এমনটাই তো হওয়া উচিত। শেখ মুজিবুর রহমান তো সর্বজনীন, ম্যুরাল ভাঙা কিংবা ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে দেওয়ায় কী আসে যায়? তার প্রতি সাধারণের ভালোবাসা একটুও কমবে না।
পাকিস্তানি উবার চালক ভাইয়ের রাজনৈতিক আলোচনা শেষ না হতেই গাড়ি চলে আসে বাফেলো বাসস্ট্যান্ডে। আবারও গ্রেহাউন্ডের বাসে চেপে নিউইয়র্ক শহরের পথে, সাথে নায়াগ্রা ফলসের মোহনীয় কিছু স্মৃতি। গুডবাই নায়াগ্রা ফলস। আবার হয়তো দেখা হবে জলপ্রপাতের মোহনীয় ধারা, হয়তো হাজারো ট্যুরিস্টের ভিড়ে কিংবা একাকী নিঃসঙ্গ।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক।