Thikana News
৩০ অগাস্ট ২০২৫
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

‘স্বাধীনতা বনাম স্বাধীনতা’

‘স্বাধীনতা বনাম স্বাধীনতা’
বর্তমান বিশ্বে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি খুবই আলোচিত, সমালোচিত, জিজ্ঞাসিত, প্রত্যাশিত, জল্পনা-কল্পনায় ভরপুর একটি দিল্লিকা লাড্ডু! খেলে যা, না খেলেও তা; কোথাও নিমতিতা, কোথাও রসগোল্লা! নারীরা বলে স্বাধীনতা নাই, স্ত্রীরা স্বাধীনতাবিহীন স্বামীর সংসারে বিমূঢ়-বিরক্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নাই- এমন বহু স্লোগান আমরা শুনছি দীর্ঘকাল। নাগরিকরা বলে স্বাধীনতা বিপন্ন। যে রাষ্ট্র ভিন দেশীদের দ্বারা শাসিত, সে রাষ্ট্রের নাগরিকরা বলে স্বাধীনতা চাই এবং স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন, সংগ্রাম, প্রাণঘাতী যুদ্ধ পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই চলে আসছে। যার ফলে কালের আবহণে প্রাণ দিতে হয়েছে শত-কোটি-সহস্র জনগোষ্ঠীকে। একটি খুন করলে হয় খুনি, হাজারো খুন করলে হয় মহাযোদ্ধা বা মহাবীর! কালের স্রোতে খলনায়ক হয়ে যায় মহানায়ক, আবার মহানায়ক পরিণত হয় খলনায়কে। মানবতার ধ্বংসকারীরাই বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক হিসেবে সমাদৃত।

মানুষ জন্মগ্রহণ করে একটি স্বাধীন স্বত্বা নিয়ে, ভাষাগত বিশ্লেষণে যা মৌলিক বা জন্মগত অধিকার হিসেবে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন Instrument-এ স্থান পেয়েছে। সত্য-মিথ্যার অবস্থান যাচাই করা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিথ্যারও মহত্ব আছে বলে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও স্বীকার করে নিতে হয়। কারণ হাজার-লাখো মানুষকে পাগল করে দিতে পারে মিথ্যার মোহ। স্রোতের টানে চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা। স্রোত, গুজব, প্রোপাগান্ডা একটি আরেকটির সম্পূরক। এটি শুরু হলে থামাবার কোন ফুসরত হয় না। গুজব ও প্রোপাগান্ডা অনেক সত্যকে মিথ্যায় এবং অনেক মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করেছে; যা খণ্ডনের জন্য উদ্যোগ নেয়ার ইতিহাস খুবই বিরল। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’- এ চিন্তা থেকে সত্য কথা বলার মানসিকতা অর্থাৎ স্রোতের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখা হয় না বললেই চলে। স্রোতের বিপরীতে চলার ঝুঁকি নেয়ার চেয়ে গা ভাসিয়ে চলাটাই যেনো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোটা দাগে মিথ্যার কাছে মানবজাতি আজ পরাজিত। 

মহামতি সক্রেটিস একটি নকল আপেল দিয়ে তার শিষ্যদের মধ্যে প্রমাণ করেছিলেন যে, মিথ্যা বারংবার বলতে বলতে তা এক সময় সত্যে পরিণত হয়। অনুরূপ মন্তব্য করেছেন হিটলারের প্রচার বিশেষজ্ঞ জোসেফ গোয়েবল্সও। 
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এক নদী রক্তের বিনিময়ে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে পেয়েছে একটি সংবিধান, যার ৩৯ অনুচ্ছেদে জনগণের বাক-স্বাধীনতার বিষয়ে নিশ্চিত করে উল্লেখ রয়েছে যে-

‘১। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।
২। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানী বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ-সাপেক্ষে-
ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং
খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
সাংবিধানে অনুরূপ নিশ্চয়তা প্রদান করা স্বত্বেও বাংলাদেশে মানুষের কি বাক-স্বাধীনতা  আছে? কেউ কি কারো সমালোচনা অর্থাৎ গঠনমূলক সমালোচনা নির্ভয়ে করতে পারেন? কারো কথা যদি কারো পছন্দ না হয়, বা তার গায়ে লাগে, তখনই শুরু হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া, শালীনতা নয়, বরং প্রতিবাদ হয় তির্যক ও অসাংবিধানিক ভাষায়। এ দেশে সমালোচনাকে যুক্তি দিয়ে খন্ডন করা হয় না। আপনি যদি ধর্মীয় অনুশাসনের পক্ষে কথা বলেন, তখন বলা হবে পাকিস্তানের দালাল, আবার স্বাধীনতার পক্ষে কথা বললে বলবে  ভারতের দালাল! বক্তৃতার মঞ্চে মাইক হাতে পেলে অনেক দ্বায়িত্ববান নেতাই দ্বায়িত্ব নিয়ে কথা বলেন না, বরং মাইকের মাউথকে কেউ কেউ একটি Blank Cheque মনে করে কথা বলার কোন প্রকার সীমারেখা রাখেন না; যা খুশি তা বলে থাকেন। এজন্য অনেককে অনেক সময় জাতির সামনে হাতজোড় করে ক্ষমাও চাইতে হয়েছে।
বিবেক দিয়ে কথা না বলে উপরন্তু কাউকে খুশি করার জন্য মানুষ বিবেকবর্জিত কথা বলে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হীন উদ্দেশ্যে। পদ-পদবী ও লোভনীয় কিছু পাওয়ার জন্য এ দেশে ‘যোগ্যতার’ চেয়ে ‘তেলবাজি’ ও ‘তোষামোদীই’ বেশি প্রাধান্য পায়। বিবেকসম্পন্ন কথা অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে জনসমর্থন পেলেও বক্তার নিজের জন্য হয় বুমেরাং। হক কথা বা বিবেকসম্পন্ন কথা বা আচরণ বিবেকসম্পন্নরা অবচেতন মনে সমর্থন করলেও প্রকাশ্যে কেউই মুখ খোলে না। শক্তিমান মানুষেরা দূর্বলের সমালোচনাকে অনধিকার চর্চা মনে করে। কারণ আমাদের দেশের মানুষ এখনো ‘জোর যার মুল্লুক তার’ (Might is Right) সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। দেশের প্রচলিত আইন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং দখলদারীত্বের পক্ষে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মানসিক দাসত্ব করে অনেক অযোগ্য লোক রাজনৈতিক দলে বা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে। বিবেকের মৃত্যু হলেই ‘মানসিক দাসত্বের’ জন্ম হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় যে, বিবেকের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে অনেক মানুষ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও মানসিক প্রশান্তি ছাড়াও পেয়েছে জনগণের ভক্তি ও শ্রদ্ধা; যা কোথাও প্রকাশিত, বা কোথাও অপ্রকাশিত।
অভাব থেকে মানসিক দাসত্বের বীজ রোপণ হলেও অংকুরিত হয় অতিদ্রুত অধিক প্রাপ্তির বাসনা থেকে।  একটি কঠিন প্রবাদ রয়েছে যে, ‘King cannot do wrong’, অর্থাৎ রাজা বা শাসনকর্তা কোনো ভুল করতে পারেন না। মূলত এটাই স্বীকৃত যে, শাসনকর্তা বা নেতা ভুল করলেও সেই ভুল ধরা যাবে না। ণবং ইড়ংং বলে সব অন্যায় বা ভুল সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিতে হবে। প্রতিবাদ করলেই ঝরুব, অর্থাৎ বহিস্কার থেকে শুরু করে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হতে পারে! কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড জৈবিক না হয়ে মানসিকও হয়ে থাকে। 
অন্যদিকে শাসনকর্তা বা নেতা সকালের কথা বিকেলে বদলাবেÑ তাতে ভুল বা আলোচনা-সমালোচনা করার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ২০০৮-এর কথা ২০১৪-তে ঠিক থাকেনি, ২০১৪-এর সিদ্ধান্ত  ২০১৮-তে ঠিক থাকেনি, আবার ২০১৮-এর কথা ২০২৪-এ গিয়ে উল্টে গেছে। একেই বলে ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই’। কিন্তু  এ যুক্তি শুধু নেতাদের জন্য প্রযোজ্য, তৃণমূলের কর্মীদের জন্য নয়। ফলে এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, রাজনৈতিক দল ‘বাক-স্বাধীনতার’ জন্য সংগ্রাম করে, কিন্তু সেখানেও কর্মীদের বাক-স্বাধীনতা নেই। একজন কর্মী ৫ মিনিট বক্তৃতা করার সুযোগ পেলে তিন মিনিট করতে হবে নিজ দলীয় নেতার গুণকীর্তণ। অন্যদিকে বাকি দুই মিনিট গাইতে হবে প্রতিপক্ষ নেতার গ্লানি ও বিষোদগার! পার্লামেন্টারি আলোচনাতে দেশ ও জাতির ভাগ্যোন্নয়নের চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়ার পরিবর্তে বেশি হয়েছে প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদাগার।
হালে মিথ্যা বলা যেখানে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে সত্যের পূজা করার সুযোগ কোথায়? সত্যের সাথে মিথ্যার সংযুক্তি ছাড়া বাদী মামলা করতে পারে না। বিবাদী ও স্বাক্ষীরা অনবরত মিথ্যার পরে মিথ্যা বলে বিধায় সঠিক বিচার পাওয়া দূরূহ ব্যাপার। রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেরাই মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত  করে। 
আওয়ামী সরকার আমলে ছিল কাল্পনিক গায়েবী মোকদ্দমা, ড. ইউনূস সরকার আমলে শুরু হয়েছে ‘মামলা বাণিজ্য’। মামলা রুজু করতে টাকা, নাম কাটাতে টাকা, যেনো টাকার মহোৎসব! 
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামী করায় দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে দেরি হচ্ছে। ফলে প্রতীয়মান হচ্ছে যে- মামলা বাণিজ্যই ‘জুলাই-  ৩৬’ সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। মিথ্যার কাছে  এভাবেই পর্যুদস্ত হচ্ছে ‘জুলাই ৩৬’-এর চেতনা।  
স্বাধীনতা কি? স্বাধীনতার সংজ্ঞা কী হওয়া বাঞ্ছনীয়? অন্ধের হাতি দেখার মতো ‘স্বাধীনতাকে’ দেখলে হবে না। আবার ‘অবাধ স্বাধীনতাও’ কিন্তু স্বাধীনতার সংজ্ঞায় পরে না। ক্ষমতাবানরা স্বাধীনতা বলতে অবাধ স্বাধীনতা, অর্থাৎ সীমাহীন স্বাধীনতা বলে মনে করেন! সব কিছুরই Limitation আছে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা ছাড়া। তাই আইনের ক্ষমতা সীমাহীন বলে মনে করার কারণ নেই। Limitation Act, 1908  প্রণয়ন করে আইনের ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধতায় আনা হয়েছে। অবাধ স্বাধীনতা হলো স্বেচ্ছাচারিতা বা উশৃঙ্খলতা। Excess of any thing is very bad- ইংরেজি প্রবাদবাক্যই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। 
সুফি সাধক জালালউদ্দিন রুমী বলেছেন, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত  যা কিছু, তাহাই বিষ’। ‘পরিমিত স্বাধীনতা’ প্রাপ্তি ও ভোগ করলেই স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন হয় না। বরং দ্বায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে স্বাধীনতার চেতনা পরিস্ফূটিত হয়। 
‘স্বাধীনতা’ আজ তাই প্রশ্নবিদ্ধ। মানসিক দাসত্বের কারাগারে ‘স্বাধীনতা’ আজ বন্দি। হুজুগে নয়, বরং একটি বিবেকসম্পন্ন জাতিই ‘স্বাধীনতার’ চেতনায় প্রাণ সঞ্চার করতে পারে, মুক্তি দিতে পারে মানসিক ‘দাসত্ব’ থেকে।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট।
 

কমেন্ট বক্স