বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

মানবতায় ফিরুক সমাজ, ফিরে আসুক শান্তি

মানবতায় ফিরুক সমাজ, ফিরে আসুক শান্তি

বিজ্ঞাপন
আজকাল খবরের কাগজে কিংবা টেলিভিশনের সংবাদে চোখ রাখলেই মনটা ভারী হয়ে ওঠে। খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, জমি দখল—মনে হয় যেন এসব ঘটনা সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মনে প্রশ্ন জাগে, দেশে কি শুধু অপরাধের সংখ্যাই বাড়তে থাকবে? সমাজে শান্তি কিংবা আইনের শাসন কবে আসবে? সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে এবং ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ওই সংসদ সদস্যের সঙ্গে মরিয়মের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী দাবি করেছিলেন, মরিয়মকে তিনি ইসলামি রীতিতে বিয়ে করেছেন। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বিয়ে হয়ে থাকলে সেই সম্পর্কের পরিণতি এমন মর্মান্তিক হলো কেন? মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী এবং আরও একজনকে আসামি করে মামলা করেছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং এর সত্যতা ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করবে আইন ও আদালত।

নির্বাচনের আগে আমরা অনেক প্রার্থীর মুখেই শুনি—নির্বাচিত হলে তাঁরা জনগণের শাসক নয়, সেবক হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক জনপ্রতিনিধির আচরণ ও কর্মকাণ্ড যখন জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—একজন বয়স্ক পুরুষ ও একজন অল্পবয়সী নারীর মধ্যে এমন সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো এবং সেখানে ক্ষমতা, বয়স ও সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য কী ভূমিকা রেখেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতা, আইন এবং মানবিকতার দিকটিও বিবেচনা করতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী নিজেদের একটি ইসলামি দল হিসেবে পরিচয় দেয়। তাই তাদের কোনো নেতার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে দলটির আদর্শ ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে পুরো দলের ওপর প্রয়োগ করার আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনার সত্যতা ও আইনগত অবস্থান পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। মরিয়মের ঘটনা একদিকে যেমন আমাদের নাড়া দিয়েছে, অন্যদিকে প্রতিদিনই আমরা একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ শুনছি। কোথাও নারী নির্যাতনের পর মৃত্যু, কোথাও শিশু হত্যা, কোথাও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোরের হাতে কিশোর খুন। কখনো একটি মোবাইল ফোন ছিনতাইকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি, কখনো সামান্য টাকা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে মানুষ খুন হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হয়, মানুষের জীবনের মূল্য যেন এতটাই কমে গেছে যে তুচ্ছ কারণেও একটি জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অনেকে এসব ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিংবা সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কথা বলবেন। সেই প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার প্রশ্ন আরও গভীরে। আমরা যদি মানবিকতা ও মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলি, তাহলে শুধু পুলিশ দিয়ে কত দিন একটি দেশ চালানো সম্ভব? পুলিশ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে, মামলা করতে পারে। আদালত অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিও দিতে পারে। কিন্তু মানুষের ভেতরে যদি মানবিকতা ও নৈতিকতার বোধ জাগ্রত না হয়, তাহলে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব?
একটি শিশু কীভাবে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে? একজন কিশোর কেন সহিংসতাকে পথ হিসেবে বেছে নেয়? কেন মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য হারিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের ঘরের দিকেও তাকাতে হবে। আজকের অনেক অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে শুধু পরীক্ষার ফল, ভালো স্কুল, কোচিং, গান-বাজনা, ক্রিকেট কিংবা ছবি আঁকাকে বোঝেন। সন্তানকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করার বদলে আমরা অনেক সময় তাকে শুধু প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করি। তার হাতে তুলে দিই দামি মোবাইল ফোন, বাড়িয়ে দিই হাতখরচ, পূরণ করি একের পর এক চাহিদা। কিন্তু আমরা কি তাকে শেখাতে পারছি অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে? নিজের চেয়ে দুর্বল কাউকে সম্মান করতে? রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে? ভিন্নমতকে সহ্য করতে? মানুষের জীবন যে অর্থ-সম্পদ কিংবা যেকোনো বস্তুগত অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান—এই সহজ কথাটি কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শেখাতে পারছি আমাদের সন্তানদের?

দেশে এখন বিচারহীনতার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভোগের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। নতুন গাড়ি, দামি ফোন, বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল জীবন—সবকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যখন সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন বৈধ ও অবৈধ আয়ের সীমারেখাও অনেকের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা আছে, কিন্তু নাগরিক সচেতনতা কি ততটা আছে? সংসদে কী হচ্ছে, কে ক্ষমতায় যাচ্ছে, কোন দলের কী বক্তব্য—এসব নিয়ে আমরা উত্তেজিত হই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক করি। কিন্তু পাশের মহল্লার কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে, কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে কিংবা কোনো পরিবার সহিংসতার শিকার হলে আমরা কতটা এগিয়ে আসি? রাষ্ট্রের কাছে যেমন জবাবদিহি চাই, তেমনি সমাজের প্রতিও কি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?

আমাদের দরকার এমন একটি সামাজিক আন্দোলন; যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা, কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ, পারিবারিক মূল্যবোধ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখা হবে। স্কুলে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, সহমর্মিতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও নাগরিক দায়িত্বও শেখাতে হবে। পরিবারে শুধু সন্তানকে সফল করার চেষ্টা নয়, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। সমাজে শুধু ধনী বা ক্ষমতাবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, সৎ থাকার ইচ্ছাটাও ফিরিয়ে আনতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ শুধু পুলিশের উপস্থিতি দিয়ে তৈরি হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবে, আদালত বিচার করবে, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে—এগুলো রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। কিন্তু এর পাশাপাশি পরিবারকে মূল্যবোধ শেখাতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে এবং সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু অপরাধী ধরার নয়, অপরাধপ্রবণতার সামাজিক ও নৈতিক কারণগুলোও চিহ্নিত করা। তবেই সমাজে ফিরে আসতে পারে সততা, আইনের শাসন, পরমতসহিষ্ণুতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা। আর তখনই হয়তো আমরা বলতে পারব শান্তি শুধু পুলিশের হাতে নয়; শান্তির শুরু আমাদের প্রত্যেকের ভেতর থেকে।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউইয়র্ক।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz