সুরে, নৃত্যে, কথায় : অনুভবের সন্ধ্যা বিপার মঞ্চে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতির যাত্রা
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯
•
অনলাইন সংস্করণ
আবীর আলমগীর: বাইরে তখন বৃষ্টি। অক্টোবরের বৃষ্টি ভেজা নিউইয়র্কের সন্ধ্যায় শহরের চেনা ব্যস্ততায় যেন একটু অন্য রকম আবহ। আর জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের ভেতরে সেই বৃষ্টির ছন্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল কবিতার শব্দ, গানের সুর আর নৃত্যের ঝংকার। বাইরে প্রকৃতির আপন আয়োজন, ভেতরে শিল্পের। সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি যেন শুরু থেকেই তৈরি করেছিল অনুভবের এক অন্য জগৎ।
কবিতার শব্দে মন খুঁজে পায় তার আপন ভাষা, সংগীতের সুরে হৃদয় ছুঁয়ে যায় এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি, আর নৃত্যের ছন্দে প্রাণ ফিরে পায় জীবনের সহজ আনন্দ। এমনই এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস, বিপা আয়োজন করেছিল সুরে, নৃত্যে, কথায়—অনুভবের সন্ধ্যা।
গত ৪ অক্টোবর রোববার জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির শিকড় আর নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের এক মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের আকর্ষণ ছিল আবৃত্তিশিল্পী তাহরিনা পারভীন প্রীতির একক পরিবেশনা হৃদয়-গহন দ্বারে যে কবিতা কড়া নাড়ে। বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি শিরোনামের এই নিবেদনে কবিতা ও গদ্যের মধ্য দিয়ে উঠে আসে শৈশব, দেশ, সম্পর্ক, ভালোবাসা, নারী এবং সমাজের নানা অনুভব। আর মায়ের আবৃত্তির ফাঁকে ফাঁকে প্রাসঙ্গিক গান পরিবেশন করেন তাঁর একমাত্র কন্যা তাহিয়াত অধরা। ফলে পরিবেশনাটি কেবল একক আবৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল মা ও মেয়ের দুই প্রজন্মের এক শিল্পিত কথোপকথন।
প্রীতির আবৃত্তিতে ছিল পরিমিত আবেগ, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং কবিতার ভাবকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিকতা। শৈশবের স্মৃতি থেকে দেশ, সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা নারীর আত্মমর্যাদা, বিষয় বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের অভিব্যক্তিতেও এসেছে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। দীর্ঘ একক পরিবেশনায় দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়, তবে প্রীতি তাঁর স্বাভাবিক বাচনভঙ্গি ও আবেগের পরিমিত ব্যবহারে সেই কাজটি বেশ সুন্দরভাবেই করেছেন। আর তাহিয়াত অধরার গান মা ও মেয়ের পরিবেশনাটিতে যোগ করেছে ভিন্ন এক আবহ।
প্রীতির আবৃত্তির শুরু হয় শৈশবের স্মৃতি দিয়ে। প্রচলিত ঘুমপাড়ানি ছড়া থেকে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের প্রভাত বর্ণন ও আমার পণ, কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাতী ও খোকার সাধ, বন্দে আলী মিয়ার আমাদের গ্রাম, পরিচিত ওপেনটি বায়োস্কোপ ছড়া এবং বেগম সুফিয়া কামালের পল্লী স্মৃতি একে একে শ্রোতাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা শৈশবের উঠোনে। এরপর আবৃত্তির বিষয় প্রবেশ করে দেশ ও জন্মভূমির অনুভবে। অতুলপ্রসাদ সেনের বাংলা ভাষা, জীবনানন্দ দাশের রচনা, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ছবি, তসলিমা নাসরিনের নির্বাচিত কলাম, শহীদ কাদরীর হন্তারকদের প্রতি এবং হুমায়ুন আজাদের আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলামসহ বিভিন্ন রচনায় উঠে আসে দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি দেশ ও সমাজকে প্রশ্ন করার ভাষাও। এর সঙ্গে আমি বাংলায় গান গাই ও ও আমার দেশের মাটির মতো গান যোগ করে ভিন্ন এক আবেগ।
সম্পর্কের ভেলায় চড়ে পর্বে শামসুর রাহমানের কখনো আমার মাকে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সম্পর্ক এবং হুমায়ুন আজাদের ফুলের গন্ধর সঙ্গে আয় খুকু আয় ও যদি বন্ধু হও, যদি বাড়াও হাত গানগুলো আবৃত্তির আবহকে আরও ব্যক্তিগত ও আবেগময় করে তোলে। ভালোবাসার পর্বে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চাউনি, সৈয়দ শামসুল হকের পরাণের গহীন ভিতর এবং তারাপদ রায়ের এই বা মন্দ কি। সঙ্গে তাহিয়াত অধরার কণ্ঠে প্রাসঙ্গিক গান কবিতা ও সংগীতের মধ্যে তৈরি করে সুন্দর এক সেতুবন্ধন। একক পরিবেশনার শেষ ভাগ নারী, তুমি জেগে ওঠো ছিল তুলনামূলকভাবে তীক্ষ্ণ ও সমাজসচেতন। বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম, মল্লিকা সেনগুপ্ত, তসলিমা নাসরিন ও হুমায়ুন আজাদের রচনার মধ্য দিয়ে নারীর অবস্থান, স্বাধীনতা, প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন উঠে আসে। আবৃত্তির এই আয়োজনের প্রণোদনায় ছিলেন বিপ্লব বালা এবং গ্রন্থনা ও সার্বিক পরিকল্পনায় ছিলেন মেহেদী হাসান।
নতুন প্রজন্মের হাতে নৃত্যের আলো: অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিপার নৃত্য বিভাগের নবীন শিক্ষকদের পরিবেশনা আলোর পথে স্বপ্নের যাত্রা। এই পর্বের বিশেষত্ব ছিল, যাঁদের অনেকেই একসময় বিপায় শিশু শিক্ষার্থী হিসেবে পথচলা শুরু করেছিলেন, তাঁরাই এখন শিক্ষক ও শিল্পী হিসেবে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন বাংলা সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। নাদিয়া ইসলাম দৃষ্টি, জগন্নাথ লাইরেনজাম, জারিন মাইশা, সাইদা জ্যোতি, মাহিমা আলী খান, নাহরীন ইসলাম, জলি মণি লাইরেনজাম এবং রাইসা জেরিনের অংশগ্রহণে পাঁচটি নৃত্য পরিবেশিত হয়।
জগৎজুড়ে উদার সুরে আনন্দগান বাজে দিয়ে শুরু হয় নৃত্যের এই যাত্রা। চারপাশের সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও আনন্দকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করার ভাবনাকে কেন্দ্র করে নৃত্যটি কোরিওগ্রাফি করেন এ্যানি ফেরদৌস। এরপর রহস্যময়ী কন্যায় উঠে আসে এক নীরব, রহস্যময় ও অশ্রুসিক্ত নারীর অন্তর্জগতের আকুলতা। এই পরিবেশনাটিও কোরিওগ্রাফি করেন এ্যানি ফেরদৌস। তৃতীয় পরিবেশনায় ছিল মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য খাম্বা থোইবি জাগোই। মৈতেই সংস্কৃতির প্রাচীন মৈরাং লোকগাথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নৃত্য দর্শকদের সামনে মণিপুরী নৃত্যঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র ধারা তুলে ধরে।চলে যেও না পরিবেশনাটি নির্মিত হয় বিচ্ছেদের বেদনা, হারিয়ে যাওয়ার ভয় এবং একে অন্যকে ফিরে পাওয়ার আকুলতা ঘিরে। কথক আঙ্গিকের এই নৃত্যের কোরিওগ্রাফি করেন এস এম হাসান ইশতিয়াক ইমরান।
নৃত্যপর্বের সমাপ্তি ঘটে জার্নি অব ড্রিমস টুওয়ার্ড দ্য লাইট বা আলোর পথে স্বপ্নের যাত্রা দিয়ে। শিকড় থেকে শুরু করে স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া, অন্ধকারের মধ্যেও আলো খোঁজা এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সামনে চলার বার্তাই ছিল এই পরিবেশনার মূল কথা। এ্যানি ফেরদৌসের কোরিওগ্রাফিতে পরিবেশনাটি যেন পুরো আয়োজনের মূল দর্শনকেই ধারণ করে, ‘শিকড়ে যার শুরু, স্বপ্নে যার ডানা, আলোর পথে তারই যাত্রা।’
শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক: এই আয়োজনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল বিপার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার ধারাবাহিকতা। নাদিয়া ইসলাম দৃষ্টি ১৯৯৫ সালে বিপায় শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্ত হয়ে আজ প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড প্রেসিডেন্ট এবং শিক্ষক। নাহরীন ইসলাম ছয় বছর বয়স থেকে বিপার সঙ্গে যুক্ত থেকে এখন নতুন প্রজন্মকে নৃত্য শেখাচ্ছেন। রাইসা জেরিন তিন বছর বয়স থেকে বিপায় বাংলা, গান ও নৃত্যের সঙ্গে বেড়ে উঠে এখন শিক্ষক, বোর্ড সদস্য ও মিডিয়া টিমের সদস্য। একইভাবে জারিন মাইশা, সাইদা জ্যোতি ও মাহিমা আলী খানসহ নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের পেশাগত জীবনের পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে জগন্নাথ লাইরেনজাম ও জলি মণি লাইরেনজামের মাধ্যমে বিপার শিক্ষার্থীরা পরিচিত হচ্ছে মণিপুরী নৃত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গেও। সুরের এই ঝর ঝর ঝর্ণা: বিরতির পর বিপার নবীন সংগীত শিক্ষকদের নিয়ে শুরু হয় সংগীতপর্ব সুরের এই ঝর ঝর ঝর্ণা। এতে অংশ নেন কাজী মাহমুদুল হক, ফাবিহা নিসা, আলভান চৌধুরী ও প্রীতিজা পারমিতাসহ বিপার নবীন সংগীতশিক্ষকেরা। বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেন তবলায় পিনাক পানি গোস্বামী, কীবোর্ডে রবিউল হাসান, গিটারে অভিজিৎ চক্রবর্তী, অক্টোপ্যাডে সাত্তার মাহমুদ, মন্দিরায় শহীদ উদ্দীন এবং হারমোনিয়ামে লিমন চৌধুরী। সংগীতপর্বের প্রশিক্ষক ও পরিচালক ছিলেন সেলিমা আশরাফ।
অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সাবিনা শারমিন নীহার। তাহরিনা পারভীন প্রীতির একক পরিবেশনায় সংগীত সহযোগিতায় তাহিয়াত অধরার পাশাপাশি কীবোর্ডে ছিলেন মো. রবিউল হাসান, মন্দিরায় শহীদ উদ্দীন এবং হারমোনিয়ামে খ্রিস্টিনা লিপি রোজারিও। সাউন্ডে সুমন সিংহ, সহযোগিতায় শ্যামল সিংহ এবং স্লাইড প্রজেকশনে ছিলেন সৈয়দ মাহাদিন রহমান। ভিডিওগ্রাফিতে সাঈদ রেহান ইমন এবং ফটোগ্রাফিতে ছিলেন মিনহাজ আহমেদ। অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন নিলোফার জাহান এবং এ্যানি ফেরদৌস। বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয় সৈয়দ রিয়াজুল আকবরকে।
সুরে, নৃত্যে, কথায়, অনুভবের সন্ধ্যাকে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে হয়তো এর পুরো অর্থটি ধরা পড়ে না। এর ভেতরে ছিল প্রবাসে জন্ম নেওয়া কিংবা বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মকে নিজের ভাষা, গান, কবিতা ও নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার দীর্ঘ প্রচেষ্টার গল্প। একসময় যারা বিপার ছোট্ট শিক্ষার্থী হয়ে নাচ, গান কিংবা বাংলা শিখতে এসেছিল, তাদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী। কেউ ব্যাংকিংয়ে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ ফাইন্যান্সে, কেউ সমাজসেবায় কাজ করছেন। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা আবার ফিরে আসছেন সেই একই প্রতিষ্ঠানে, এবার শিক্ষক হয়ে। নিজেদের শেখা সংস্কৃতিটুকু তুলে দিচ্ছেন পরের প্রজন্মের হাতে। সম্ভবত এখানেই বিপার এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। প্রবাসে সংস্কৃতি শুধু মঞ্চে একটি গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি করা কিংবা নাচ পরিবেশনের নাম নয়। সংস্কৃতি টিকে থাকে তখনই, যখন একটি প্রজন্ম তার শিকড়ের গল্পটি পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়। রোববারের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের মঞ্চে সেই গল্পটিই যেন নতুন করে লেখা হলো। বাইরে তখনও হয়তো বৃষ্টির শব্দ, আর ভেতরে কবিতার শব্দ, গানের সুর আর নৃত্যের ছন্দে চলছিল শিকড় থেকে আগামী প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়ার এক সাংস্কৃতিক যাত্রা।
‘শিকড়ে যার শুরু, স্বপ্নে যার ডানা, আলোর পথে তারই যাত্রা।’