যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার প্রায় সাড়ে তিন মাসের যুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। সেসব সম্পাদকীয়তে বারবার যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধ যে কোথাও কখনো শান্তি ও সভ্যতা রক্ষা করতে পারে না, বরং যুদ্ধ সব সময় শান্তি ও সভ্যতা ধ্বংস করে, বারবার সে কথা উচ্চারিত হয়েছে ঠিকানায় প্রকাশিত ওইসব সম্পাদকীয়তে। যুদ্ধের পক্ষে ঠিকানায় একটি বাক্যও রচিত হয়নি। ঠিকানা সব সময় যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তি ও সভ্যতার পক্ষে। প্রকৃত সুশীল, বুদ্ধিজীবী, লেখক সাংবাদিক সকলেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে।
আবার এ-ও এক কঠিন সত্য, যুদ্ধের বিপক্ষে গরিষ্ঠ মানুষের অবস্থান থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ হয়। যেহেতু অস্ত্র, গোলা-বারুদের কোনো বিবেক-বিবেচনা নেই, যুদ্ধবাজদেরও যুদ্ধ ছাড়া কাজ দেখা যায় না। সেই সব যুদ্ধে তাই লাখ লাখ মানুষের প্রাণ যায়। মানুষেরই শ্রম, মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে গড়ে তোলা সভ্যতা মানুষের হাতেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মানুষ মারা যায় অসহায়ভাবে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। ধনীরা পথে বসে যায়। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। সুরম্য অট্টালিকায় বাস করা মানুষেরাও খোলা আকাশের নিচে বাস করে। যারা যুদ্ধের এক দিন আগেও কত মানুষকে সাহায্য-সহায়তা দিয়েছে, তারাই সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়। কারও বাড়িয়ে দেওয়া এক টুকরো রুটি, এক আঁজলা পানি দিয়ে কোনোমতে জীবন রক্ষা করে। অনেক নারী বেঁচে থাকার জন্য তাদের যৌবন বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়।
আসলে যুদ্ধকে যুদ্ধবাজরা বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করে। সে কারণে বিশ্ববিবেক যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও যুদ্ধকে যারা বাণিজ্য মনে করে, তারা নানা ছুতোয় যুদ্ধ বাগিয়ে নিজেদের মনস্কামনা পূর্ণ করে। তবু মানুষের প্রার্থনা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে। নানা দোলাচলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। ইরানের তহবিল ছাড় দেওয়াসহ যুদ্ধের ক্ষতির জন্য এবং পুনর্বাসনে অর্থ সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি মিলেছে। তবে যুদ্ধের যে কাঁটা, তা দূর হয়নি। এই চুক্তিতে ইসরায়েল যুক্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করেনি। প্রতিদিন ইসরায়েলি বোমায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বড় বড় স্থাপনা, বসত করার জন্য সুরম্য অট্টালিকা ধসে পড়ছে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে।
তাই তো বিশ্বনেতারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে নতুন যুগের ইঙ্গিত বললেও তাদের সে আশাবাদ বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় থেকেই যায়। গত সপ্তাহেই (১৭ জুন সংখ্যা) ঠিকানার প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এই শিরোনামে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা/নতুন যুগের ইঙ্গিত বলছেন বিশ্বনেতারা’। খবরটিতে বলা হয়েছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ দিনের উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বনেতারা একে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।’
প্রকৃত অর্থেই মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া এই সমঝোতা চুক্তি যে চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নে সকল পক্ষ আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, তা এই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে যাবে, তা-ও বলা যাবে না। যেসব বিশ্বনেতা এই সমঝোতায় আশাবাদী হয়েছেন, ভবিষ্যতে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তাদের অন্যতম জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং যুক্তরাজ্যের সদ্য পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই সমঝোতা যে কূটনৈতিক চেষ্টার ফসল, তা সকলেই ব্যক্ত করেছেন। তারা সকলেই সমঝোতার দ্রুত এবং পূর্ণ বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য ইসরায়েল এই সমঝোতায় শরিক না হওয়ায় আশাবাদ যেমন আছে, তেমনি আছে উদ্বেগ ও সংশয়ও। বিশ্বনেতারা ‘নতুন যুগের ইঙ্গিত’ বলে যেভাবে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন, পাশাপাশি বিশ্ববাসী সকল উদ্বেগ ও সংশয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্বনেতাদের আশাবাদের সফল রূপায়ণ হোক-এই প্রার্থনা করি।