মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা, সন্ত্রাসবাদ এবং স্থানীয় আইনি জটিলতার কারণে সৌদি আরবে ভ্রমণের বিষয়ে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। গত ১২ অক্টোবর প্রকাশিত ভ্রমণ পরামর্শে সৌদি আরবের জন্য লেভেল-৩ সতর্কতা জারি করে ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবের কিছু এলাকায় ঝুঁকির মাত্রা বেশি। বিশেষ করে, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর আশপাশে অবস্থানকারীদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবে হামলার হুমকি দিয়েছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষও জনসাধারণের জন্য বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার দৃশ্য কিংবা হামলার স্থানের ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার ছবি তোলার কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ মার্কিন নাগরিকদের আটক করেছে বলেও সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরবে সন্ত্রাসী হামলা সামান্য পূর্বাভাসে কিংবা কোনো সতর্কতা ছাড়াই ঘটতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, ধর্মীয় স্থাপনা, শপিংমল, পরিবহনকেন্দ্র, সরকারি ভবন এবং বড় জনসমাগমস্থলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের ক্ষেত্রেও সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। সৌদি সরকার, দেশটির নেতা, নীতিমালা, ধর্মীয় বিষয় কিংবা জনজীবন নিয়ে কোনো পোস্ট, মন্তব্য, শেয়ার বা লাইককে কর্তৃপক্ষ আপত্তিকর মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক করা হতে পারে। এমনকি সৌদি আরবে প্রবেশের আগে অন্য দেশে অবস্থানকালে প্রকাশিত পোস্টের কারণেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে বলে সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে। সাইবার অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ৪৫ বছরের কারাদণ্ডের নজির থাকার কথাও জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
সৌদি আরবে অবস্থানরত কিছু মার্কিন নাগরিকের ওপর দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা বা ‘এক্সিট ব্যান’ আরোপ করা হয়েছে। অপরিশোধিত ঋণ, ভিসার মেয়াদ অতিক্রমের জরিমানা, শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ, ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা এবং পারিবারিক বিরোধের কারণে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা নিষ্পত্তি বা সাজা শেষ হওয়ার পরও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকতে পারে।
মার্কিন সরকারি কর্মীদের জন্যও কিছু এলাকায় ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের ইয়েমেন সীমান্তের ২০ মাইলের মধ্যে যাওয়ার অনুমতি নেই। কাতিফ, তায়েফ ও ইয়ানবু শহর এবং জিজান, আসির ও নাজরান প্রদেশের নির্দিষ্ট এলাকায় যেতে বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
সৌদি আরবে পর্যটনের জন্য ভিসা প্রয়োজন। উমরাহ পালনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ই-ভিসা, উমরাহ ভিসা অথবা ট্রানজিট ভিসার সুযোগ রয়েছে। তবে হজের জন্য নির্ধারিত ভিসা ও অনুমোদিত পারমিট নিতে হবে। ভ্রমণকারীদের পাসপোর্টে সৌদি আরবে পৌঁছানোর তারিখ থেকে অন্তত ছয় মাসের মেয়াদ থাকা প্রয়োজন। হজ ও উমরাহ-যাত্রীদের জন্য মেনিনগোকক্কাল টিকা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া কিছু ওষুধ বহনের জন্য আগাম অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। অ্যালকোহল, মারিজুয়ানা, ক্যানাবিস ও সিবিডি-জাতীয় পণ্য সৌদি আরবে নিষিদ্ধ। তাই ভ্রমণের আগে ভিসা, স্বাস্থ্যবিধি, ওষুধ বহন এবং অন্যান্য প্রবেশ-সংক্রান্ত নিয়ম যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থানরত নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্পভাবে দেশত্যাগের পরিকল্পনা রাখতে বলেছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা পর্যবেক্ষণ, ভ্রমণ নথি হালনাগাদ রাখা এবং ভ্রমণবিমায় জরুরি চিকিৎসা ও সরিয়ে নেওয়ার সুবিধা রয়েছে কি না, তা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকেরা জরুরি সহায়তার জন্য রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে যোগাযোগ করতে পারেন। দূতাবাসের টেলিফোন নম্বর +৯৬৬-১১-৮৩৫-৪০০০।
এর আগে ২২ জুলাই মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সতর্কবার্তায় সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং যাতায়াতে বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল।
নতুন নির্দেশনায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় আইন এবং প্রবেশ ও প্রস্থানের নিয়ম সম্পর্কে ভ্রমণের আগে বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, উমরাহসহ ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সৌদি আরবগামী যাত্রীদের যাত্রার আগে সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় অনুমতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।