ভূত-প্রেত, ডাইনি, কঙ্কাল আর বিচিত্র সব সাজসজ্জায় মেতে ওঠার দিন আসছে। আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে উদযাপিত হবে জনপ্রিয় হ্যালোইন উৎসব। দিনটিকে ঘিরে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাজানো, শিশুদের জন্য পোশাক ও চকলেট কেনা, বিশেষ পার্টি এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজনকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে উৎসবের আমেজ।
হ্যালোইন মূলত শিশু-কিশোরদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হলেও সময়ের সঙ্গে এটি সব বয়সী মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা চরিত্রের পোশাক পরে শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট সংগ্রহের জনপ্রিয় রীতি ‘ট্রিক অর ট্রিট’ থাকবে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি কুমড়া কেটে মুখের আকৃতি তৈরি, বাড়ির সামনে কৃত্রিম কঙ্কাল ও মাকড়সার জাল দিয়ে সাজানো এবং ভৌতিক পরিবেশ তৈরির আয়োজনও চলছে।
নিউইয়র্কে হ্যালোইনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ম্যানহাটনের ঐতিহ্যবাহী ‘ভিলেজ হ্যালোইন প্যারেড’। এবারের ৫৩তম বার্ষিক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে ৩১ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৭টায়। গ্রিনিচ ভিলেজের সিক্সথ অ্যাভিনিউ দিয়ে আয়োজিত এই শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন বিচিত্র পোশাক পরিহিত হাজারো মানুষ। বিশাল আকারের পাপেট, সংগীত, নৃত্য ও সৃজনশীল সাজসজ্জা থাকবে আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ। এবারের প্যারেডের প্রতিপাদ্য ‘বডি অ্যান্ড সোল’।
আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, দর্শনার্থীরা বিনামূল্যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রা উপভোগ করতে পারবেন। আর বিশেষ পোশাক পরে আগ্রহীরা সরাসরি শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পারবেন। রাত ৮টা থেকে স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনওয়াই১-এ অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারের কথা রয়েছে।
এদিকে নিউইয়র্ক সিটি পরিবহন বিভাগের ‘ট্রিক অর স্ট্রিটস’ কর্মসূচির আওতায় কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস ও ম্যানহাটনের বিভিন্ন সড়কে হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে শিশুদের নিরাপদে উৎসবে অংশগ্রহণ, বিনোদন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগ থাকবে।
কুইন্সের উডসাইড অ্যাভিনিউতে ৩১ অক্টোবর সকাল ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বিশেষ আয়োজনের তালিকা প্রকাশ করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। একই দিনে ব্রুকলিনের পার্ক স্লোপ, ব্রঙ্কসের থ্রগস নেকসহ বিভিন্ন এলাকায় শোভাযাত্রা ও কমিউনিটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও হ্যালোইন এখন পরিচিত উৎসব। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর অনেকেই এদিন সন্তানদের নিয়ে স্থানীয় ‘ট্রিক অর ট্রিট’ ও বিভিন্ন কমিউনিটি আয়োজনে অংশ নেন।
নিউইয়র্কের পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, নিউজার্সিসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে হ্যালোইন ঘিরে নানা আয়োজন করা হয়েছে। নির্ধারিত দিনগুলোতে ১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। এতে ভৌতিক বাড়ি, বিশেষ পরিবেশনা ও নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ডের ম্যাজিক কিংডমে ‘মিকিস নট-সো-স্ক্যারি হ্যালোইন পার্টি’ আয়োজন করা হয়েছে ৭ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত রাতগুলোতে। শিশু ও পরিবারকেন্দ্রিক এই আয়োজনে রয়েছে বিশেষ চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পোশাক প্রদর্শন, চকলেট সংগ্রহ এবং বিনোদনের ব্যবস্থা।
দেশের বিভিন্ন শহরে স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, কমিউনিটি সংগঠন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও আয়োজন করা হচ্ছে হ্যালোইন পার্টি, কস্টিউম প্রতিযোগিতা এবং পরিবারকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান।
হ্যালোইন এখন যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি উৎসব। ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের (এনআরএফ) ২০২৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, এ বছর হ্যালোইন উপলক্ষে মার্কিন ক্রেতাদের মোট ব্যয় ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত বছরের রেকর্ড ১ হাজার ৩১০ কোটি ডলারের তুলনায় যা বেশি।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ মার্কিন ভোক্তা এ বছর হ্যালোইন উদযাপনের পরিকল্পনা জানিয়েছেন। গড়ে প্রত্যেক ক্রেতার ব্যয় হতে পারে ১১৫ ডলার ১৪ সেন্ট। প্রায় ৪৯ শতাংশ ক্রেতা সেপ্টেম্বর বা তার আগেই উৎসবের কেনাকাটা শুরু করেছেন।
এ বছর পোশাক কেনায় প্রায় ৪৪০ কোটি ডলার, বাড়িঘর সাজানোর সামগ্রীতে ৪৩০ কোটি ডলার এবং চকলেট ও মিষ্টিজাতীয় পণ্যে ৪১০ কোটি ডলার ব্যয়ের পূর্বাভাস রয়েছে।
হ্যালোইন উপলক্ষে পোশাক, মুখোশ, কুমড়া, কৃত্রিম কঙ্কাল, আলোকসজ্জা, চকলেট ও অন্যান্য সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। বড় খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় দোকান এবং অনলাইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ বিক্রির মৌসুম। তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ক্রেতাদের একটি অংশ তুলনামূলক সাশ্রয়ী কেনাকাটার দিকে ঝুঁকছেন। এনআরএফের জরিপে দেখা গেছে, অনেকে বিভিন্ন দোকানের দাম তুলনা, ছাড়ের সুযোগ গ্রহণ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাজসজ্জা কেনার পরিকল্পনা করছেন।
হ্যালোইনের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। এর উৎপত্তি প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর ‘সামহেইন’ উৎসব থেকে। ইউরোপের বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আশপাশের অঞ্চলে অক্টোবরের শেষ দিনটিকে গ্রীষ্মের সমাপ্তি এবং শীতের সূচনার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময় জীবিত ও মৃতের জগতের মধ্যকার সীমারেখা ক্ষীণ হয়ে আসে। অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতে আগুন জ্বালানো এবং বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণের প্রচলন ছিল।
পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সংযোগ ঘটে। ১ নভেম্বরের ‘অল সেইন্টস ডে’র আগের সন্ধ্যা পরিচিত হয়ে ওঠে ‘অল হ্যালোজ ইভ’ নামে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ‘হ্যালোইন’ শব্দটির প্রচলন হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইনের বিভিন্ন ঐতিহ্য আরও বিস্তার লাভ করে। সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় ও লোকজ বিশ্বাসনির্ভর এই আয়োজন রূপ নেয় সামাজিক ও বিনোদনমূলক উৎসবে।
বর্তমানে হ্যালোইন শুধু ভৌতিক সাজসজ্জার দিন নয়; এটি শিশুদের আনন্দ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরিবার-পরিজনকে নিয়ে উৎসব উদযাপনের একটি উপলক্ষ।
অক্টোবরের শেষ রাতে তাই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আবারও শোনা যাবে শিশুদের সেই পরিচিত ডাক- ‘ট্রিক অর ট্রিট!’
হোয়াইট হাউজে হ্যালোইন উৎসবের ঘোষণা দিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প :হোয়াইট হাউজে আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে হ্যালোইন উৎসব। এদিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বাগত জানাবেন। উৎসবে শিশুদের হাতে মিষ্টি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি থাকবে নানা আয়োজন।
২৬ অক্টোবর সোমবার প্রকাশিত এক ঘোষণায় জানানো হয়, ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ লনে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এতে আমন্ত্রণপত্র পাওয়া অতিথিরা অংশ নিতে পারবেন। তাদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পরিবার, পালক ও দত্তক নেওয়া শিশুদের পরিবার এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সন্তানরাও রয়েছে।
হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ লনে হাজারো শিশু ও তাদের অভিভাবক বিভিন্ন মিষ্টি সংগ্রহের বুথ ঘুরে দেখবে। এ সময় হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় শরতের পূর্ণিমার আদলে ভৌতিক সাজসজ্জাও থাকবে। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে দক্ষিণ প্রবেশপথে শিশুদের হাতে স্মারক মিষ্টি তুলে দেবেন প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি।
উৎসবের আনন্দ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সংগীতশিল্পীরা হ্যালোইনের ঐতিহ্যবাহী গান ও আধুনিক সুর পরিবেশন করবেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ শিশুদের খেলনা ডাকবাহী ট্রাক দেখাবে এবং ‘বি বেস্ট’ উদ্যোগের আওতায় শুভেচ্ছা কার্ড তৈরির ব্যবস্থা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ শিশুদের জন্য বিশাল কুমড়ার সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ এবং দেশটির কৃষকদের উৎপাদিত ছোট কুমড়া বিতরণ করবে। অর্থ বিভাগ শিশুদের রং করার বই দেবে। এর মাধ্যমে শিশুদের জন্য চালু করা ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’ কর্মসূচির প্রচার করা হবে।
এছাড়া মিশিগানের আপেল বিতরণ করবে আন্তর্জাতিক তাজা কৃষিপণ্য সমিতি। জাতীয় মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক সমিতি শিশুদের মিষ্টি দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন কর্মসূচি, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, জাতীয় উদ্যান পরিষেবা, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা বিভাগ, গোপন নিরাপত্তা বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও শিল্পকেন্দ্রও উৎসবে অংশ নেবে। বিজ্ঞান ও শিল্পকেন্দ্র শিশুদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষার উপকরণ সরবরাহ করবে।