হোয়াইট হাউজে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্পই। কিন্তু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হওয়ায় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরের শাসনের সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। বড় নীতি আইনে পরিণত করা কঠিন হবে, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে বাড়বে বাধা। প্রশাসনের ওপর তদন্ত ও জবাবদিহির চাপ এবং সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন পেতে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
৩ নভেম্বর মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস—এপি। নর্থ ক্যারোলাইনার পাশাপাশি টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, আইওয়া ও ক্যানসাসে রিপাবলিকানদের আসন জিতে নিয়েছে দলটি। জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারেও নিজেদের আসন ধরে রেখেছে তারা।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। সর্বশেষ যাচাই করা ফল অনুযায়ী, ওই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে ট্রাম্পের সামনে বিরোধী নিয়ন্ত্রিত সিনেট আসছে নিশ্চিত হলেও প্রতিনিধি পরিষদে শেষ পর্যন্ত কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, তা জানতে আরও ফলের অপেক্ষা রয়েছে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু নর্থ ক্যারোলাইনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেখানে রয় কুপারের পাশাপাশি টেক্সাসে জেমস তালারিকো, সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, ওহাইওতে শেরড ব্রাউন, আইওয়ায় জশ টুরেক এবং ক্যানসাসে অ্যাডাম হ্যামিল্টনের জয় রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়েছে। জর্জিয়ায় জন অসফ ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস প্যাপাসের জয়ও দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ সুগম করেছে।
প্রতিনিধি পরিষদেও আসন বদলের খবর এসেছে। নর্থ ক্যারোলাইনার একাদশ জেলায় ডেমোক্র্যাট জেমি এগার এবং নিউজার্সিতে রেবেকা বেনেট রিপাবলিকানদের আসন জিতেছেন। তবে কয়েকটি আসনে জয় এবং পুরো কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া এক বিষয় নয়। সিনেট হারানোর পর রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ধরে রাখতে পারে কি না, তার ওপর নির্ভর করবে ক্ষমতার পরিবর্তন আরও কতটা গভীর হবে। আইন প্রণয়নে দুই কক্ষের সম্মতি প্রয়োজন হলেও তদন্ত, নিয়োগ অনুমোদন ও অভিশংসনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আলাদা।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় প্রতিনিধি পরিষদ রিপাবলিকানদের হাতে থাকলেও ট্রাম্পের বড় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবে। করব্যবস্থা, অভিবাসন কিংবা সরকারি কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বিল বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া পাস করানো কঠিন হবে। কারণ, কোনো বিল আইন হতে সাধারণভাবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে একই পাঠে পাস এবং প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।
এর অর্থ, ট্রাম্পকে হয় কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়ে সমঝোতা করতে হবে, অথবা নতুন আইন ছাড়াই বিদ্যমান ক্ষমতার মধ্যে নীতি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। নির্বাচনের ফল তাই তাঁর পদে থাকার মেয়াদের চেয়ে কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকেই বেশি প্রভাবিত করবে।
কংগ্রেসের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় নতুন বরাদ্দের আলোচনায় ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কাছে শর্ত ও অগ্রাধিকারের দাবি তুলতে পারবে। অভিবাসন আইন প্রয়োগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য কিংবা অন্যান্য খাতের অর্থায়ন নিয়ে দর-কষাকষি বাড়তে পারে। তবে একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের পছন্দের ব্যয় আইন কার্যকর করতে পারবে না; সেখানেও দুই কক্ষ ও প্রেসিডেন্টের ভূমিকা রয়েছে।
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলালে প্রশাসনের ওপর তদন্ত ও জবাবদিহির চাপও বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটরা তখন সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে শুনানি ও তদন্তকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে। প্রতিনিধি পরিষদও তাদের নিয়ন্ত্রণে গেলে তদারকির পরিসর আরও বাড়বে। নথি তলব ও কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণের উদ্যোগ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি করতে পারে। নথি বা সাক্ষ্য নিয়ে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিরোধও তৈরি হতে পারে। ফলে প্রতিটি তদন্তের ফল নির্ভর করবে প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদল ট্রাম্পের জন্য বিশেষ করে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ফেডারেল বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, রাষ্ট্রদূত এবং প্রশাসনের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন কার্যকর করতে সিনেটের অনুমোদন লাগে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত সিনেট এসব মনোনয়নের অনুমোদন বিলম্বিত করতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত ফল যা-ই হোক, সিনেটের এই ক্ষমতা ট্রাম্পের জন্য নতুন বাধা হয়ে উঠতে পারে।
আবার সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সব বিল সহজে পাস করা যায় না। অনেক সাধারণ বিলের ওপর বিতর্ক শেষ করে ভোটে যেতে সাধারণত ৬০ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও আইন প্রণয়নে অন্য দলের সহযোগিতার প্রয়োজন থেকে যেতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ পাবে। শুধু সিনেটের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদন করা যায় না; সেই ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের। নির্বাচনে জয়ও নিজে অভিশংসনের ভিত্তি নয়। প্রতিনিধি পরিষদ অভিযোগ অনুমোদনের পর বিচার হয় সিনেটে। সেখানে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া দোষী সাব্যস্ত করে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করা যায় না। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অবসান নয়।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা শেষ পর্যন্ত দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ট্রাম্পের সব নীতি বাতিল করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলে তা অতিক্রম করতে উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। ফলে বিরোধীদেরও অনেক ক্ষেত্রে রিপাবলিকান সমর্থন দরকার হবে।
নির্বাচনের ফল কার্যকর হওয়ার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের রাতেই নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা দায়িত্ব নেয় না। সাংবিধানিক সময়সূচি অনুযায়ী নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যদের মেয়াদ শুরু হয় পরবর্তী ৩ জানুয়ারি দুপুরে। ফলে সিনেটে নিয়ন্ত্রণ বদলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব মূলত ২০২৭ সালের নতুন কংগ্রেসে দেখা যাবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের জন্য এর তাৎপর্য হলো, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই অভিবাসন নীতি বা প্রশাসনিক কার্যক্রম রাতারাতি পাল্টে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন আইন, অর্থায়ন ও তদারকিতে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে; বাস্তব ফল নির্ভর করবে সমঝোতা, বিদ্যমান আইন এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর।
ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের মূল পরিবর্তন তাই হচ্ছে ক্ষমতা প্রয়োগের পরিবেশে। সিনেটের ফল সেই পরিবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে; প্রতিনিধি পরিষদের ফল নির্ধারণ করবে তার বিস্তৃতি। গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, বড় আইন এবং অর্থায়নে ট্রাম্পকে এখন বিরোধীদের সঙ্গে আরও দর-কষাকষির প্রস্তুতি নিতে হবে। আর প্রতিনিধি পরিষদও হারালে তাঁর শাসনের বহু ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউজ ও ক্যাপিটল হিলের বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে।