বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
ফকিরের ফায়ার ★ জামায়াতের র’ কানেকশন ★ ঢাকা-টোকিও হটরিলেশনে তৃপ্ত দিল্লি

গুপ্ত খেলার জম্পেশ শো

গুপ্ত খেলার জম্পেশ শো

বিজ্ঞাপন
রহস্যঘেরা ঘটনা ও কাণ্ডকীর্তি সবদিকেই। কম-বেশি গুপ্ত খেলা খেলছে সব পক্ষই। তা স্থানিকে, আঞ্চলিকে, আন্তর্জাতিকেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগে বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীকে ঢাকায় তলব, সফরের সময় তার টোকিওতে না থাকা, শেখ হাসিনার ঘোষিত ডিসেম্বরে ফেরার কাউন্টডাউনের সময় জামায়াত নেতাদের সঙ্গে র-এর গোপন বৈঠক। রহস্যভেদ হচ্ছে না কোনোটারই। কূলকিনারাহীন অভিযোগ, নিষ্পত্তিহীন জবাব। অভিযোগটা এসেছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষিত সময়ে দেশে ফেরার কথা বলার পর প্রায় দেড় মাস বাকি থাকতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ঐক্যের অভিযোগ সামনে এনে ছেড়ে দিয়েছেন তারেক রহমান। তাও প্রকাশ্যে জনসভায়। আর বরাত দিয়েছেন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের।
চরম ভারত-বিদ্বেষী জামায়াত সম্পর্কে এ হাই ভলিউমের অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকে দিয়ে। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের উচ্চপর্যায়ের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বৈঠকটি হয়েছে ঢাকা শহরের বারিধারা এলাকায়। জামায়াত নেতারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনার দাবিতে অনড়। তারেক রহমান কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে আরও কিছু যোগ করে বলেছেন, তার কাছে তথ্য রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে থেকে অর্থ পাঠানো হচ্ছে এবং দেশের ভেতরে একটি রাজনৈতিক দল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বলার জন্যই বলা, নাকি নেপথ্যে কোনো ফের আছে—এখনো পরিষ্কার নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে সত্যিই কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, নাকি বিরোধী রাজনৈতিক দলকে চাপে রাখতেই গোয়েন্দা তথ্যের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না এবং অতীতের মতো বর্তমানেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করার পুরোনো বাতিক কি না। পারিপার্শ্বিক আলামত বলছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষিত সময় যত এগিয়ে আসবে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক তৎপরতা, জামায়াতের অবস্থান এবং বিএনপি সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা তত বাড়বে। এমন গুমোট অবস্থার মাঝেই প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর। তার দেশে অনুপস্থিতির মাঝেই বোমা ফাটালেন পুলিশপ্রধান আলী হোসেন ফকির। জানালেন, সরকার সম্মতি দিলে পুলিশ আবার ক্রসফায়ারে নামবে। এ নিয়ে রাজনীতিতে তোলপাড়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদমুখর। পুলিশ সদর দফতর বিবৃতি দিয়ে মাঠ নরমের চেষ্টা করছে। কিন্তু কুলাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর ফকিরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে দিয়ে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ অধিবেশন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ঘটেছে মিরপুরের রাড্ডার ঘটনা। দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীকে এর একটা বিহিত করতে হয়েছে। জাতিসংঘ অধিবেশন ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রাপ্তি নিয়ে আলাপ এগোয়নি। এবার জাপান থেকে ফিরে করতে হবে আইজিপি এবং ক্রসফায়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানানোর কাজ। তারেক রহমানের জাপান সফরটি অত্যন্ত হাই প্রোফাইলের। যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক, সেখানে সরকারপ্রধানের সফরের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আনা বা অকার্যকর রাখার কারণ অস্পষ্টই থেকে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না আসায় সিদ্ধান্তটির পেছনে প্রশাসনিক প্রয়োজন, কূটনৈতিক বিবেচনা নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে, এ নিয়ে আলোচনা বেশি তৈরি হয়েছে। এর পরও সফল দাবি করার মতো বিষয় রয়েছে এ সফরকে ঘিরে। বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যৌথ সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেছেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে এবং উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অংশীদার হতে তিনি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকেও চমৎকার বার্তা এসেছে। জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), রেলপথ ও অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ অভিন্ন অঙ্গীকারও করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় তো হয়েছেই। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মধ্যে তাদের জন্য সন্তোষজনক বলছে। এর পেছনে বেশি কাজ করছে ভূ-কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার রোধের যৌথ নীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা বড় পরিকাঠামোর জন্য এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু জাপানের মতো একটি বিশ্বস্ত ও ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ বাংলাদেশের মেগা প্রকল্প বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এগিয়ে এলে তা বেইজিংয়ের একচ্ছত্র প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করবে। ভারতকে দেবে তৃপ্তি ও স্বস্তি।
ভারত-জাপান উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ‘কোয়াড’ জোটের সদস্য এবং একটি ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার প্রবক্তা। ঢাকা-টোকিও চুক্তি ও কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে এই ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা ভারতের কৌশলগত নীতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়া। এ ছাড়া জাপানের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের যোগাযোগ-ব্যবস্থার যে উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে ভারতের সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। জাপান এই অঞ্চলের শিল্প সাপ্লাই চেইনকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। মাতারবাড়ি বন্দর ও বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধা ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সরাসরি সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, যা ভারতের নিজস্ব ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’কে সফল করতে ভূমিকা রাখছে। সব মিলিয়ে ঢাকা-টোকিও কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কে ভারতের ভূমিকা ও স্বার্থ বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। এতে তাদের জন্য রয়েছে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর সুযোগ।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz