বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের রাজনীতির এক জাদুকরি বংশীবাদকের গল্প

বাংলাদেশের রাজনীতির এক জাদুকরি বংশীবাদকের গল্প

বিজ্ঞাপন
লেখাটা শুরু করছি ত্রয়োদশ শতকের জার্মান রূপকথা ‘দ্য পাইড পাইপার অব হ্যামেলিন’ গল্পের উল্লেখ করে। সে সময় হ্যামেলিন শহরে ব্যাপক ইঁদুরের উপদ্রব (Rat infes-tation) দেখা দিলে শহরের মেয়র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এক পাইড পাইপারকে (বংশীবাদক) শহর ইঁদুরমুক্ত করার দায়িত্ব দেন। বংশীবাদক তার বাঁশিতে অসাধারণ সুরের এক জাদু তুলে সব ইঁদুরকে শহরের আপদমুক্ত করতে সক্ষম হন। কাজ শেষে মেয়র প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিক দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি মনে দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। দু-এক দিন পর বংশীবাদক শহরে ফিরে তার বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে এমন এক সুরের মূর্ছনা সৃষ্টি করেন, যা শুনে শহরের বাড়িঘর থেকে দলে দলে ছেলেমেয়ে তাকে অনুসরণ করে এক গুহায় প্রবেশ করে নিখোঁজ হয়ে যায়।

গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ক্যারিশম্যাটিক রাজনীতিকের শুভাগমন হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হওয়ার পর তার দেশে ফেরার ঘটনা এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ ও ভিন্নধর্মী পরিবেশ-পরিস্থিতির জন্ম দেয়। তার আগমনে চারদিকে নতুন এক বাংলাদেশের সুবাতাস বইতে শুরু করে। দীর্ঘ দেড় যুগের অধিক সময় এক ফ্যাসিস্ট শাসকের নির্মম-নিষ্ঠুর শাসনে জর্জরিত এবং সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম, খুন, হত্যা, বেশুমার দুর্নীতি ও অপকর্মের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের জনগণ তাদের জীবনে সুদিন ও সুসময়ের আশা একপ্রকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এহেন প্রেক্ষাপটে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব সংগঠনের মধ্য দিয়ে সেই দানবরূপী ফ্যাসিস্টের বিদায়ঘণ্টা বাজাতে সক্ষম হয়। ফ্যাসিস্ট তার দলবলসহ দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে ও পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ফ্যাসিস্ট চক্রের বিদায়ে জনমানুষের মধ্যে নেমে আসে এক অনাবিল স্বস্তি ও প্রশান্তি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে ফেরার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের নির্বাসিত রাজনীতিক বীরের বেশে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। লক্ষ জনতার বীরোচিত সংবর্ধনা ও শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় বরিত ও সিক্ত হন। বিমানবন্দর থেকে কিছুটা দূরে তার জন্য স্থাপিত সংবর্ধনা মঞ্চে তার যাত্রাপথে লাখো মানুষ তাকে অনুসরণ করে, যে কারণে পনেরো মিনিটের পথ পেরোতে তার গাড়িবহরের তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। যাত্রাপথে তিনি গাড়ি থেকে স্মিত হেসে হাত নেড়ে তাকে অনুসরণরত জনতার অভিবাদনের জবাব দেন।

সংবর্ধনা মঞ্চে উঠে সেখানে সমবেত লাখো জনমানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় অভিভূত নেতা মাত্র ১৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সবাইকে তার প্রতি তাদের সাদর অভিবাদন ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমকারী ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা-বিদ্বেষের একটি শব্দও উচ্চারণ না করে ধর্ম, রাজনৈতিক দলমত-নির্বিশেষে সকলের প্রতি শান্তি, নিরাপত্তার বার্তা দিয়ে দেশকে একটি জনকল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য নিজের একটি পরিকল্পনার আভাস দেন, যেটাকে তিনি ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এই একটি মাত্র বাক্যে ব্যক্ত করেন। তার পরিমিত, পরিশীলিত বক্তব্য সমবেত বিপুল জনতা একপ্রকার পিনপতন নীরবতায় শ্রবণ করে রীতিমতো মোহিত ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়, যেরকমটি তারা একজন রাজনীতিকের মুখ থেকে আগে কখনো শোনেনি। তারা তাদের মুখ থেকে ‘জ্বালাময়ী’ ভাষণ শুনতেই অভ্যস্ত। তার বক্তব্য তাদের কাছে এক নতুন বাংলাদেশের বার্তাবহ বিবেচিত হয়, যেখানে থাকবে না ভিন্নমতের কারণে জেল-জুলুম, গুম-খুন, হত্যা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ হবে না লাগামহীন দুর্নীতির চারণক্ষেত্র। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো এই মানুষটি আর কেউ নন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র, বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দেশে ফিরে প্রদত্ত তার বক্তব্যের পর তার প্রতি জনমানুষের আস্থা-ভালোবাসা এতটাই তুঙ্গে ওঠে, তিনি সেখানেই যান, সেখানেই তাকে একনজর দেখতে ও তার বক্তব্য শুনতে জনমানুষের রীতিমতো ঢল নামতে দেখা যায়। সর্বত্র তার জয়জয়কার এবং মানুষের মুখে মুখে তার নাম উচ্চারিত হতে শুরু করে। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন ব্যাপক আলোচিত এক নাম। ঢাকার দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তার পত্রিকায় তাকে বাংলার মার্টিন লুথার কিং এবং অন্য একজন তাকে বাংলার নেলসন ম্যান্ডেলা হিসেবে উল্লেখ করে পত্রিকার শিরোনাম করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পূর্ববর্তী তার জনসভাগুলোতেও জনমানুষের স্রোত নামতে দেখা যায়। এসব জনসভায় তিনি তার কিছু পরিকল্পনার বিষয়ে আলোকপাত করেন, যা মানুষকে তার নেতৃত্বের প্রতি একপ্রকার মোহাবিষ্ট করে তোলে। তার পরিকল্পনার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তামূলক (Social Safety Net) কর্মসূচি, যেমন অভাবী দরিদ্র পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন সুদসহ মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন-ধর্মগুরুদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান ছাড়াও খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন ইত্যাদি পরিকল্পনা জনমানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এসব পরিকল্পনার কয়েকটি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

জনমানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দেখে ঢাকার বিদেশি দূতাবাসের পলিটিক্যাল কর্মকর্তারা তাদের প্রতিবেদনে তাকে দেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করলে বহু দূতাবাস-প্রধানকে তার সঙ্গে দেখা করতে রীতিমতো লাইন দিতে দেখা যায়। বহু বিদেশি সাংবাদিক তাদের সংবাদমাধ্যমে (টাইম, দ্য ডিপ্লম্যাট, দ্য গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা, ব্লুমবার্গ, দ্য ইকোনমিস্ট ইত্যাদি) তাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করে রিপোর্ট করে।

প্রথম দিকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ ও হতাশাবাদীদের কেউ কেউ তার পরিকল্পনাকে স্রেফ ধাপ্পাবাজি তথা পিআর বা পাবলিক রিলেশন্সের অংশ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পেলেও পরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ এবং তার প্রতি জনমানুষের অপার আস্থা-ভালোবাসা এবং নির্বাচনে তার দলের ভূমিধস নিরঙ্কুশ বিজয় দেখে অনেকে তাদের ধারণা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। দেশে দীর্ঘ ১৭ বছর সশরীরে উপস্থিত না থেকেও জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়নে জর্জরিত দেশে থাকা দল ও দলীয় নেতা-কর্মীদের চাঙা ও ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রথম যুদ্ধে তিনি যেমন পূর্ণ নম্বর পেয়ে জয়ী হয়েছেন, তেমনিভাবে বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিস্টদের রেখে যাওয়া দূরাচার, জঞ্জাল এবং দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার দ্বিতীয় যুদ্ধে (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার) জয়ী হয়ে দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুমহান সংগ্রামে সফল হবেনÑঅন্য আর দশজনের মতো আমারও সেই প্রত্যাশা; যেমনটি হ্যামেলিনের বংশীবাদক তার অপরূপ সুরের মূর্ছনায় শহরকে আপদমুক্ত করে নগরবাসীর জীবনে স্বস্তি এনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz