‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্য করে এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কথা বলছেন তার পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। সরকারের ভেতরেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন মহলে গুঞ্জনও উঠেছে, সরিয়ে দেওয়া হতে পারে পুলিশের এই মহাপরিদর্শককে। তার স্থলাভিষিক্ত হতে এরই মধ্যে তদবির শুরু হয়েছে বলেও ‘খবর’ ছড়াচ্ছে পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকেই।
গত ২৬ অক্টোবর সোমবার আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির ঢাকার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। এর পরই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। পুলিশপ্রধানের এমন বক্তব্যকে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিক সংগঠন।
তবে বক্তব্যের পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করা হয়, ‘আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে এমন মন্তব্য করা হয়।’ আইজিপির এমন বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গেয়েছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও দাবি করেছিলেন, ‘আইজিপির বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল আইনের কঠোরতা বোঝানো। তবে এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ করা তার ঠিক হয়নি।’
অবশ্য গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘জাপান সফর শেষে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরবেন। তিনি দেশে ফিরলে আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার যে দাবি উঠেছে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। আইজিপি পদে পরিবর্তন বা নতুন নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা যদি হয়, তবে তো রাষ্ট্র থাকে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তা হতে পারে না। সরকার ক্রসফায়ার চাইতে পারে না। এটা পুলিশও করতে পারে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো বেআইনি কাজ করতে বাধ্য নন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, ‘আইজিপির মন্তব্যে বাহিনীর ভেতরেও অনেকে বিব্রত। এ ধরনের বক্তব্য বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে দেয়।’
বিতর্কিত মন্তব্যের পর পুলিশপ্রধান পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শীর্ষ এই পদের জন্য কে যোগ্যতাসম্পন্ন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ১৫তম বিসিএসের চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন। তারা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য-সংবলিত নথিও তলব করেছে।
অতীতের ক্রসফায়ার
বাংলাদেশে ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করা হয় পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে। এর পর থেকে নানা সময়ে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৯৫৭ জন। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৩৭১ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশই নিহত হয়েছেন পুলিশের অভিযানে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে। বিশেষ এই বাহিনীটি বর্তমানে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে পরিচিত। এ ছাড়া একই সময়ে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন আরও ৬৯ জন।
ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক মাদকবিরোধী অভিযানের সময় র্যাবের গুলিতে নিহত হন। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রদের আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগও বাহিনীটির জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনে। ওই সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল বাহিনীটির বিলুপ্তি বা সংস্কারের সুপারিশ করে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর র্যাব বিলুপ্ত করে এর জায়গায় পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন কার্যকর হয়।