শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বল যার বই তার

বল যার বই তার

বিজ্ঞাপন
কথায় বলে, একতাই বল। কিন্তু হালের হিসাব বলে ভিন্ন কিছু। সেখানে ক্ষমতাই আসলে বল। এই ক্ষমতা প্রায় ক্ষেত্রেই আসলে সরকারে থাকার ব্যাপার। বাংলাদেশে কে বা কোন দলটি ক্ষমতায় আছে, সেটা কিন্তু সরকারি, বেসরকারি কিছু বইয়ের তাক দেখেই আঁচ করা যায়। সদ্যই গিয়েছিলাম রাজধানী ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে। সেখানে ছোট্ট একখানি ‘বুক কর্নার’ হতে পারে তার নমুনা। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির প্রয়াত নেতা-নেত্রীর বই সাজানো আছে দারুণ যত্নে।
একই পথে হাঁটছে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি তারা নির্দেশ জারি করেছে, দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাঠাগারে রাখতে হবে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা দুটি বই। সংগ্রহে আরও থাকতে হবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা একটি বই।
বইকে প্রমাণ হিসেবে ধরে বিপরীত চিত্রটাও জেনে রাখা যায় খুব সহজে। মানে, কোনো বই যদি আক্রান্ত হয়, তবে ধরে নিতে হবে তাদের অক্ষমতার কথা। সম্প্রতি ঢাকার বাংলাবাজারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়ে দেন জনাকয়েক মবকারী। বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে তারা বিক্রি বন্ধের দাবি জানান। এমনকি ইউপিএলের দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। তবে এ ঘটনায় ইউপিএল ভয় পায়নি। উল্টো নিয়েছে শক্ত অবস্থান। বিবৃতি দিয়ে তারা জানায়, বইটি নিষিদ্ধ করার কোনো আইনগত পদক্ষেপের কথা তাদের জানা নেই। প্রায় সব সরকারের আমলেই তারা বিভিন্ন বই প্রকাশ নিয়ে চাপের মুখে পড়েছে। কিন্তু অন্যায্য চাপে বই সরিয়ে নেওয়ার ইতিহাস তাদের নেই। তবে সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় বই নিষিদ্ধ করে, তখন তারা হয়তো বইটি বিক্রি বা প্রদর্শন করবে না।
না, অন্তর্বর্তী সরকারের মতো এ ক্ষেত্রে অন্তত মবকারীদের কাছে বিকিয়ে যায়নি বিএনপি সরকার। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বেলায় তো তা বলাই যায়। ইউনূস আমল হলে হয়তো বইখানি নিষিদ্ধ হতো, এমনকি সেই প্রকাশনা সংস্থাকেও পড়তে হতো রোষে। তবে ইউপিএলের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে জুলাইপন্থী থাকা, তাদের মেরুদণ্ড সবল রাখার পেছনে এটি যে ভূমিকা রেখেছে, সেটাও নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাই এখানেও আসলে বলের পেছনে কিছুটা হলেও আছে ক্ষমতা!
আমাদের দেশের আরও একটি নিয়মিত ঘটনা হচ্ছে, নতুন সরকার মানে পাঠ্যবইয়ে নতুন চেহারায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও চর্চিত হয়েছে। হচ্ছে এখনো। বদল কতটা যৌক্তিক? বদল কতটা বিজ্ঞানসম্মত? বদল কতটা সময়োপযোগী? পরিবর্তনে এসব প্রশ্নের বালাই থাকে না। বরং নিজের দলের দৃষ্টিভঙ্গি প্রবেশ করানোর বন্দোবস্তই যেন আসল কথা।
পাঠ্যপুস্তকের বেলায় সম্প্রতি এসেছে আরেক খবর। ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তাই ৩৮ লাখ বইয়ের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। যদিও ১৮ লাখ বই স্কুল স্তরে পাঠানো হয়েছিল। এগুলো ঢাকায় ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা পরিবর্তন করার কথা জানিয়েছেন কর্তারা। এতে যে জনতার কতটা টাকা বাড়তি ব্যয় হবে, সেটা নিয়ে ভাবার যেন কেউ নেই। হালের মাঠের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জব্দ করাটাই বড় কথা। কিন্তু একটা বিষয় তো মাথায় রাখা দরকার, যেকোনো ছবিকেই দলীয় প্রতীক আখ্যা দেওয়া যায়। সেভাবে দেখতে গেলে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার দশা হয়ে যেতে পারে।
সরকারি দল নিজের স্বার্থটা আগে দেখবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই বলে ক্ষমতার হাওয়া বুঝে পাল তুলবেন ইতিহাসবিদ আর গবেষকেরাও। ইদানীং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী চর্চার স্রোত গতি পেয়েছে। বিপরীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখালেখি একেবারেই কমে গেছে। যারা লিখছেন, তারা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জায়গা থেকে সক্রিয় হচ্ছেন। তার মানে, ক্ষমতার দিকে হাত বাড়িয়ে খুদকুড়ো পেতে চাইছেন এসব মতলববাজ লেখক। আবার আওয়ামী লীগ আমলে যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন, তাঁদের কেউ কেউ নাকি সেসব বই লুকিয়ে ফেলতে ব্যাকুল। অথচ এসব লিখে তখন তাঁরা সরকারি চাকরি বাগানো কিংবা অন্য কোনো সুবিধা ঠিকই নিয়েছেন।
বই নিয়ে বিতর্ক শুধু যে বাংলাদেশে, তা নয়; সুদূর মার্কিন দেশও এর বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রে নাকি সেন্সর করা বইয়ের তালিকা দিনকে দিন বড় হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপের চাপে সরকারি স্কুলগুলোতে অনেক বইয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এগুলো মূলত রক্ষণশীল সংগঠন, যারা কিছু বইকে ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে বলছে। এ নিয়ে বিবিসি বাংলা সম্প্রতি শিরোনাম করেছে, ‘কেন যুক্তরাষ্ট্রে লাইব্রেরির তাক থেকে এত বই দ্রুত উধাও হয়ে যাচ্ছে?’
সবটা মিলে আঁচ করা যাচ্ছে, বইকে সইতে হয় উগ্রবাদীদের গালি, সরকারের চোখরাঙানি। বইকে দেখতে হয় সুবিধাবাদীর ভোল বদল এবং রং বদল। যারা একই দর্শনে অটল থাকেন, তাঁদের প্রতিকূল সময় তো পার হতেই হয়। ব্রিটিশ ভারতে এ সময়টা দীর্ঘই ছিল কাজী নজরুল ইসলামের বেলায়। তাঁর অন্তত পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ সরকার। লেখালেখির কারণে তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছিল তখন। তাই তো ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় কবি লিখেছিলেন :
‘বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?’
ব্রিটিশরা চলে গেছে অনেক বছর হয়েছে। স্বাধীন দেশে বইয়ের মুক্তমত দমাতে আজও কেন প্রহরীর ভয়? বইকেই কেন হতে হবে সরকারের প্রচারযন্ত্র? কে দেবে জবাব?

 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz