শব্দটি এখন আর বাতকে বাত বা কথার কথা নয়। ধারণাগত হলেও হাতে গোণা কয়েকটি দেশে ‘সেক্স মিনিস্ট্রি’ আলোচিত হয়ে উঠেছে। ঢোলটা আর্মেনিয়ায় বাজলেও এ নিয়ে মজা, মশকরা, ট্রলের বাজার জমেছে দেশে দেশে। আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টে এই ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ গঠন নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক মারামারি, কিল-ঘুষি এবং চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশেই আনুষ্ঠানিক বা সরকারিভাবে ‘সেক্স মিনিস্ট্রি’ বা ‘যৌনতা মন্ত্রণালয়’ নেই। থাকলে কি আর এতো মাতামাতি হয়?
চলতি বছরের শুরুতে বিরোধী দল স্ট্রং আর্মেনিয়া পার্টি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে দেশে ‘কোনো অসন্তুষ্ট নারী থাকবে না’— এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ লক্ষ্য পূরণে দলটি ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। দলটির দাবি ছিল, যৌন অসন্তুষ্টির কারণে মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, যা মোকাবিলায় এ ধরণের মন্ত্রণালয় প্রয়োজন। পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি নিয়ে বিতর্কের একপর্যায়ে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ক্ষমতাসীন সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান বিরোধী দলকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে দলটির নেতা নারেক রাপেতিয়ানকে নারীদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। বিতর্কের সময় চাখোয়ান রাপেতিয়ানকে ‘আপাদমস্তক ঝামেলা’ বলে কটাক্ষ করলে দু’পক্ষে বাগবিতন্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আসন ছেড়ে চাখোয়ানের বক্তব্য দেওয়ার ডায়াসের দিকে এগিয়ে যান। এরপর উভয় পক্ষে সংঘাত। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার ও ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ভাহাগন আলেকসানিয়ান বিরোধী আইনপ্রণেতাদের দিকে একটি চেয়ার ছুঁড়ে মারেন।
পরে ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী কৌতুক করে লেখেন, ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া’ নামের দলটির সংসদ সদস্যরা ‘শারীরিকভাবে ততটা শক্তিশালী নন’। সেই পোস্টের মন্তব্যে চাখোয়ান বলেন, ‘আমার কিছুটা খারাপ লাগছে। তারা স্ট্রং আর্মেনিয়া। লড়াই শুরু করে আর তারপর পালিয়ে যায়।’ আর্মেনিয়ায় নবগঠিত রাজনৈতিক দলটির প্রস্তাবের মূল থিম হচ্ছে দেশটিতে যেন কোনো নারী যৌনসুখে অতৃপ্ত বা অসন্তুষ্ট না থাকে। তা নিশ্চিত হলে তারা দেশগঠনে বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। এর আগে, চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশটির বিরোধী দল ‘স্ট্রং আর্মেনিয়া পার্টি’-র নেতা সার্গিস কারাপেতিয়ান একটি পডকাস্টে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নারীদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন। দাবি করেন, কিছু নারীর রাজনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে এক ধরণের যৌন অসন্তুষ্টি কাজ করছে। দেশে জনসংখ্যা বাড়াতে ও নারীদের সন্তুষ্ট রাখতে ‘সেক্স মিনিস্ট্রি’ গঠন করা উচিত। আলোচনা জমাতে আর কি লাগে?
অডিট চেম্বারের এক অধিবেশনে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য তারোন চাকোইয়ান এই মন্তব্যটিকে নারীদের জন্য ‘অসম্মানজনক’ ও ‘লিঙ্গবৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। এই নিয়ে দু’পক্ষে বাগ্বিতণ্ডা। একপর্যায়ে পার্লামেন্টের ভেতরেই সংঘর্ষ। মারামারি, কিল-ঘুষি, চেয়ার ছোড়াছুড়িসহ অ্যাকশন-সাসপেন্স। রাশিয়ায় অবশ্য আলোচনা জমেছে আরো আগেই। ২০২৪ সালের শেষদিকে রাশিয়ায় জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার কারণে ক্রেমলিনপন্থী কিছু কর্মকর্তা এবং সংসদীয় কমিটি জন্মহার বাড়াতে একগুচ্ছ ব্যতিক্রমী প্রস্তাব দেয়। সেখানে একটি ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ বা এই সংক্রান্ত বিশেষ জনসংখ্যা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব আসে। প্রস্তাবের সাথে নানা দফাও যোগ হয়। দম্পতিদের ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর সুযোগ দিতে রাত ১০টা থেকে ভোর ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখার প্রস্তাব রাখা হয়। সরকারি অর্থায়নে ডেটিং ও হানিমুনের কথাও আসে। দাবি করা হয় প্রথম ডেটের জন্য ৫,০০০ রুবল সরকারি অনুদান এবং হানিমুনের জন্য সরকারি খরচে বিশেষ হোটেলের ব্যবস্থা করার। কাজের মাঝখানের বিরতিতে শারীরিক কামে উদ্বুদ্ধ করার দাবিও বাদ যাবে কেন?
এসব দাবি ও প্রস্তাবনা আলোচনার স্তরেই ঘুরছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ক কোনো মন্ত্রণালয় গঠন হয়নি কোথাও। দেশে দেশে কারো কারো কাছে বেশ জোসই লাগছে বিষয়টি। কোনো দেশে বা দূর ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশেও এ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়ে পড়ে কাকে বাছাই করা হবে এ বিষয়ক মন্ত্রী? বিশেষ কী যোগ্যতা থাকতে হবে তার? যে হারে বা মাত্রায় নানান ঘটনার ভিডিও সামনে আসছে, তাতে আগাম চিন্তা করে রাখতে সমস্যা কী? বরং তা অগ্রসর চিন্তা ভাবলে কি বেশি আপত্তি করা যাবে?
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন, ঢাকা।