শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​সোহাগী, হরমুজ ও তেলাপোকা আখ্যান

​সোহাগী, হরমুজ ও তেলাপোকা আখ্যান

বিজ্ঞাপন
এক.
হঠাৎ করেই শরীরের পুরোটা শিরশির করে ওঠে সোহাগীর। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মশারির অবয়বটা নড়ে ওঠে। ধড়মড় করে উঠে বসে সে। তার মাথার কাছে নিজেরটা ছাড়া আরও একটা বালিশ, নিস্তেজ পড়ে রয়েছে। নিজেরটাকে সে বুকে জাপটে ধরে। কী ভ্যাপসা গরম! শরীরজুড়ে ঘাম আর ঘাম! এদিক-ওদিক তাকায়। উপরে। পাশে। তার পা দুটো যেখানে ছিল, ও দিকটাতেও। নাহ্। কিছুই মনে পড়ছে না তার। না স্বপ্ন, না আধ-জাগরণে উলটপালট কোনো কিছু ভাবা।

এখন রাত কটা হতে পারে? দুইটা? তিনটা? তারপর তো আর গভীর রাত থাকার কথা নয়। আর কিছুক্ষণ বাদেই বাইরে পাখির কিচিরমিচির শুরু হবে মনে হচ্ছে তার। কিন্তু শরীরটা এ রকম শিরশির করে উঠল যে! কেন? ঘটনা কী হতে পারে?

হ্যাঁ, হতে পারে। কিছু একটা তো অবশ্যই। এত গরম! সঙ্গে মশারির ভেতর চামচিকা বাদুড়ের মতো দুর্বৃত্ত চরিত্রের তেলাপোকারাও পাঁয়তারা, ওড়াউড়ি করে। তার ছোটবেলায় সে তা-ই দেখেছে। কী করে ঢোকে এরা? তখন সে দাদির সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাত। সে দেখেছে দাদির জীর্ণ মশারির ভেতর বিস্তর তেলাপোকা কেমন অবাধে ঢুকে পড়ত। দাদি তার সেগুলো হাতপাখা দিয়ে পেটাত আর বলত, ‘...শালার হারামজাদা ত্যালাচোরা!’

দেখতে কেমন ‘সউদি আরবের খেজুরের লাহান, ঘন বাদামি রং পুরো শরীরজুড়ে! পাংখা মেইলা ইচ্ছামতন ফুরুত-ফারুত ওড়াউড়ি করত!’ সেই ছোট্টবেলার কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। দাদি বলত, ‘ত্যালাচোরায় হাতের-পায়ের আঙুলের আগা, কানের লতি কুটুসকাটুস কাটে! মালুম করা কঠিন!’ বাস্তবিকই ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না কখন কাটে! কিন্তু পরের দিন সকালবেলাতেই দেখা যেত, আঙুলের আগাগুলো কেমন সাদা, খসখসে হয়ে আছে! কানের লতিও কেমন নিশপিশ করছে। এদের দাঁতের এমন নিখুঁত কাজ! দাদি তার কানের লতি, লম্বা শুকনো বুড়া আর তর্জনী আঙুল দিয়ে টেনে ধরে বলত, ‘অই হোয়াগি! অমা! তোর দেহি কানের লতিও খাইছে ত্যালাচোরায়! বেজন্মা ত্যালাচোরা! আয় হউরার-তেল দেই!’ সোহাগী সোহাগে ঢুলঢুল হয়ে চিৎকার করত, ‘আহ্, লাগে তো দাদি! অনেক বেদনা!’ দাদি হাতে সরষের তেল নিয়ে বলত, ‘ওলে আমার সুন্দরী নাতিন! তোর এই কানের লতিতে সোনার দুল দিব। আয়নারে বইন!’
‘কী অদ্ভুত কাণ্ড দেখ! ঘুমের ঘোরে থাকা মানুষের সোনার অঙ্গ কাটে পতঙ্গে! তাও আবার টেরই পাই না!’

আবার তার ছাড়পোকার কামড়েরও তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে! দিনের পাট সাঙ্গ করে রাতের বেলায় যখন মনের সুখে সোনার শরীর পেতে দিয়েছে ফকফকা রঙিন চাদর বিছানো খাটের ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটু একটু করে ঘুমে চেপে ধরেছে তাকে। কী যেন স্বপ্ন দেখে দেখে চোখের পাতারা পিটপিট করছে। ঠোঁট বাঁকা হচ্ছে। সোজা হচ্ছে। হাসতে হাসতে পুরো শরীরটা নড়েচড়ে উঠছে। আর ঠিক ও সময়ই কুটুসকাটুস! তা কোথায়? পায়ের দুই গোড়ালিতে। দুই হাতের কনুইয়ের ওপর। অথবা ঘাড় ও গলার মাঝামাঝি জায়গায়। ইশ্! কী মজার চুলকানি! ‘রাজা চুলকায়, রানি চুলকায়, আরও চুলকায় চাকরানি...!’ এদিকে-ওদিকে খোঁজো! বালিশ উল্টাও! ভাঁজে ভাঁজে পরখ করো। কোথাও নাই! বিরাট চালাক! কী আজব চিড়িয়া! আর একটা কি দুইটা চক্ষের নজরে পড়ল তো। দেখ, এই আছে! আবার এই নাই! হাতের আঙুলের আওতায় পড়ল তো, জোরে মারো টিপা! শালায় মরছে তো মরছে! হাতের আঙুল বিশ্রী গন্ধে ভরে গেছে! বড্ড যন্ত্রণার বিষয়! ইচ্ছা করে, ঘরের রামদা দিয়া কোপাইয়া মারি সব কয়টা ছাড়পোকা! কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না!’

তো শরীরের আলস্য ভুলে, একরাশ বিরক্তিতে আচ্ছন্ন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সুইচ টিপে বিদ্যুৎ-বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় খোঁজে। নাহ্, কিচ্ছু নেই কোথাও! তবে এরা যে নচ্ছার ছারপোকা, তা সে জানে। কামড় মেরে বিচ্ছুগুলা এক জায়গাতে আর থাকে না। পাগলা-কুকুরের মতন দৌড়ায়! নানান চিপাচাপায় গিয়ে লুকায়। এমন চালাকের চালাক!
কিন্তু দাদির ওই ত্যালাচোরার কথা ভুলতেই পারে না সে। দাদি মাঝেমধ্যে তাকে ভয় দেখাত। ফোকলা মুখে খয়েরি রঙের নড়বড়ে দাঁত বের করে বলত, ‘অই হোয়াগী! ওই যে, ওই যে দ্যাখ! তোর ত্যালাচোরা নাগর আইতাছে!’

-না গো দাদি, না! তুমি আমারে বাঁচাও! নাইলে আমি ডরে মইরা যামুগা গো, দাদি!
মুহূর্তেই সে ভয়ে কুঁচকে যেত। তাকে দেখে প্রায় শতবর্ষী দাদি খুব মজা লুটে নিত! হাসতে হাসতে ঢলে পড়ত সোহাগীর গায়ের ওপর। ‘ওলে আমার সুন্দরী নাতিন! আল্লায় তোরে বাঁচাইয়া রাখুক! অনেক লম্বা-হায়াত দেক!’
ঠিক এমন সময় বাইরে দরজার কড়া নাড়ার খটখট শব্দ। ‘কেডা?’ বলে ধাতস্থ হয় সে। পুরো শরীরে টান দিয়ে দরজার দিকে কান পাতে।
-দরজা খোল সোহা! আমি।
-খাড়াও, আইতাছি!
মশারির ফাঁক গলিয়ে নিচে নামে সে। শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজে। টিনের বেড়ার পাশে কাঠের পাল্লায় হাত রাখে। এখানেই বাতির সুইচ। আঙুল দিয়ে ঠিকই তার হদিস পেয়ে যায়। নিচের দিকে সুইচ টিপা মারে। ষাট পাওয়ারের ম্যাদা আলোর বাল্ব জ্বলে ওঠে।
দরজার পাল্লার কাছেই লম্বা হাতলসহ রামদাটা পড়ে থাকতে দেখে সে।
-আমি কেডা?
এবার কেশে গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই আমি কেডারে?’
-আমি তোর হরমুজ।
-ও বুঝছি।
রামদাটা হাতে নিয়ে দূরে সঠিক জায়গায় রাখতে রাখতে বিড়বিড় করে, ‘শালা! তুমি আইজ মদ খাইছ তো, আইজ তুমারে আর আস্তা রাখুম না! আমার পেটে ভাত নাই! আর তুমি খাও মদ! কুত্তা কোথাকার! ওই মদ দেখলে হুঁশ থাকে না! মদের লগে আর কী খাও তুমি, আমি জানি না! খাড়া! তোর মদ খাওয়া আমি ছুটাইয়া দিতাছি...!’
হেঁচকা টানে খিল খুলে দরজার এক পাট ফাঁক করে দাঁড়ায় সে। দরজার ফাঁক গলিয়ে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে হরমুজ।
-ইশ্! বাইরে যা গরম! এই দ্যাখ, পোঁটলায় তোর লিগা বিরানি আনছি। সোনারগাঁয়ের। নে, খায়া নে।
-খা! তোর সোনারগাঁয়ের বিরানি, তুই খা!
দরজা বন্ধ করে মশারির ফাঁক গলিয়ে বিছানায় উঠে পড়ে সোহাগী।
-কিরে সোহা! তুই বিরানি খাইবি না? এত শখ কইরা আনলাম! সোনারগাঁয়ের!
কোমরে লুঙ্গির কোঁচা বাঁধে হরমুজ।
-তুই জানোস, ঘরে চাইল নাই! নুন নাই!
সোহাগীর গলায় একরাশ ক্ষোভ।
-জানি। তো, কী খাইছস তুই?
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চায় হরমুজ।
-কী আর খামু! পানি!
গলা নামিয়ে হাতপাখার বাঁট দিয়ে পিঠ চুলকায় সোহাগী।
-যা গরম পড়েছে না! সারা শরীল ঘামে চুবচুবা হইয়া গেছে! পিঠ খালি খাউজায়!
-আসলেই। অনেক গরম! নাহ্! আমার খাওনের দরকার নাই। তুই খায়া নে। তোর সোনার অঙ্গে আরাম পাইবি।

-চুপ থাক! আমার খিদা নাই!
-কস কী! খিদা নাই ক্যান?
-বুঝস না তুই? এই আমি ঘুমাইলাম। হ!
চোখ বন্ধ করে সোহাগী। স্যাঁতসেঁতে মেঝের স্বল্প পরিসরে অনেকটা সময় হাঁটাহাঁটি করে হরমুজ। মাঝখানে গায়ের পিরান খুলে আলনায় রাখে। বিছানার দিকে তাকিয়ে পরখ করে, সোহাগী ঘুমিয়েছে কি না। হ্যাঁ, ঠিকই ঘুমিয়েছে সে। নাক ডাকার হালকা শব্দ হচ্ছে। তারপর সঙ্গে আনা আরেকটি পলিথিনের ভেতর হাত চালায় হরমুজ।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় সোহাগীর। এবার বিরক্তিভরা চোখে চারদিকে তাকায়। তার মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত কারা যেন মাতালের মতো দৌড়াদৌড়ি করছে! শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে তার। ঘুমের ভাবটাও উবে গেছে। মশারির নিচে তার শরীরের ওপর সংখ্যায় দশটা মাস্তান তেলাপোকা নড়েচড়ে উঠছে!
মদের গন্ধে পুরো শরীর গুলিয়ে ওঠে সোহাগীর। সে ডান হাতটা বাড়িয়ে চৌকির নিচে রাখা তার রামদার সন্ধান করে।

-আরে ও সোহাগী! এমুন কইরা কী খুঁজতাছস তুই?
-কুত্তা! তোরে আমি টুকরা কইরা ফালামু! সঙ্গে খুন হইব আরও দশটা ত্যালাচোরা! তোর গুষ্টি কিলাই আমি! হ! আমার নাম সোহাগী!
-আরে, খালি দশটা না। তোর লগে দশটা। আর আমার লগে আছে শত শত! দেখবি তুই?
উঁচু দাঁত বের করে হাসে হরমুজ। সোহাগীর গায়ের জ্বালা, মনের জ্বালা এক হয়ে যায়।
-চোপ থাক! কথা বাড়াইস না!
সোহাগীর কথা শুনে নিজের জিবে কামড় বসায় হরমুজ। সে আন্দাজ করে, আসলেই খেপে গেছে তার সোহা! সে জানে, সোহা খেপে গেলে অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়!

দুই.
আরেক সোহাগী এসে উপস্থিত হয়ে হরমুজ-সোহাগীর ঘরে। সে চৌকির ওপর শরীর পেতে দেয়। কিছুক্ষণ নির্জীব হয়ে পড়ে থাকে। তার চোখ দুটো পুরোপুরি খোলা না, আবার বন্ধও না। এ সময় তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা দুলছে। জীর্ণ-ময়লা মশারি পুরো শরীরের ওপর ঝুলে আছে। মনে হচ্ছে, সে এক কবরের ভেতর শুয়ে রয়েছে। তার বুকের ওপর কিছু একটা হাঁটছে। না, একটা না। অনেকগুলো। কুটুসকাটুস শব্দ তুলে কানের লতি কাটছে। আবার ঘাড়ের নিচে, বুকে, নাভিতে কী যেন খুঁজে ফিরছে। সে হাত তুলতে চায়। হাত ওঠে না। তার মনে হয়, এই শরীরটা আর শরীর নাই, যেন একটা ময়লার ভাগাড় হয়ে উঠেছে! সেখানে দুনিয়ার সব তেলাপোকা বাসা বানিয়েছে। চারদিকে কেমন খচখচ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সবদিকে হাজার হাজার দাঁত একসঙ্গে সবকিছু কেটে নিচ্ছে!

হরমুজ কি এখনো হাসছে? নাকি মরে গেছে? সোহাগী চোখ তুলে তাকাতে চায়। পারে না। শুধু আবছা দেখে, হরমুজের মুখের ভেতর তেলাপোকা ঢুকছে, আবার বের হচ্ছে। তার খোলা ঠোঁটের ফাঁকে খয়েরি ডানা, লম্বা লম্বা ঠ্যাং চকচক করছে। হঠাৎ সে দাদির গলা শুনতে পায়। ‘অই হোয়াগী! দ্যাখ তোর কত্ত ত্যালাচোরা নাগর...!’ সোহাগীর বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে বলতে চায়, ‘দাদি আমার বড় বিপদ। আমারে বাঁচাও গো দাদি...!’ কিন্তু মুখ খুলতেই তার মনে হয়, জিবের নিচে কিছু নড়ছে। ভেজা। পিচ্ছিল। ডানাওয়ালা। সে বমি করতে চায়। পারে না। মেঝের ওপর পড়ে থাকা কেরুর বোতলগুলো লম্বা হয়ে যায়। সরু হয়ে যায়। আবার আরও মোটা হয়, যেন তারা সাপের মতো শ্বাস নিচ্ছে! বাইরে কাক ডাকে। কিন্তু সোহাগী দেখে, এত কিছুর মধ্যেও হাজারো তেলাপোকা ফরফর শব্দ তুলে একসঙ্গে ডানা ঝাপটাচ্ছে! ঘরজুড়ে ওড়াউড়ি করছে!

মশারির ভেতর বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সোহাগী দেখে, তার নিজের শরীরটা চৌকির ওপর চার হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। তার পাশে আরও দশটা সোহাগী এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মুখ একেবারে শুকনো। রক্তমাখা পুরো শরীর জবজবে হয়ে আছে। চোখগুলো ফাঁকা। এই সোহাগী ধীরে ধীরে ঝুঁকে হরমুজের বউয়ের কানের কাছে মুখ নেয়। তারপর ফিসফিস করে বলে, ‘অই সোহাগী, তোর সোনার দুল কই...?’ কাঁচা রক্তের গন্ধে ঘর ভরে গেছে। সেই গন্ধ ক্রমে ঘন হয়ে উঠছে। সোনারগাঁয়ের বিরানির গন্ধ, ঘামের গন্ধ, মদের গন্ধÑসব একাকার হয়ে গেছে। ওদিকে হরমুজের শরীর। এদিকে সোহাগীর পেটে ক্ষুধা। মগজে অপমান। সবশেষে আবার সোনার শরীরজুড়ে রক্তের ধারা। সব মিলিয়ে সে আরেক ভয়ানক নারকীয় চিত্র ধারণ করেছে! সোহাগী বুঝতে পারে না, এই যে জীবন কাটাল এত দিন, এর ভেতরে আসলে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

বস্তির একটা খুপরির ভেতর চৌকি, মশারি, রামদা আর কিছু তেলাপোকা। মানুষ কি এর চেয়ে বেশি কিছু পায়? হরমুজ তো পড়ে আছে। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও মদ গিলছিল, এখন সে নিথর রক্তমাখা মাংস ছাড়া আর কিছু না। এ সময় তারও মদের নেশা নাই। রাগ নাই। খিদা নাই। কাম নাই। আবার ভয়ও নাই।
তাহলে এত দিন সে কী ছিল? সোহাগীর মনে হয়, মানুষের ভেতরে চরিত্র বলতে আসলে কোনো স্থায়ী জিনিস নাই। মানুষের ভেতরের যত অভ্যাস, ক্ষুধা, যন্ত্রণা তাকে সব সময় তাড়া করে ফেরে।
বাইরে কাক ডাকে। ভোর হয়। সূর্য ওঠে। বস্তির মানুষ জেগে ওঠে। পৃথিবী থামে না। একটা মানুষ মরলে পৃথিবীর কিছু যায় আসে না। দুইটা মানুষ মরলেও না। হাজারে-লাখে মরলেও না। তেলাপোকাগুলো এখনো রক্তের ওপর দিয়ে হাঁটছে। এতই স্বাধীন তারা! এটাই যেন এই জগতের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম!

এই সোহাগীর এখন মনে হয়, জন্মের পর থেকেই গরিবানার শিকার হয়েছে সে। ক্ষুধার শিকার হয়েছে। যত ভয়ের শিকার হয়েছে। আনন্দ-সুখ-স্বপ্নের শিকারও কম হয়নি! সব মিলিয়ে হরমুজের শিকার হয়েছে। এরা অভাগী সোহাগীকে কম জ্বালাতন করেনি! এখন সবকিছুই অসহ্য মনে হচ্ছে তার কাছে। সেও কিছু দেখতে চায় না। তাই দু’চোখ বন্ধ করতে চায় এই অভাগী সোহাগী। সে দেখছে, আজ হাজারো তেলাপোকা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তাকে খাবে বলে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই কি মুক্তি মেলে? চোখ বন্ধ করলে মনে হয়, অন্ধকারের ভেতরেও আরেকটা জমাট অন্ধকার আছে। সেখানে দাদি বসে আছে। সে হাসছে না, কাঁদছেও না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে শুধু! দুঃখিনী সোহাগীকে দেখে তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে দু’গাল বেয়ে! সোহাগী নিজেকে ছেড়ে দেয় নড়বড়ে চৌকির ওপর। বাকি দশজন সোহাগীও তার শরীরের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সবাই মিলে হরমুজের বউ সোহাগী হয়ে ওঠে।

তিন.
ভোর হওয়ার অনেক পরে বস্তিবাসী সবাই টের পায়, হরমুজ-সোহাগীর ঘরে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। আতর আলী, কিসমত, আহমদুল্লা, সাহেবালী ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসে। এমন তো হওয়ার কথা না! তারা দেখে, হরমুজ-সোহাগীর ঘরের দরজাও বন্ধ! এতক্ষণে হরমুজ তো রিকশা নিয়া রাস্তায় নামার কথা! তারা ত্রস্ত-ব্যস্ত হয়ে দরজা ধাক্কা দেয়। নড়বড়ে দরজা খুলে যায়। চৌকাঠ পেরিয়ে আবছা-অন্দরে ঢুকে পড়ে সকলে। ভেতরের চিত্র দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া! মেঝেতে পড়ে রয়েছে তিনটা কেরুর বোতল এবং চৌকির পাশে চিত হয়ে পড়ে রয়েছে রক্তাক্ত নিথর হরমুজ! পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় গোঙাচ্ছে সোহাগী! কাছেই লম্বা হাতলের রক্তমাখা রামদা!

ইতোমধ্যে বস্তির অনেকেই এসে ভিড় জমিয়েছে। আতর আলী, কিসমত, আহমদুল্লা লক্ষ করে, সোহাগীর রক্তমাখা শরীরজুড়ে দশটা তেলাপোকা আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করছে। সোহাগী ওদের আর তাড়াতে পারছে না এবং তারা সকলেই দেখে, হরমুজের পাশে অসংখ্য তেলাপোকা চিতপটাং হয়ে আছে!
বস্তির মুরব্বি নবীউল্লাহ মুন্সী তার সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, ‘ইয়া মাবুদ! এত ত্যালাচোরা! এই তুমরা সরো তো! আবার এত রক্ত! এই কিসমত, পুলিশে খবর দে! মাডার কেস! জোড়া খুন...!’ উপস্থিত সকলেই অবাক হয়ে দেখে, সোহাগীর রক্তাক্ত শরীরজুড়ে অসংখ্য তেলাপোকা দৌড়াদৌড়ি করছে।

এর মধ্যে বস্তির কুঁজো বুড়ি ফেলানির মা, ডান-চোখ-কানা জোসনার মা, হরমুজের পক্ষাঘাতগ্রস্ত চাচি গোলাবজান বিবি, চোরা-তাজুলের তিন নম্বরের সুন্দরী বউ পরীবানু ‘হায় আল্লা! এ কী হইল গো! হায় হায় হোয়াগী! হায় হায় হরমুইজ্যা! তোরা খুন হইয়া গেলি! খুন! খুন! রক্ত...!’ বলে চিৎকার করতে থাকে। তাদের সম্মিলিত আহাজারি শুনে পুরো সোনারগাঁও জেগে উঠেছে।
কিসমত নিবিষ্ট হয়ে তার মোবাইল ফোনের বাটন টিপতে থাকে। ইত্যবসরে বস্তিজুড়ে বহিরাগত কাকের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাদের কর্কশ কা কা ডাকে মুখরিত হয়ে ওঠে সোনারগাঁও বস্তি। ততক্ষণে সূর্যটাও তেতে উঠতে শুরু করেছে। তার তেজে সোহাগীর শরীরটাও নিশ্চয় ঘামছে! (সমাপ্ত)

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz